হিমালয়ে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার এক সপ্তাহ পর নেপালে নিখোঁজ হাজারো মানুষের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। বুধবার দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যায় এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৫০ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪ হাজার মানুষ।
চীনের সীমান্তবর্তী নেপালের বিভিন্ন শহর ও উপত্যকায় ভয়াবহ বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজ অনেক মানুষ এসব ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারেন।
ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকার আশঙ্কা
উদ্ধারকারী দলগুলো এখনো কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গে জীবিত মানুষ খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূগর্ভস্থ অংশে কর্মীদের থাকার জন্য কক্ষ ও বিভিন্ন জায়গা রয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আরও অন্তত ৬৩৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের কয়েকজন সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সময় যত গড়াচ্ছে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের জীবিত থাকার সম্ভাবনা ততই কমছে। তবে উদ্ধার অভিযান এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
উদ্ধার থেকে পুনর্বাসনে নজর
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, সরকারের মনোযোগ ধীরে ধীরে অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম থেকে পুনর্বাসন এবং পুনর্গঠনের দিকে সরানো হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন রক্ষা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকাগুলো পুনর্গঠনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় প্রায় ২২ লাখ টন ধ্বংসাবশেষ জমেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভবনের ধ্বংসাবশেষ, পাথর ও পলি। এই বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ নেপালের ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা এবং পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জের চিত্র তুলে ধরছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
বন্যার পর বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য স্থাপিত অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি। অতিরিক্ত মানুষের ভিড়, দূষিত পানি এবং ক্ষতিগ্রস্ত চিকিৎসাকেন্দ্রের কারণে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নুওয়াকোট ও রাসুয়া জেলায় প্রায় ৩ হাজার ৯০০ মানুষ এখনো নিখোঁজ। এসব এলাকার ২৭টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষ অবস্থান করছেন।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্ভাব্য রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে নজরদারি ও জরুরি ব্যবস্থা জোরদার করেছে নেপাল সরকার।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
হিমালয় অঞ্চলে ভবিষ্যতে এ ধরনের হিমবাহজনিত আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীও প্রশ্ন তুলেছেন, ঠিক কী কারণে বরফ ও পাথরের বিশাল স্তর ধসে পড়ল এবং এত বিপুল পরিমাণ পানি কীভাবে সৃষ্টি হলো। তাঁর মতে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও গভীরভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
চীনও এই বন্যার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্রের কথা জানিয়েছে। সীমান্তের ওপারে তিব্বতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। সেখানে সরকারি হিসাবে ১৬ জন নিহত এবং ৫৪৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

বিপর্যয়ের পর দীর্ঘ পুনর্গঠনের লড়াই
নেপালের সাম্প্রতিক এই দুর্যোগ শুধু প্রাণহানি নয়, অবকাঠামো ও জনজীবনের ওপরও ব্যাপক আঘাত হেনেছে। বিপুল ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ঘরবাড়ি, সড়ক ও জনসাধারণের স্থাপনা পুনর্গঠন করতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।
নিখোঁজদের উদ্ধারের শেষ চেষ্টা চললেও সময়ের সঙ্গে জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। এখন উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিই হয়ে উঠছে নেপালের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















