হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে সামরিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে এখনো সেখানে সামরিক বাহিনী বা যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সিউল। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় নিজেদের জ্বালানি সরবরাহ ও জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছে দেশটি।
দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সরঞ্জাম বা সদস্য পাঠানো হতে পারে। সম্ভাব্য পরিকল্পনায় টহল বিমান, সহায়ক জাহাজ এবং সমুদ্রের মাইন অপসারণকারী ইউনিট রাখার কথা বলা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নিরাপদ রাখতে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়াও সরকারের বিবেচনায় থাকা বিকল্পগুলোর একটি।
এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন হয়নি
তবে দক্ষিণ কোরিয়া এখনো কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ইউনিট মোতায়েনের অনুমোদন দেয়নি। বিদেশে সামরিক সদস্য পাঠানোর আগে আইনগত প্রক্রিয়া, সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি এবং জাতীয় সংসদের অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার আইন অনুযায়ী, বিদেশে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে সরকার উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়নের আগে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার হতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে আলোচনা
হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সঙ্গে আলোচনা করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।
আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল নিরাপদ রাখতে কী ধরনের বাস্তব সহায়তা দেওয়া যায়, সেটিই গুরুত্ব পেতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়া হরমুজ প্রণালিতে সামরিক সহায়তা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সামরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে। তবে সম্ভাব্য এই উদ্যোগ সরাসরি কোনো যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর্যায়ে যাবে না বলেই মনে করছেন তারা।
অধ্যাপক বান কিল-জু সম্ভাব্য উদ্যোগটিকে মাঝারি মাত্রার সামরিক অবদান হিসেবে দেখছেন। তার মতে, দক্ষিণ কোরিয়া আন্তর্জাতিক নৌপথ সুরক্ষায় সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু এর অর্থ ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ
হরমুজ প্রণালি দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি জ্বালানি আমদানির বড় একটি অংশ এই নৌপথের ওপর নির্ভর করে। গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ৬১ শতাংশ এবং ন্যাফথা আমদানির ৫৪ শতাংশ এই পথ দিয়ে এসেছে।
তাই হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ সময় ধরে নৌযান চলাচল ব্যাহত হলে দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানি সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল চুন ইন-বুম মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ সুরক্ষিত রাখা দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই আন্তর্জাতিক উদ্যোগে সহযোগিতা করা সিউলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
জনগণের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন
তবে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের সমর্থন এখনো নিশ্চিত নয়। মার্চে গ্যালাপ কোরিয়ার এক জরিপে ৫৫ শতাংশ মানুষ সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর বিরোধিতা করেন।
সরকার শেষ পর্যন্ত সামরিক মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিলে এটি ২০০৯ সালের পর কোরীয় উপদ্বীপের বাইরে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথম সামুদ্রিক সামরিক অভিযান হতে পারে। ফলে এই সিদ্ধান্ত দেশটির পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক ভূমিকা এখনো চূড়ান্ত নয়। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌপথ সচল রাখার স্বার্থে সিউল বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















