কোনো দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা শুধু সে কত পণ্য উৎপাদন করে, কত কারখানা স্থাপন করে কিংবা কত বিনিয়োগ আকর্ষণ করে—তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। উৎপাদিত পণ্য কত দ্রুত ও কম খরচে বাজারে পৌঁছাতে পারে, মানুষ কত সহজে কাজ ও ব্যবসার জন্য চলাচল করতে পারে এবং একটি দেশ তার প্রতিবেশী অর্থনীতির সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারে, তার ওপরও উন্নয়নের গতি নির্ভর করে।
এই কারণেই পরিবহন সংযোগকে আমরা নিছক অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় হিসেবে দেখতে পারি না। গ্লোবাল সাউথের জন্য এটি অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক একীভবন এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত স্বনির্ভরতার প্রশ্ন।
আজকের বাস্তবতা হলো, গ্লোবাল সাউথের বহু দেশ ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি হলেও অর্থনৈতিকভাবে পরস্পর থেকে দূরে। রাস্তা, রেল, বন্দর ও নৌপথের ঘাটতির পাশাপাশি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নীতিগত অসামঞ্জস্য এই দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে যে ভৌগোলিক নৈকট্য বাণিজ্য ও শিল্পায়নের শক্তি হতে পারত, তা অনেক ক্ষেত্রেই অব্যবহৃত সম্ভাবনায় পরিণত হয়েছে।
আমাদের কাছে এটাই মূল সমস্যা: গ্লোবাল সাউথকে শুধু বেশি অবকাঠামো নয়, আরও বুদ্ধিমান সংযোগব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
রাস্তা বানালেই সংযোগ তৈরি হয় না
উন্নয়ন পরিকল্পনায় বড় সড়ক, রেললাইন বা বন্দর নির্মাণ সহজেই দৃশ্যমান সাফল্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু একটি দেশের সীমান্তে গিয়ে সেই সড়ক যদি থেমে যায়, অথবা সীমান্ত পার হওয়ার পর পণ্যকে দিনের পর দিন কাগজপত্রের জটিলতায় আটকে থাকতে হয়, তাহলে অবকাঠামোর প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য অনেকটাই হারিয়ে যায়।
সংযোগের শক্তি তাই শুধু ইট, পাথর, ইস্পাত ও কংক্রিটে নিহিত নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে সীমান্তপারের বাণিজ্য দ্রুত ও পূর্বানুমানযোগ্য হবে। প্রয়োজন অভিন্ন বা সামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়ম, সহজ শুল্কপ্রক্রিয়া, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিভিন্ন দেশের পরিবহনব্যবস্থার মধ্যে পারস্পরিক সামঞ্জস্য।
এখানেই ‘নরম সংযোগ’-এর গুরুত্ব। শক্ত অবকাঠামো দৃশ্যমান; কিন্তু নরম সংযোগের সাফল্য বোঝা যায় পণ্য কত দ্রুত সীমান্ত পার হচ্ছে, ব্যবসার খরচ কত কমছে এবং একটি ট্রান্সপোর্ট করিডর বাস্তবে কতটা ব্যবহারযোগ্য হচ্ছে তার মাধ্যমে।
অতএব নতুন সড়ক নির্মাণের চেয়ে কখনও কখনও বিদ্যমান সড়ককে কার্যকর করার প্রশাসনিক সংস্কারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গ্লোবাল সাউথের সবচেয়ে বড় অপচয় তার ভৌগোলিক সম্ভাবনা
গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে বহু ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দূরত্ব খুব কম। অথচ সীমান্তপারের বাণিজ্য এখনও ব্যয়বহুল ও জটিল। ভারত ও আসিয়ানের সম্পর্ক এ ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। মিয়ানমারের মাধ্যমে স্থলসংযোগের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামো ও বিনিয়োগের ঘাটতি সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দিতে পারেনি।
এই ধরনের পরিস্থিতি শুধু পরিবহন খাতের ব্যর্থতা নয়; এটি উন্নয়ন সম্ভাবনার অপচয়।
একটি কার্যকর আন্তঃদেশীয় করিডর তৈরি হলে তার প্রভাব একটি সড়কের দুই প্রান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না। নতুন শিল্পকেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে, উৎপাদন খরচ কমতে পারে, আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হতে পারে এবং বিদেশি ও দেশীয় বিনিয়োগের নতুন প্রবাহ সৃষ্টি হতে পারে।
কিন্তু এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য প্রকৌশলগত দক্ষতার পাশাপাশি রাজনৈতিক আস্থা প্রয়োজন। একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে কোনো সরকার একা সফল হতে পারে না। ভিন্ন আইন, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয় ছাড়া আন্তঃদেশীয় যোগাযোগের প্রকল্প কাগজে যত আকর্ষণীয়ই হোক, বাস্তবে তা ধীরগতির হয়ে পড়তে পারে।
সমুদ্রপথে সামান্য বিঘ্ন, দক্ষিণের জন্য বড় ধাক্কা
গ্লোবাল অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো—সমুদ্রপথ ছাড়া আধুনিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রায় অচল। কিন্তু এই নির্ভরতার মধ্যেই বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর এবং পানামা খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোতে সংঘাত, নিরাপত্তা সংকট কিংবা জলবায়ুজনিত বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায়। তেল, গ্যাস, খাদ্যশস্য, আকরিক ও সারের মতো পণ্যের সরবরাহে চাপ তৈরি হলে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গ্লোবাল সাউথের জন্য বিপদটি দ্বিগুণ। একদিকে আমদানি করা পণ্যের মূল্য বাড়ে, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যায়। জাহাজভাড়া, জ্বালানি ও বীমার বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করে।
এখানে জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনৈতিক সংঘাত একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। কোনো একটি বন্দর বা সমুদ্রপথের সমস্যা এখন শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের সমস্যা নয়; তা বহু দূরের খাদ্য, জ্বালানি ও শিল্প সরবরাহব্যবস্থায় আঘাত করতে পারে।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: সংযোগের অর্থ শুধু দ্রুত চলাচল নয়, বিকল্প পথ ও স্থিতিস্থাপকতাও।
অবকাঠামোর অর্থায়ন: উন্নয়নের সঙ্গে ঋণের ভারসাম্য
পরিবহন অবকাঠামোর প্রয়োজন যত বড়, অর্থায়নের সংকটও তত গভীর। বড় প্রকল্পের বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি, অথচ গ্লোবাল সাউথের অনেক সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা সীমিত। দেশীয় পুঁজিবাজারও সবসময় বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাতে পারে না।
ফলে বৈদেশিক ঋণ, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়। এই অর্থ ছাড়া বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন। কিন্তু এখানেই নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়।
অবকাঠামো উন্নয়ন যদি ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি তৈরি করে, তাহলে ঋণ একটি বিনিয়োগ। কিন্তু প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হলে একই ঋণ ভবিষ্যতের বোঝায় পরিণত হতে পারে। সুদের হার, পুনঃঅর্থায়ন এবং ঋণ পরিশোধের চাপ তখন রাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে পারে।
তাই প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা পাওয়া যাবে’ নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন অর্থায়ন কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই, কোন প্রকল্প আঞ্চলিকভাবে সবচেয়ে বেশি সুফল দেবে এবং কীভাবে বেসরকারি বিনিয়োগকে ঝুঁকি ভাগাভাগির মাধ্যমে আকৃষ্ট করা যায়।
সংযোগের রাজনীতিকে উন্নয়নের রাজনীতিতে রূপ দিতে হবে
গ্লোবাল সাউথের পরিবহন সংযোগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
প্রথমত, জাতীয় সরকারগুলোকে নিজেদের পরিবহন অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রকল্প বাছাইয়ে রাজনৈতিক দৃশ্যমানতার বদলে অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে নীতি ও নিয়মের সামঞ্জস্য বাড়াতে হবে। সীমান্তপারের একটি করিডর তখনই কার্যকর হবে, যখন সংশ্লিষ্ট সব দেশ সেটিকে একই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিচালনা করবে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয়ী অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা, প্রকল্প প্রস্তুতি এবং ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা দরকার। এতে বেসরকারি মূলধনও অবকাঠামো খাতে প্রবেশের বেশি সুযোগ পাবে।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল নিরাপত্তাকেও এই কাঠামোর অংশ করতে হবে। ভবিষ্যতের পরিবহনব্যবস্থা শুধু সড়ক ও বন্দরের ওপর নির্ভর করবে না; তথ্যের দ্রুত আদান-প্রদান, ডিজিটাল শুল্কব্যবস্থা এবং নিরাপদ আন্তঃদেশীয় তথ্যপ্রবাহও বাণিজ্যের গতি নির্ধারণ করবে।
আমাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ নির্ভরতা নিয়ে
গ্লোবাল সাউথের অবকাঠামো উন্নয়নে বৈদেশিক অর্থ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব অপরিহার্য হতে পারে। কিন্তু উন্নয়নের নামে এমন কোনো কাঠামো তৈরি করা উচিত নয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশগুলোকে অতিরিক্ত আর্থিক বা কৌশলগত নির্ভরতার মধ্যে ফেলে দেয়।
একটি ভালো সংযোগব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যা দেশগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ালেও তাদের নিজস্ব বিকল্প ও স্থিতিস্থাপকতা কমিয়ে দেয় না। বরং সংকটের সময় বিকল্প বন্দর, বিকল্প পরিবহনপথ এবং বৈচিত্র্যময় সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
এই কারণেই সংযোগের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত পারস্পরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, একতরফা নির্ভরতা নয়।
গ্লোবাল সাউথের সামনে এখন যে সুযোগ রয়েছে, তা শুধু নতুন সড়ক, রেলপথ বা বন্দর নির্মাণের সুযোগ নয়। এটি এমন একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরির সুযোগ, যেখানে দেশগুলো নিজেদের বাজার, উৎপাদন, প্রযুক্তি ও সম্পদকে আরও দক্ষভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা অবকাঠামোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থায়ন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়ম। নতুন করিডর যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পুরোনো সীমান্তপ্রক্রিয়ার সংস্কার। আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব যেমন দরকার, তেমনি দরকার আর্থিক ও কৌশলগত স্বাধীনতার সুরক্ষা।
শেষ পর্যন্ত গ্লোবাল সাউথের উন্নয়ন নির্ভর করবে দেশগুলো কত দ্রুত নিজেদের ভৌগোলিক নৈকট্যকে অর্থনৈতিক সহযোগিতায় রূপ দিতে পারে তার ওপর। রাস্তা আমাদের একে অপরের কাছে নিয়ে আসতে পারে; কিন্তু রাজনৈতিক আস্থা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থই সেই রাস্তা দিয়ে সমৃদ্ধির প্রবাহ নিশ্চিত করবে।
সুজিত সমাদ্দার ও বংশিকা গোয়াল 



















