বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান কাঠামো যতটা স্থিতিশীল বলে মনে হয়, বাস্তবে তা ততটা নয়। দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি দেশ বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত জমাচ্ছে, আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ সেই উদ্বৃত্তের বড় অংশ শোষণ করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ঘাটতি বহন করছে। এই ব্যবস্থাকে অনির্দিষ্টকাল টেনে নেওয়া সম্ভব নয়। কোনো না কোনো পর্যায়ে ভারসাম্য ফিরবেই। প্রশ্ন হলো, সেই ভারসাম্য ফেরার সময় সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য কে দেবে?
যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত, পুঁজি-সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতির দুটি সম্ভাব্য পরিণতি রয়েছে—বেকারত্ব বৃদ্ধি অথবা ঋণ বৃদ্ধি। দুটিই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বর্তমান অসম কাঠামো বদলানো অবশ্যম্ভাবী।
আদর্শ পরিস্থিতিতে এই পরিবর্তনটি সমন্বিতভাবে ঘটতে পারত। উদ্বৃত্ত দেশগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াত, আর ঘাটতিতে থাকা দেশগুলো ঋণনির্ভর ভোগ কমিয়ে সঞ্চয় ও উৎপাদন বাড়াত। এতে বৈশ্বিক চাহিদা হঠাৎ ভেঙে পড়ত না, আবার বাণিজ্য ভারসাম্যও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসত।
কিন্তু বাস্তব রাজনীতি সেই পথকে কঠিন করে তুলেছে। কারণ বড় অর্থনীতিগুলো সমস্যাটির কারণই একভাবে দেখে না।
চীনের চোখে সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ভোগ ও বড় সরকারি ঘাটতিতে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চীনসহ উদ্বৃত্ত দেশগুলোর শিল্প, বাণিজ্য ও মুদ্রানীতি বৈশ্বিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। ইউরোপ এখনো এই সংকটের জন্য একটি সুসংহত যৌথ ব্যাখ্যা ও নীতি দাঁড় করাতে পারেনি। ফলে সমাধানের পথ নিয়েও মতভেদ গভীর।
এর অর্থ হলো, বৈশ্বিক সমন্বিত সমাধানের সম্ভাবনা কমছে। প্রত্যেক দেশ এখন ক্রমেই ভাবছে—বিশ্বব্যাপী ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়, তার চেয়ে নিজের অর্থনীতিকে কীভাবে রক্ষা করা যায়।
ইতিহাসের সতর্কবার্তা
বাণিজ্য ঘাটতি ও উদ্বৃত্তের বড় ব্যবধান নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক শতকে একাধিকবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, এই ধরনের ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘদিন টিকে থাকলে শেষ পর্যন্ত তার সমন্বয় ঘটে। তবে সেই সমন্বয়ের বোঝা কখনো সমানভাবে ভাগ হয় না।
১৯২০-এর দশকের অভিজ্ঞতা তার একটি বড় উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনশীলতা দ্রুত বাড়লেও মজুরি একই হারে বাড়েনি। ফলে উৎপাদন ভোগের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায় এবং দেশটি বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত তৈরি করে। বিপরীতে ইউরোপ যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের জন্য বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে থাকে। জার্মানি বিশেষভাবে বিপুল ঋণ নিয়ে অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষতিপূরণ পরিশোধ চালিয়ে যায়।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও অভ্যন্তরীণ ঋণ দ্রুত বাড়ছিল। তার বড় অংশ যাচ্ছিল ভোগ এবং সম্পদের জল্পনামূলক বিনিয়োগে।
এই ভারসাম্যহীনতা যত দীর্ঘ হয়েছে, সুরক্ষাবাদী চাপও তত বেড়েছে। ফ্রান্স মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে, যুক্তরাজ্য সোনার মান পরিত্যাগ করেছে, জার্মানি আমদানি সীমিত করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও ১৯৩০ সালে স্মুট-হাওলি শুল্ক আইন গ্রহণ করে।
শেষ পর্যন্ত মহামন্দার সময় বৈশ্বিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়। প্রায় সব বড় অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, কিন্তু ক্ষতির মাত্রা ছিল অসম। যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি দ্রুত কমে যায়, বিনিয়োগ ধসে পড়ে, ব্যাংক ব্যর্থতা ও দেউলিয়াত্ব বাড়ে। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের উদ্বৃত্তের সঙ্গে যে অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তার ভাঙনের মূল্য যুক্তরাষ্ট্রকেও বড়ভাবে বহন করতে হয়েছিল।
তবে ইতিহাসে এমন উদাহরণও আছে যেখানে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা বড় বিপর্যয় ছাড়াই কমে গেছে।
১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র আবারও বড় উদ্বৃত্তে ছিল। ইউরোপ ও জাপান তখন তুলনামূলকভাবে ঘাটতিতে ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি ১৯২০-এর দশকের চেয়ে মৌলিকভাবে ভিন্ন ছিল। ইউরোপ ও জাপানের ঘাটতির অর্থ ব্যবহার হচ্ছিল যুদ্ধোত্তর অবকাঠামো ও শিল্প পুনর্গঠনে। সরকারগুলো মূলধনের প্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রেখেছিল এবং বিদেশি পুঁজি এমন বিনিয়োগে ব্যবহার করেছিল, যা ভবিষ্যতে আয় তৈরি করতে সক্ষম।
ফলে ঋণ বাড়লেও উৎপাদনশীল ক্ষমতা তার সঙ্গে বাড়ছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ইউরোপ ও জাপানের পুনর্গঠনকে উৎসাহিত করছিল। সুরক্ষাবাদী প্রতিযোগিতাও ছিল সীমিত। এই বিরল সমন্বয়ের কারণে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা ধীরে ধীরে কমে যায়, বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয় ছাড়াই।
কিন্তু এটিই ছিল ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়।
ঋণ যখন উদ্বৃত্তের ছায়া হয়ে ওঠে
১৯৭০-এর দশকে লাতিন আমেরিকার সংকট আরেকটি শিক্ষা দেয়। তেলের দাম দ্রুত বাড়ায় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো বিপুল অর্থের মালিক হয়। সেই অর্থ আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোতে জমা পড়ে এবং ব্যাংকগুলো তা লাতিন আমেরিকা ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে ঋণ হিসেবে বিতরণ করে।
ফলে এসব দেশে ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও বড় বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে বৈশ্বিক সুদের হার বেড়ে গেলে সেই ঋণ আর টেকসই থাকেনি। সংকটের সমাধান হয়েছে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমিয়ে, কিন্তু তার মূল্য দিয়েছে ঘাটতিতে থাকা দেশগুলো—মন্দা, মূল্যস্ফীতি, কঠোর ব্যয়সংকোচন এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রবৃদ্ধিহীনতার মধ্য দিয়ে।
জাপানের অভিজ্ঞতাও আলাদা ছিল না। ১৯৭০-এর দশকের শেষ থেকে ১৯৮০-এর দশকে দেশটির উৎপাদনশীলতা মজুরির তুলনায় দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে জাপানের রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং বড় উদ্বৃত্ত তৈরি হয়। একই ধরনের প্রক্রিয়ায় জার্মানিও শক্তিশালী শিল্পভিত্তিক উদ্বৃত্ত অর্থনীতিতে পরিণত হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ঘাটতি বহন করতে থাকে। জাপানে একই সময়ে বিপুল অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বিনিয়োগের বিস্তার ঘটে। কিন্তু সেই বিনিয়োগের বড় অংশ প্রত্যাশিত আয় তৈরি করতে পারেনি। ১৯৮৫ সালের প্লাজা চুক্তির মাধ্যমে প্রধান অর্থনীতিগুলো ইয়েন ও ডয়চে মার্কের মূল্য ডলারের তুলনায় বাড়ানোর চেষ্টা করে। তবু প্রকৃত সমন্বয় আসে পরে, যখন জাপানের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি মন্দা, সম্পদের মূল্যপতন ও মূল্যহ্রাসের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
১৯৯০-এর দশকের এশীয় আর্থিক সংকটও একই ধরনের চক্র দেখিয়েছে। বিদেশি পুঁজি দ্রুত প্রবেশ করে কয়েকটি পূর্ব এশীয় অর্থনীতিতে। সেখানে বাণিজ্য ঘাটতি ও ঋণ বাড়ে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়তেই মুদ্রার পতন, ব্যাংকিং সংকট ও গভীর মন্দা দেখা দেয়। উদ্বৃত্ত দেশগুলোর তুলনায় ঘাটতিতে থাকা দেশগুলোকেই বেশি মূল্য দিতে হয়।
২০০০-এর দশকের গোড়ায় ইউরোপেও একই ধরনের কাঠামো তৈরি হয়েছিল। শ্রমবাজারের সংস্কারের ফলে জার্মানিতে মজুরি উৎপাদনশীলতার তুলনায় কম হারে বাড়ে এবং সঞ্চয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। জার্মানি গ্রিস, পর্তুগাল, স্পেনসহ ইউরোজোনের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে। এসব দেশ ঋণ নিয়ে সেই ঘাটতি অর্থায়ন করে।
একক মুদ্রার কারণে তাদের বিনিময় হার সমন্বয়ের সুযোগ ছিল না। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট পরিস্থিতিকে বিস্ফোরিত করে। ফল হয় সার্বভৌম ঋণ সংকট, বেকারত্ব, কঠোর ব্যয়সংকোচন এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা।
সব ক্ষেত্রেই একটি বিষয় একই ছিল: বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা যখন দ্রুত বাড়তে থাকা ঋণ ও দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
কে সমন্বয়ের বোঝা বহন করবে?
এখানেই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে। কোনো দেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিজে থেকেই সংকট তৈরি করে না। উদ্বৃত্ত অর্থ যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়, তাহলে দীর্ঘদিন তা টিকে থাকতে পারে। বিপদ শুরু হয় যখন অতিরিক্ত সঞ্চয় এমন বিনিয়োগে যায়, যার অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তন খুব কম; অথবা যখন তা সম্পদের বুদ্বুদ, অতিরিক্ত ভোগ কিংবা অন্য দেশের ঘাটতি অর্থায়নে ব্যবহৃত হয়।
সুরক্ষাবাদও সাধারণত সমস্যার মূল কারণ নয়। বরং দীর্ঘদিনের ভারসাম্যহীনতার রাজনৈতিক লক্ষণ হিসেবে সুরক্ষাবাদ সামনে আসে। তবে শুল্ক, আমদানি নিয়ন্ত্রণ বা মূলধন নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ করতে পারে—সমন্বয়ের মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেবে।
যে দেশ রাজনৈতিকভাবে দুর্বল, নিজের মুদ্রা রক্ষা করতে অক্ষম কিংবা স্বাধীনভাবে অর্থায়ন করতে পারে না, সাধারণত সংকটের সময় তাকে বেশি মূল্য দিতে হয়। লাতিন আমেরিকা, এশিয়া এবং ২০০৮-পরবর্তী দক্ষিণ ইউরোপের অভিজ্ঞতা এ কথাই দেখায়।
অন্যদিকে শক্তিশালী ঘাটতিসম্পন্ন দেশ যদি আমদানি কমাতে, নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে কিংবা মূলধনের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, তাহলে উদ্বৃত্ত দেশগুলোর ওপর সমন্বয়ের চাপ চলে যেতে পারে। ১৯৩০-এর দশকের যুক্তরাষ্ট্র এবং ১৯৯০-এর দশকের জাপানের অভিজ্ঞতা তার উদাহরণ।
চীনের সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা
আজকের বিশ্বে চীন সম্ভবত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। দেশটির ঋণ ইতোমধ্যে অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং গত কয়েক দশকে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় ঋণের বৃদ্ধি ছিল অসাধারণ দ্রুত। একই সঙ্গে ঋণের একটি বড় অংশ এমন বিনিয়োগে গেছে, যেখান থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল ক্রমে কমেছে।
অতিরিক্ত আবাসন, কম ব্যবহার হওয়া অবকাঠামো এবং চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদনক্ষমতা—এসবই সেই সমস্যার লক্ষণ। ফলে চীনের জন্য অভ্যন্তরীণ চাহিদা সংকুচিত করে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমানো সহজ সিদ্ধান্ত নয়।
বরং বেইজিংয়ের সামনে প্রণোদনা থাকবে যতটা সম্ভব দীর্ঘ সময় উদ্বৃত্ত ধরে রাখার। অতিরিক্ত উৎপাদন বিদেশে বিক্রি করা গেলে অভ্যন্তরীণ শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমে। একই সঙ্গে ঋণের বোঝা ধীরে ধীরে সামলানোর সময় পাওয়া যায়।
কিন্তু এর অর্থ দাঁড়ায়, চীনের সমন্বয়ের একটি অংশ অন্য দেশকে বহন করতে হবে—বেশি বাণিজ্য ঘাটতি, শিল্পের দুর্বলতা, ঋণ বৃদ্ধি কিংবা ধীর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে।
সমস্যা হলো, অন্য দেশগুলো কতদিন এই মূল্য দিতে রাজি থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শক্তি
ওয়াশিংটনের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি আগের অনেক সংকটের তুলনায় ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক চাহিদার অন্যতম প্রধান উৎস। তাই বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ক্ষমতা তার রয়েছে।
শুধু অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, রাজনৈতিক কাঠামোও তাকে তুলনামূলকভাবে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ দেয়। শুল্ক, বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো উপায় ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবাহে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
দেশটি যদি শিল্পনীতি ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ায় এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য ও মূলধন প্রবাহে আরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, তাহলে চীনসহ অন্যান্য উদ্বৃত্ত দেশগুলোর জন্য আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতির ওপর নির্ভর করে নিজেদের উদ্বৃত্ত ধরে রাখা কঠিন হবে।
তখন উদ্বৃত্ত দেশগুলোর সামনে দুটি পথ থাকবে—নিজেদের উদ্বৃত্ত কমিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও উৎপাদন কাঠামো বদলানো, অথবা যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নতুন বাজার খুঁজে নেওয়া। দ্বিতীয় পথও সহজ নয়, কারণ নতুন ক্রেতা দেশগুলোর একই পরিমাণ আমদানি করার অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকতে হবে।
ইউরোপের ঝুঁকি সবচেয়ে জটিল
এই সমীকরণে ইউরোপ সবচেয়ে অনিশ্চিত অবস্থানে রয়েছে। ইউরোজোন নিজেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি এবং বৈশ্বিক চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অর্থাৎ প্রয়োজন হলে ইউরোপেরও যথেষ্ট প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা আছে।
কিন্তু ক্ষমতা থাকা আর সেটি ব্যবহার করার রাজনৈতিক সক্ষমতা এক বিষয় নয়।
ইউরোপের নীতিনির্ধারণী কাঠামো বিভক্ত। সদস্যদেশগুলোর স্বার্থও সবসময় এক নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের ঘাটতি কমাতে সক্ষম হয় এবং একই সময়ে চীন তার উদ্বৃত্ত কমাতে অনাগ্রহী থাকে, তাহলে বৈশ্বিক উদ্বৃত্ত শোষণের চাপ ইউরোপের ওপর গিয়ে পড়তে পারে।
এর পরিণতি হতে পারে ইউরোপের শিল্পভিত্তি দুর্বল হওয়া, ঋণ বাড়া এবং প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া।
সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ঝুঁকি কমাতে গিয়ে এমন নীতি গ্রহণ করতে পারে, যার সম্মিলিত ফল বৈশ্বিক ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
সমন্বয়ের সুযোগ কি ইতোমধ্যে সংকুচিত?
বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সবচেয়ে ভালো পথ ছিল বড় অর্থনীতিগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ। কিন্তু এখন প্রত্যেক দেশ ক্রমশ নিজের ক্ষতি ঠেকানোর দিকে মনোযোগী হচ্ছে।
চীন উদ্বৃত্ত ধরে রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র ঘাটতি কমাতে চায়। ইউরোপ যদি একইভাবে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য সক্রিয় হয়, তাহলে সমন্বয়ের বোঝা মূলত উদ্বৃত্ত দেশগুলোর দিকে সরে যেতে পারে। তাদের তখন রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে সরে অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে।
কিন্তু ইউরোপ যদি রাজনৈতিকভাবে তা করতে না পারে, তাহলে বৈশ্বিক উদ্বৃত্তের বড় অংশ তাকে শোষণ করতে হতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে আজকের চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য দ্বন্দ্ব আরও বিস্তৃত হয়ে চীন-ইউরোপ সংঘাতে রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে চীন ও ইউরোপ উভয়েই চেষ্টা করবে ভবিষ্যতের সমন্বয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য অন্য পক্ষকে দিয়ে দিতে।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস একটি বিষয় নিশ্চিত করে: বড় বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা চিরস্থায়ী হয় না। কোনো না কোনোভাবে তার সমন্বয় ঘটবেই।
অনিশ্চয়তা শুধু এক জায়গায়—সমন্বয়টি কতটা বেদনাদায়ক হবে, আর সেই বেদনার সবচেয়ে বড় অংশ কার অর্থনীতি, কার কর্মসংস্থান এবং কার রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বহন করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তাই শুধু বাণিজ্যযুদ্ধ নয়। আসল ঝুঁকি হলো, প্রত্যেক বড় অর্থনীতি যদি নিজের ক্ষতি কমাতে গিয়ে অন্যের ওপর সমন্বয়ের বোঝা ঠেলে দেয়, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্য ফেরার প্রক্রিয়াই আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। আর ইতিহাস বলে, এমন পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত কেউই পুরোপুরি নিরাপদ থাকে না।
মাইকেল পেটিস 


















