বিশ্বের বড় পরিবর্তনগুলো সাধারণত দরজায় কড়া নেড়ে আসে না। তার আগে কিছু সংকেত দেখা যায়। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা বাড়ে, পুরোনো নিয়মের প্রতি মানুষের আস্থা কমে, প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলো আগের মতো কার্যকর থাকে না। কিন্তু এসব লক্ষণকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে সামগ্রিক পরিবর্তনটি চোখে পড়ে না। বিপদ তখনই স্পষ্ট হয়, যখন তা আর উপেক্ষা করার উপায় থাকে না।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এই আত্মতুষ্টি। তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল সমাজে বসবাসকারী মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিতে চায় যে আগামীকালও আজকের মতোই হবে। অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ থাকতে পারে, দূরের কোনো যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ থাকতে পারে, রাজনীতিতে চরমপন্থার উত্থান নিয়ে আলোচনা হতে পারে—তবু মনে হয়, শেষ পর্যন্ত পরিচিত বিশ্বটি টিকে থাকবে।
কিন্তু ইতিহাস এমন নিশ্চয়তা দেয় না।
আজ চারদিকে পরিবর্তনের সংকেত রয়েছে। পৃথিবী ক্রমেই উষ্ণ হচ্ছে। খরা ও দাবানল বিস্তৃত হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর ঋণের বোঝা বাড়ছে। স্বাস্থ্য ও খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ার প্রভাব দরিদ্র মানুষের জীবনে পড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন গতিতে এগোচ্ছে যে এর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব সম্পর্কে আমাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনো নেই।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতির পুরোনো নিয়মগুলোও দুর্বল হচ্ছে। যেসব রাষ্ট্র একসময় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও রীতিনীতিকে নিজেদের স্বার্থের অংশ হিসেবে দেখত, তাদের কেউ কেউ এখন সেগুলোর সীমা পরীক্ষা করতে দ্বিধা করছে না। কূটনীতির ধীর, সংযত ও আস্থাভিত্তিক পদ্ধতির জায়গা নিচ্ছে অনেক বেশি প্রকাশ্য এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক আচরণ।
সংঘাতের নতুন বাস্তবতা
বিশ্বের সংঘাতের চিত্রও উদ্বেগজনক। উফসালা কনফ্লিক্ট ডেটা প্রোগ্রামের হিসাবে, গত বছর রাষ্ট্রভিত্তিক সংঘাতের সংখ্যা ৬৫-তে পৌঁছেছিল, যা ১৯৪৬ সালের পর সর্বোচ্চ। বড় শক্তিগুলোও এমন যুদ্ধে আটকে পড়ছে, যেখানে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব আগের মতো সহজে ফল দিচ্ছে না। সস্তা ও সহজলভ্য প্রযুক্তি অপেক্ষাকৃত ছোট শক্তিগুলোকেও নতুন ধরনের সামরিক সক্ষমতা দিয়েছে।
রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতা শুধু একটি যুদ্ধের ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি দেখায়, আধুনিক বিশ্বে শক্তির হিসাব কত দ্রুত বদলে যেতে পারে।
আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য—এমন কথা বলার কারণ নেই। কিন্তু বড় শক্তিগুলোর মধ্যে বিপর্যয়কর সংঘাতের ঝুঁকি বহু দশকের তুলনায় এখন বেশি। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন সংঘাত শুরু হলে তা থামানোর জন্য আগের মতো কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও আমরা নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারছি না।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা
ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় বারবার চোখে পড়ে: ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষরা প্রায়ই নিজেদের ব্যবস্থার দুর্বলতা সবচেয়ে দেরিতে উপলব্ধি করেন।
ফরাসি বিপ্লবের আগে ফ্রান্স ছিল ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র। কিন্তু রাষ্ট্রটি বিপুল ঋণের মধ্যে ডুবে ছিল, শাসকগোষ্ঠী ছিল সুবিধাভোগী ও রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, আর ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত ছিল। সমাজের নিচের স্তরে শ্রমিক ও কৃষকদের হতাশাও গভীর হচ্ছিল। একই সময়ে নতুন রাজনৈতিক ধারণা মানুষের সামনে বিকল্প ভবিষ্যতের সম্ভাবনা তুলে ধরছিল।
তারপরও রাজতন্ত্র বিশ্বাস করেছিল, তার অবস্থান যথেষ্ট নিরাপদ। সেই আত্মবিশ্বাস টেকেনি।
১৯১৭ সালের রাশিয়াতেও শাসকগোষ্ঠী পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পারেনি। জার নিকোলাস দ্বিতীয় বিশ্বাস করতেন, বড় কোনো সংস্কারের প্রয়োজন নেই। ১৯৩০-এর দশকের জার্মানির অভিজাতরাও ধরে নিয়েছিল, তারা হিটলারকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। ইতিহাস তাদের ধারণার ভয়াবহ মূল্য দেখিয়েছে।
তবে পরিবর্তনের সংকেত পড়ে ব্যবস্থা সংস্কারের পথও ইতিহাসে আছে। ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের পর মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক দাবি বাড়তে থাকলে দেশটির অভিজাতরা ফরাসি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছিল। ১৮৩২ সালের গ্রেট রিফর্ম অ্যাক্টের মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে এমনভাবে বদলেছিল, যাতে জমে থাকা অসন্তোষের একটি অংশ প্রাতিষ্ঠানিক পথে প্রকাশের সুযোগ পায়।
এখানেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা: পরিবর্তনকে ঠেকানো সব সময় সম্ভব নয়, কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব।
আমাদের সময়ের অস্বস্তিকর মিল
আজকের পৃথিবীতে আমরা আবার এমন কিছু প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। বিপুল সম্পদ ও প্রভাবের অধিকারী গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে। কিছু নেতা সমঝোতা ও ঐকমত্য তৈরির চেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কোনো ব্যবস্থাই তার বাহ্যিক শক্তি দিয়ে চিরকাল টিকে থাকতে পারে না।
সবচেয়ে বড় ভুল হবে ধরে নেওয়া যে বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু নিজেদের অস্তিত্বের কারণেই ভবিষ্যতেও কার্যকর থাকবে। প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে তখনই, যখন মানুষ ও রাষ্ট্রগুলো তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে এবং তার নিয়ম মেনে চলতে প্রস্তুত থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত ভূমিকা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে। দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর বড় শক্তিগুলো বুঝেছিল, শুধু শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে শান্তি নিশ্চিত করা যাবে না। তাই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, জোট ও নিয়মভিত্তিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র সেই ব্যবস্থার প্রধান রক্ষক হিসেবে আরও শক্ত অবস্থানে আসে। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আগের মতো নিশ্চিত নয়।
ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন প্রশাসন হয়তো আবার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও মিত্রতার প্রতি আগের প্রতিশ্রুতি ফিরিয়ে আনবে। সেটি সম্ভব। কিন্তু আমাদের এমন একটি ভবিষ্যতের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রীয় রক্ষকের ভূমিকা পালন করবে না।
তখন প্রশ্ন উঠবে—শূন্যস্থানটি কে পূরণ করবে?
চীন ও ভারতের মতো বড় শক্তির উত্থান বিশ্বব্যবস্থাকে আরও বহুমুখী করে তুলছে। একই সঙ্গে ন্যাটোর মতো জোটের ওপর চাপ বাড়ছে, রাশিয়া ও ইউরোপের সংঘাত নতুন রূপ নিচ্ছে এবং তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনার সম্ভাবনা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানি, খাদ্য ও অন্যান্য সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতাও ভবিষ্যতের সংঘাতের উৎস হতে পারে।
এমন বিশ্বে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হবে, কোনো সংকট দেখা দিলে কে তার সমাধানে নেতৃত্ব দেবে।
সহযোগিতার সুযোগ এখনো আছে
তবু পুরোনো ব্যবস্থার দুর্বলতা মানেই সহযোগিতার অবসান নয়। বরং আমাদের এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও ইন্টারনেটের মতো ক্ষেত্রগুলো বহু রাষ্ট্রের মধ্যে নিয়মিত সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক আইনও পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যায়নি। জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলেও এখনো অস্তিত্বশীল।
এগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করা ভুল হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমে গেলে অন্য দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে নতুন ধরনের সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো মধ্যম শক্তিগুলো অভিন্ন স্বার্থ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে এমন সহযোগিতার সম্ভাবনা খুঁজছে। ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হয়তো আগের মতো একটি শক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হবে না। বরং একাধিক রাষ্ট্র ও জোটকে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।
এটি কঠিন হবে। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থার পতনের অপেক্ষায় বসে থাকা আরও বিপজ্জনক।
নতুন কিছু নির্মাণের সময়
১৯১৪ সালের ইউরোপের নেতারা বিশ্বাস করেছিলেন, বলকান অঞ্চলের আরেকটি সংকটও আগের মতো কূটনৈতিক বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করা যাবে। তারা বুঝতে পারেননি যে পরিস্থিতির গতি বদলে গেছে। সেই ভুল হিসাব প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়।
১৯৪৫ সালের নেতারা সেই শিক্ষা মাথায় রেখেছিলেন। দুটি বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর তারা এমন একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়তে চেয়েছিলেন, যা আগের ব্যর্থতাগুলো পুনরাবৃত্তি হতে দেবে না।
আজ আমাদেরও একই ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস প্রয়োজন।
পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে—এই সত্য মেনে নেওয়া হতাশাবাদ নয়। বরং সেটিই বাস্তবতার প্রথম স্বীকৃতি। একইভাবে নতুন বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু তার নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।
আমরা যদি ধরে নিই যে সবকিছু আগের মতোই থাকবে, তাহলে পরিবর্তন আমাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে। আর যদি স্বীকার করি যে পৃথিবী বদলে গেছে, তাহলে সেই পরিবর্তনকে পরিচালনা করার সুযোগও তৈরি হবে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই: সংকটের আগে সংকেত আসে। যারা সেই সংকেত পড়তে পারে, তারা পরিবর্তনের অভিঘাত কমাতে পারে। যারা তা অস্বীকার করে, তারা প্রায়ই ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে নিজেদের অপ্রস্তুত অবস্থায় আবিষ্কার করে।
আজ আমাদের সামনে সেই পছন্দই রয়েছে—পুরোনো বিশ্বের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা করা, নাকি নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হওয়া।
মার্গারেট ম্যাকমিলান 



















