যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। নতুন করে ওয়াশিংটনের সমালোচনা ও কটাক্ষের জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘কঠোর হওয়ার ভান’ না করে আলোচনায় আন্তরিক হতে হবে।
মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটাক্ষ, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও শক্ত অবস্থান দেখানোর চেষ্টা বন্ধ করে সত্যিকার অর্থে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে আগ্রহী হয়, তাহলে কানাডা আবার আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, “আমেরিকানরা যখন কটাক্ষ করা, ব্যঙ্গ করা এবং কঠোর হওয়ার ভান করা বন্ধ করে আলোচনায় সত্যিকার অর্থে আন্তরিক হবে, তখন আমরা আলোচনা করতে পারি।”
বাণিজ্য আলোচনায় বড় ধরনের মতবিরোধ
গত ২১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কার্নির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু শর্ত চাপিয়ে দিতে চাইছে, যার ফলে কানাডার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে একসময় দেশটির মাটিতেই বিলীন হয়ে যেতে পারে।
কার্নি স্পষ্ট করে বলেন, কানাডা এমন কোনো চুক্তি মেনে নেবে না, যার মাধ্যমে কানাডীয় শিল্পগুলো কার্যত মার্কিন কোম্পানির অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
বিশেষ করে গাড়ি শিল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে শর্ত দিচ্ছে, তাকে ‘অপ্রতিযোগিতামূলক’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। পাশাপাশি ফরাসি ভাষা ও কানাডার সাংস্কৃতিক সুরক্ষা নিয়েও ওয়াশিংটন পরিবর্তন চাচ্ছে বলে জানান কানাডার প্রধানমন্ত্রী।

কার্নির মতে, এসব দাবির যেকোনো একটিই দুই দেশের মধ্যে চুক্তি আটকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের কটাক্ষ
বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডাকে নিয়ে একের পর এক কটাক্ষ করেন। এমনকি অন্টারিও হ্রদের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা হ্রদ’ রাখার প্রস্তাবও দেন তিনি।
এর পাশাপাশি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট কানাডার সঙ্গে পাল্টাপাল্টি শুল্কযুদ্ধে জড়ানোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কানাডার চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বড়।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও কানাডার সামরিক বাহিনীকে ব্যঙ্গ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি প্রকাশ করেন। ছবিতে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দুই নারী ক্যাডেটকে দেখা যায়। ছবিটির সঙ্গে লেখা ছিল, ‘এটাই বাস্তব।’
কার্নি এই পোস্টকে মন্ত্রীর পদের মর্যাদার নিচে বলে মন্তব্য করেন। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পোস্টটি সরিয়ে নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
পাল্টা আক্রমণ বেসেন্টের
কার্নির বক্তব্যের জবাবে বেসেন্টও তীব্র ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, কার্নি তার এবং হেগসেথের কাছ থেকে ‘মৌখিকভাবে কঠোর জবাব’ পেয়েছেন।
কার্নির আলোচনায় ফেরার আহ্বান প্রসঙ্গে বেসেন্ট বলেন, “যুদ্ধের কথা তো তিনিই বলেছিলেন।”
তবে কার্নি জানিয়েছেন, কানাডা নিজের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো শর্ত মেনে নেবে না।
অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে বাধা মানবে না কানাডা
কার্নি আরও অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ভবিষ্যতে কানাডা অন্য দেশগুলোর সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাণিজ্য চুক্তি করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ুক।

তিনি বলেন, কানাডা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং কোন কোন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করবে, সেই সিদ্ধান্ত কানাডাই নেবে।
তবে একই সঙ্গে কার্নি স্বীকার করেছেন, আলোচনা ভেঙে যাওয়ার আগে দুই দেশের মধ্যে এমন কিছু বিষয় নিয়ে অগ্রগতি হয়েছিল, যা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারত।
নির্বাচনে জয়, শক্ত অবস্থানে কার্নি
ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধের মধ্যেই কার্নি রাজনৈতিকভাবে কিছুটা শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছেন। সোমবার কানাডার লিবারেল পার্টি তিনটি বিশেষ নির্বাচনের সবকটিতে জয় পেয়েছে।
ক্যুবেকের চিকুটিমি-লে-ফিয়র্ড আসনে লিবারেলদের বড় জয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সেখানে রক্ষণশীল দল তৃতীয় অবস্থানে ছিল।
এই জয়ের ফলে ৩৪৩ সদস্যের কানাডীয় পার্লামেন্টে লিবারেলদের আসনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৩-এ। ফলে ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য ও কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়ে দর-কষাকষিতে কার্নির রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে।

কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার হুমকি
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক নেলসন ওয়াইজম্যান বলেন, কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করার ট্রাম্পের বারবার দেওয়া হুমকি ক্যুবেকে বিশেষভাবে স্পর্শকাতর।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি কানাডাকে নিজেদের অংশ করে নেয় এবং ফরাসি ভাষার মর্যাদা হারিয়ে যায়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে ক্যুবেকের মানুষ।
এদিকে দুই দেশের সর্বশেষ বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প কানাডার প্রায় ২০০ কোটি ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন।
জবাবে কানাডাও প্রায় ২০০ কোটি ডলারের মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে এসব শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা, যার হার হবে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।
এর মধ্যেই ট্রাম্প বারবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আসছেন। ফলে বাণিজ্য বিরোধ এখন দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছাড়িয়ে কানাডার সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নেও রূপ নিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















