দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যাওয়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের আঁকা একটি বিখ্যাত চিত্রকর্ম এখন লন্ডনের ওয়ালেস সংগ্রহশালার প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। যুদ্ধের অস্থিরতার মধ্যে ছবিটি চুরি হয়েছিল, নাকি দখলদারদের সহায়তায় হাতবদল হয়েছিল—তার সুনির্দিষ্ট উত্তর আজও মেলেনি।
চিত্রকর্মটির নাম ‘লা দ্রাগোনিয়ের, ক্যাপ মার্তাঁ’। ভূমধ্যসাগরীয় ফ্রান্সের একটি পাহাড়ি এলাকায় জলপাইগাছঘেরা দৃশ্য এতে ফুটিয়ে তুলেছিলেন চার্চিল। বর্তমানে এটি ‘উইনস্টন চার্চিল: দ্য পেইন্টার’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে আগামী ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত প্রদর্শিত হচ্ছে।
চার্চিলের আঁকা ছবিতে মুগ্ধ ছিলেন পিকাসো
চার্চিল ছবিটি এঁকেছিলেন ১৯৩৭ সালে ফরাসি রিভিয়েরার ক্যাপ মার্তাঁ এলাকায় অবস্থানের সময়। তিনি সেখানে দ্য এস্তাঁভিল পরিবারের অতিথি ছিলেন। বিদায় নেওয়ার সময় অভিজাত পরিবারের সদস্য রেনে দ্য এস্তাঁভিলকে ছবিটি উপহার দেন।
ছবিটির প্রতি মুগ্ধ ছিলেন বিখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসোও। ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে প্যারিসে ছবিটি দেখার পর তিনি মন্তব্য করেছিলেন, অন্য কাজে ব্যস্ত না থাকলে চার্চিল একজন পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন।
যুদ্ধের সময় কোথায় হারিয়ে গেল ছবিটি
১৯৪০ সালে জার্মান বাহিনী ফ্রান্স দখল করার পর ছবিটির ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে দ্য এস্তাঁভিল পরিবারের মধ্যেই একাধিক ভিন্ন কাহিনি রয়েছে।
একটি বর্ণনা অনুযায়ী, নিরাপদে রাখার জন্য ছবিটি পরিবারের এক বন্ধুর কাছে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই ব্যক্তি মারা গেলে কোনো এক পর্যায়ে ছবিটি প্যারিসের এক শিল্পব্যবসায়ীর হাতে চলে যায়। অন্য একটি গল্পে বলা হয়, ছবিটি মোনাকোয় পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু সেখানে গিয়ে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরিবারের আরেকটি বক্তব্য ছিল, ছবিটি সরাসরি চুরি হয়ে গিয়েছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত ছবিটি প্যারিসের শিল্পব্যবসায়ী মার্তাঁ ফাবিয়ানির কাছে পৌঁছায়।
নাৎসি সহযোগীর হাতে ছবিটি
ফাবিয়ানির বিরুদ্ধে জার্মান দখলদারদের সঙ্গে সহযোগিতা এবং শিল্পকর্ম কেনাবেচার মাধ্যমে তাদের স্বার্থে কাজ করার অভিযোগ ছিল। ইহুদি মালিকদের কাছ থেকে শিল্পকর্ম লুটে নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত জার্মান বাহিনীর একটি বিশেষ সংগঠনের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল বলে জানা যায়।
তবে ফাবিয়ানির হাতে থাকা প্রতিটি শিল্পকর্ম যে অবৈধভাবে অর্জিত হয়েছিল, এমনটা বলা যায় না। তাছাড়া দ্য এস্তাঁভিল পরিবার ইহুদি ছিল না।
শিল্প-ইতিহাসবিদ এমিলি এসার জানিয়েছেন, ছবিটি কীভাবে ফাবিয়ানির হাতে গেল, তার পরিষ্কার ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। তবে যুদ্ধকালীন বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ছবিটির নতুন মালিক লাভবান হয়েছিলেন এবং কোনো একভাবে চিত্রকর্মটি ফাবিয়ানির হাতে পৌঁছেছিল বলে তিনি মনে করেন।
হিটলারের আঁকা ছবির সঙ্গে বিনিময়ের প্রস্তাব?
১৯৪৫ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে ফাবিয়ানির গ্যালারিতে একটি প্রদর্শনীতে চার্চিলের ছবিটি রাখা হয়। প্যারিস মুক্ত হওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পর আয়োজিত এই প্রদর্শনী থেকে যুদ্ধরত মার্কিন সেনাদের বিনোদনের জন্য পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছিল।
সেখানেই পিকাসো ছবিটি দেখেছিলেন।
প্রদর্শনীর সময় ফাবিয়ানি আরও বিস্ময়কর একটি দাবি করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্রান্স দখলের সময় এক জ্যেষ্ঠ জার্মান কর্মকর্তা ছবিটি কিনতে চেয়েছিলেন। এমনকি চার্চিলের ছবির বদলে জার্মান নেতা অ্যাডলফ হিটলারের আঁকা একটি ছবি দেওয়ার প্রস্তাবও নাকি দেওয়া হয়েছিল।
ফাবিয়ানি দাবি করেছিলেন, তিনি দেশপ্রেমের কারণে চার্চিলের ছবিটি জার্মান মালিকের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তবে তার এই বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করার মতো পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধের পর আবার পরিবারের হাতে
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ফাবিয়ানিকে জার্মান দখলদারদের স্বার্থে শিল্পকর্ম বিক্রির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ফরাসি কর্তৃপক্ষ তার শিল্পকর্মগুলো জব্দ করে। সেই তালিকায় চার্চিলের ছবিটিও ছিল।
এরপর দুই অজ্ঞাত দাবিদার দাবি করেন, ছবিটির প্রকৃত মালিক তারা, ফাবিয়ানি নন। পরে কোনো এক পর্যায়ে ছবিটি অস্ট্রেলিয়ার শিল্পসংগ্রাহক এডওয়ার্ড ওয়াটারফিল্ড হেওয়ার্ডের হাতে যায়।
১৯৬১ সালে হেওয়ার্ড ছবিটি লন্ডনের সোথেবি নিলামঘরে বিক্রির জন্য তোলেন। সেখানেই ঘটনাচক্রে ছবিটি দেখতে পান রেনে দ্য এস্তাঁভিলের মেয়ে অ্যান-মারি ওপেনহেইম।
সে সময় যুদ্ধের সময় হারিয়ে যাওয়া শিল্পকর্ম নিয়ে আইনি দাবি তোলা তুলনামূলকভাবে কঠিন ছিল। তাই দাবি জানানোর পরিবর্তে তিনি নিজেই নিলামে অংশ নেন এবং মাত্র ৫০০ পাউন্ডে ছবিটি কিনে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনেন।
কয়েক দশকে বেড়েছে ছবিটির মূল্য
অ্যান-মারি বিবাহবিচ্ছেদের পর ১৯৬৬ সালে ছবিটি আবার সোথেবির মাধ্যমে বিক্রি করেন। এবার এর দাম ওঠে ২ হাজার পাউন্ড।
২০১৮ সালে ছবিটি আবার লন্ডনের সোথেবি নিলামে ওঠে। তখন এটি বিক্রি হয় ৩ লাখ ৫৮ হাজার পাউন্ডে। এতে বোঝা যায়, সময়ের সঙ্গে চার্চিলের আঁকা শিল্পকর্মের চাহিদা কতটা বেড়েছে।
বর্তমানে ছবিটির মালিক একজন আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংগ্রাহক, যার সংগ্রহে চার্চিলের আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম রয়েছে।
মালিকানা নিয়ে দাবি ওঠার আশঙ্কা নেই
ওয়ালেস সংগ্রহশালার পরিচালক জাভিয়ের ব্রে মনে করেন, ছবিটি দ্য এস্তাঁভিল পরিবারের কাছ থেকে বের হওয়ার পর কোথায় ছিল—এ নিয়ে একাধিক পরস্পরবিরোধী গল্প এবং ফাবিয়ানির বিতর্কিত অতীত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।
তবে ১৯৬১ সালে পরিবারের সদস্য নিজেই ছবিটি পুনরায় কিনে নেওয়ায় বর্তমানে এর বিরুদ্ধে যুদ্ধকালীন সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার দাবি ওঠার কোনো ইঙ্গিত নেই।
ব্রের মতে, ওয়ালেস সংগ্রহশালার বর্তমান প্রদর্শনীতে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে উৎকৃষ্ট চিত্রকর্ম। তিনি আশা করছেন, ছবিটির যুদ্ধকালীন যাত্রা নিয়ে এই অনুসন্ধান প্রকাশের পর এর রহস্যময় ইতিহাস সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















