কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর আবারও সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মঙ্গলবারের ব্যাপক সামরিক অভিযানের পর বুধবার দুই দেশকে ফের যুদ্ধের অবস্থানে দেখা গেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে মঙ্গলবার এক দফা হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সামরিক সরঞ্জাম, মাইন স্থাপনের সক্ষমতা এবং যোগাযোগকেন্দ্রকে লক্ষ্য করা হয়।
ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যমও দেশটির একাধিক এলাকায় হামলার খবর জানিয়েছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালির আশপাশের এলাকাগুলো ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজকে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ না করার জন্য ইরান আগে থেকেই হুমকি দিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে। ইরানের সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, জর্ডান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানি গণমাধ্যম বাহরাইনেও হামলার খবর জানিয়েছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জর্ডানে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিক মূল্যায়নে সেখানে কোনো মার্কিন সেনা হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে। এর মধ্যে ১০টি ধ্বংস করা হয় এবং তিনটি প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে পড়ে। বাহরাইনও জানিয়েছে, ইরানের কয়েকটি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আরও দাবি করেছে, উত্তর ইরাকের এরবিলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। তবে ইরাক বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই এই দাবি নিশ্চিত করেনি।
জুলাইয়ের পর সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ
মঙ্গলবারের পাল্টাপাল্টি হামলা জুলাইয়ের পর দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই পক্ষই হামলা থেকে বিরত ছিল। তবে সেই সময়েও আলোচনায় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
যুদ্ধের বিরতিতে দুই দেশের ওপরই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই সংকটে থাকা ইরানের অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির প্রচলিত সামরিক সক্ষমতাও দুর্বল হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও যুদ্ধের চাপ বাড়ছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার অত্যন্ত নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের কড়া বক্তব্য
যুদ্ধের নতুন উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্প ইরানের ওপর আরও চাপ প্রয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ইরানের অর্থনীতি ধসে পড়ছে।
ইরানের জনগণকে নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আরও কঠোর পাল্টা জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলে আরও ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করা যেকোনো দেশকেও এর পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছে ইরান।
বিয়ের অনুষ্ঠানে নিহত ৫, আহত অর্ধশতাধিক
নতুন সংঘাতের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় সিরিক এলাকার কাছে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, সেখানে হামলায় পাঁচজন নিহত এবং অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন।
ইরানের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নিহতদের মধ্যে চার বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে আহতের সংখ্যা ৬৮ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনাটি নিয়ে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাকে যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় বেসামরিক মানুষের ওপর সংঘটিত গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা এর আগে মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণে ১৬০ জন নিহত হওয়ার ঘটনাও স্মরণ করিয়েছে।
ওই বিদ্যালয়ে হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি। তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, পুরোনো লক্ষ্যসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের কারণে হামলাটি হয়ে থাকতে পারে।
সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
নতুন করে হামলা শুরু হওয়ায় কয়েক সপ্তাহের নীরবতা কার্যত শেষ হয়ে গেল। দুই পক্ষের বক্তব্যেও আপসের পরিবর্তে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত মিলছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা—সব মিলিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এখন নতুন ও আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















