সৌদি আরব ও পারস্য উপসাগরে নতুন করে হামলার ঘটনায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এর প্রভাবে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।
সোমবার ২৩১৩ GMT-তে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২.৯০ ডলার বা ২.৭৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭.৫১ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ২.২৭ ডলার বা ২.২৭ শতাংশ বেড়ে ১০২.৩২ ডলারে পৌঁছে। বাজার খোলার পরপরই উভয় ধরনের তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া, হুথিদের নতুন হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর বাড়তে থাকা ঝুঁকি—সব মিলিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাজারে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রোববার সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশে হুথিদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি বাড়ি ও একটি মসজিদের ভিডিও প্রকাশ করে। হুথিরা দাবি করেছে, তারা পাশের একটি প্রদেশে সৌদি সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালিয়েছে।

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে নিক্ষিপ্ত একটি বস্তু আঘাত হানার পর সেখানে আগুন ধরে যায়। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, আগুনের কারণে জাহাজটির ক্রুদের সরিয়ে নিতে হয়েছে।
ইরানও জানিয়েছে, তাদের উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় একজন নিহত এবং চারজন ক্রু আহত হয়েছেন।
সৌদি তেল সরবরাহে বড় ঝুঁকি
তেলের দাম বাড়ার অন্যতম বড় কারণ সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবের এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শুক্রবার ইরাক থেকে পরিচালিত একটি ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে যায়। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
বাব এল-মান্দেবেও বাড়ছে উদ্বেগ
শুধু হরমুজ প্রণালিই নয়, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের তৎপরতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব এল-মান্দেব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে। দ্বীপটি বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছে অবস্থিত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই নৌপথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ পরিবহন হয়েছে।
ফলে একই সময়ে হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথেই ঝুঁকি বাড়ায় বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।
এক সপ্তাহে তেলের দাম বেড়েছে ৮ শতাংশ
সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে গত এক সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো তেলের দাম গত সপ্তাহে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সীমা ছাড়ায়।
আইজি মার্কেটের বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বলেছেন, ওমানে চলমান আলোচনা থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না এলে অথবা সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দ্রুত চালু করা না গেলে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে মার্চের শুরুতে দেখা ১১৯.৪৮ ডলারের সর্বোচ্চ দামের দিকে বাজার এগিয়ে যেতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

হরমুজ নিয়ে আলোচনা স্থগিত
এদিকে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের একটি বৈঠক সোমবার ওমানে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি রোববার জানিয়েছেন, বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচল নিয়ে এই বৈঠক থেকে কোনো সমাধানের পথ বের হওয়ার আশা করছিল বাজার। বৈঠক স্থগিত হওয়ায় সেই প্রত্যাশাও আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ছয় মাস আগে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে এই সংঘাতের কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তি আলোচনা হয়নি। জুনে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হলেও কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা ভেঙে যায়।
ফলে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো, হরমুজ প্রণালি এবং বাব এল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একের পর এক হামলা ও বাধার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে। তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ায় এর প্রভাব পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















