দক্ষিণ লেবাননে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে ইসরায়েল। নতুন ঘাঁটি নির্মাণ, প্রতিরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর মধ্য দিয়ে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সীমান্তজুড়ে ধ্বংস আর জনশূন্যতা
দক্ষিণ লেবাননের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলঘেঁষা সড়ক এখন অনেকটাই জনশূন্য। একসময় যেখানে কৃষিকাজ ও বসতি ছিল, সেখানে এখন পরিত্যক্ত জমি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলি বিমান হামলায় বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে।
নাকুরা শহরের কাছে লেবাননের সেনাবাহিনীর একটি তল্লাশিচৌকি দেশটির উপস্থিতির শেষ দৃশ্যমান চিহ্নগুলোর একটি। এর কিছু দূরেই ইসরায়েলি পতাকা দেখা যায় এবং সেখান থেকে শুরু হয়েছে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকা। ইসরায়েলের অনুমতি ছাড়া ওই এলাকায় প্রবেশ করা যায় না।
বর্তমানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড লেবাননের মোট আয়তনের প্রায় পাঁচ শতাংশ। সীমান্ত থেকে কোনো কোনো এলাকায় এই নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
নতুন সামরিক ঘাঁটি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, ইসরায়েল দখলকৃত এলাকায় চারটি নতুন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। এর ফলে সেখানে ইসরায়েলি সামরিক অবস্থানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে নয়টিতে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সম্প্রতি দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত এলাকা পরিদর্শনের সময় সেনাবাহিনীকে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইসরায়েলের দাবি, উত্তরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে হিজবুল্লাহর রকেট ও বিস্ফোরকবাহী ড্রোনের হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখতেই একটি নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরি করা হচ্ছে। তবে এই অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদি দখলের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন অনেকে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলি অবস্থানগুলো আরও সুসংহত ও সুরক্ষিত করা হয়েছে। সামরিক তৎপরতার সহায়ক হিসেবে বেসামরিক লোকজনের মাধ্যমে ভবন ধ্বংস ও প্রকৌশলগত কাজ চালানোর ঘটনাও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পরও হামলা ও অভিযান
জুনে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হলেও দক্ষিণ লেবাননে সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। লেবাননের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার দাবি, যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল পাঁচ হাজারের বেশি বার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, গোলাবর্ষণ এবং সীমান্ত অতিক্রম করে সেনাদের অভিযান রয়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনী এসব তৎপরতার কিছু অংশকে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার অভিযান হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তবে অভিযোগগুলোর সব ক্ষেত্রে হুমকির তাৎক্ষণিকতা বা অস্তিত্ব স্পষ্ট নয়।
হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েলের ভেতরে হামলা চালায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে লেবাননের ভেতরে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ঘটনা ঘটেছে।
গ্রামগুলোতে ফিরতে পারছেন না বাস্তুচ্যুত মানুষ
দক্ষিণ লেবাননের বহু গ্রাম কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। শত শত হাজার লেবানিজ মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। তারা কবে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারবেন, কিংবা আদৌ ফিরতে পারবেন কি না—তা অনিশ্চিত।
লেবাননের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার মতে, ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থান সম্প্রসারণ, বাড়িঘর ধ্বংস এবং আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলো থেকে মনে হচ্ছে, এসব এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত ফিরে আসা ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অবশ্য বলেছে, যেসব ভবন ধ্বংস করা হয়েছে সেগুলো হিজবুল্লাহ সামরিক কাজে ব্যবহার করত এবং তাদের অভিযান আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হয়েছে।
হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে অচলাবস্থা
লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের অন্যতম শর্ত হিসেবে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ দাবি করছে ইসরায়েল। কিন্তু লেবানন সরকার সংগঠনটির সম্মতি ছাড়া এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারছে না।

দুই দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি কাঠামোগত সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে এবং সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ যাচাই করার ব্যবস্থাও থাকার কথা ছিল।
কিন্তু সেই পরিকল্পনায় এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। হিজবুল্লাহর নেতা নাইম কাসেম প্রস্তাবটিকে অপমানজনক আত্মসমর্পণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সংগঠনটির অবস্থান হলো, ইসরায়েল সম্পূর্ণভাবে লেবানন থেকে সরে যাওয়ার পরই অস্ত্র নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
গাজার মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী এক ইউরোপীয় কূটনীতিকের মতে, নির্দিষ্ট এলাকায় লেবাননের সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা আপাতত কার্যত থেমে গেছে। তার আশঙ্কা, দক্ষিণ লেবানন ধীরে ধীরে গাজার মতো পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
ইসরায়েলি বাহিনী নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে এবং আপাতত সেখান থেকে সরে যাওয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদি দখল, বাস্তুচ্যুতি এবং নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আরও গভীর হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















