ইউরোপজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার পেছনে রাশিয়ার হাত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে ইউরোপের একাধিক দেশ। বিশেষ করে গত আগস্টে একের পর এক প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার ঘটনায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
জার্মানির লাইপজিগ বিমানবন্দরে বিস্ফোরকবোঝাই চালকবিহীন উড়োজাহাজ পাওয়ার এক মাস পর দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি এ ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছেন। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দাবি করেছেন। রুশ কর্মকর্তারাও অভিযোগটিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবে লাইপজিগের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছে না ইউরোপের নিরাপত্তা মহল। আগস্টজুড়ে ইতালি থেকে এস্তোনিয়া পর্যন্ত প্রতিরক্ষা খাতের বিভিন্ন স্থাপনায় সন্দেহজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো দেশ ইতোমধ্যে রাশিয়ার দিকে আঙুল তুলেছে। আবার কয়েকটি ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে। কিছু অগ্নিকাণ্ড শেষ পর্যন্ত দুর্ঘটনা হিসেবেও চিহ্নিত হতে পারে।
আগস্টজুড়ে একের পর এক নাশকতার ঘটনা
৪ আগস্ট জার্মানির লাইপজিগ বিমানবন্দরে প্রথম চালকবিহীন উড়োজাহাজটি পাওয়া যায়। বিমানবন্দরটি ইউক্রেনে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হয়।
১০ আগস্ট বুলগেরিয়ায় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এমকোর একটি কারখানায় বড় ধরনের আগুন লাগে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, জ্বালানি সরবরাহের সময় একটি ট্রাকে আগুন ধরে যাওয়ার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।
১৩ আগস্ট ইতালির রোমের বাইরে অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কেএনডিএস অ্যামো ইতালির একটি স্থাপনায় আগুন লাগে। পরে সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে। স্থানীয় কৌঁসুলির কার্যালয় সম্ভাব্য বাইরের হস্তক্ষেপের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
১৫ আগস্ট এস্তোনিয়ার রাজধানী তাল্লিনে ইউক্রেনে চালকবিহীন উড়োজাহাজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মিলরেম রোবোটিকসের কারখানায় আগুন লাগে। এ ঘটনায় দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এস্তোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টেন মিখাল জানিয়েছেন, তদন্তকারীরা রুশ নাশকতার সম্ভাবনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
২৫ আগস্ট স্লোভাকিয়ার পুলিশ ইউক্রেনের মালিকানাধীন একটি চালকবিহীন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা নস্যাৎ করার কথা জানায়। ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ দাহ্য মিশ্রণ জব্দ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়াকে দায়ী করে এবং পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের ভাষ্য, তারা কারও নির্দেশে কাজ করছিল।
৩০ আগস্ট পোল্যান্ডে আরও দুটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দেশটির লুবলিনে হেলিকপ্টারের যন্ত্রাংশ তৈরি করা একটি প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগে। প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক জানান, এটি পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ কি না, তা এখনই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে চালকবিহীন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডব্লিউবি গ্রুপের একটি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা আরও স্পষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। নিরাপত্তা ক্যামেরায় মুখোশ পরা এক ব্যক্তিকে দাহ্য পদার্থ ছুড়তে দেখা যায়। টাস্ক এটিকে রাশিয়ার নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড আরও বাড়ানোর ধারাবাহিকতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সেপ্টেম্বরের শুরুতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। জার্মানির মিউনিখে একটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে গাড়ি থেকে দাহ্য পদার্থ ছোড়ার অভিযোগে দুই বুলগেরীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কেন এখন নাশকতা বাড়ছে
সামরিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনায় হামলা অবশ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। অতীতেও রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা নাশকতায় ইউরোপে বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এর মধ্যে পোল্যান্ডের একটি রঙের দোকান এবং একটি আসবাবপত্রের দোকানও ছিল।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো একই সময়ে সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতের একাধিক স্থাপনায় হামলার ঘনত্ব।
লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগের গবেষক দানিয়েলা রিখতেরোভা মনে করেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সামরিক স্থাপনায় হামলার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
তার মতে, ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালিয়ে যুদ্ধকে রাশিয়ার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার পর মস্কোর ওপর চাপ বেড়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া ইউরোপে পাল্টা চাপ তৈরির চেষ্টা করতে পারে।
তার ধারণা, এসব নাশকতার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়া দেশগুলোকে ভয় দেখানো এবং তাদের সমর্থন কমিয়ে দিতে চাপ সৃষ্টি করা।
জার্মানি ধীরে ধীরে ইউক্রেনের অন্যতম বড় সামরিক সহায়তাকারী দেশে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশটি রুশ নাশকতার সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে।
ন্যাটোর দুর্বলতা যাচাইয়ের চেষ্টা?
তবে নাশকতার পেছনে শুধু ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার উদ্দেশ্য রয়েছে—এমনটা মনে করছেন না সবাই।
লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের গবেষক কিয়ার গাইলসের মতে, রাশিয়া ন্যাটোর প্রতিক্রিয়ার সীমা পরীক্ষা করে দেখছে। কোন ধরনের হামলার পর পশ্চিমা দেশগুলো কী পদক্ষেপ নেয়, সেটি বোঝার চেষ্টা করা হতে পারে।
তার মতে, রাশিয়া কোথায় পর্যন্ত যেতে পারবে, কোন পরিস্থিতিতে কতটা প্রতিক্রিয়া হবে এবং কোন জায়গাগুলো দুর্বল—এসব তথ্য সংগ্রহ করাও নাশকতার একটি উদ্দেশ্য হতে পারে।
এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ইউরোপে আরও বড় ধরনের কর্মকাণ্ড চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৪ সালেও বড় ধরনের নাশকতার অভিযোগ
ইউরোপে রুশ নাশকতার ঘটনা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ২০২৪ সালেও একই ধরনের কর্মকাণ্ডের একটি বড় ঢেউ দেখা গিয়েছিল।
সে সময় ইউক্রেনের মিত্ররা রাশিয়ার ভূখণ্ডের আরও গভীরে পশ্চিমা অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার পর নাশকতার ঘটনা বেড়ে যায়।
২০২৪ সালে যুক্তরাজ্য ও পোল্যান্ডে পার্সেলবোমা পাঠানোর একটি পরিকল্পনার অভিযোগও ওঠে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। লিথুয়ানিয়া থেকে পাঠানো চারটি পার্সেলের মধ্যে দুটি আগুন ধরে যায়। একটি যুক্তরাজ্যের একটি গুদামে এবং অন্যটি লাইপজিগ বিমানবন্দরে আগুনের সূত্রপাত ঘটায়।
একটি পার্সেল বিমানবন্দরে মালবাহী বিমানে তোলার কিছুক্ষণ আগে আগুন ধরে যাওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, এটি আরও বড় কোনো হামলার পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা হতে পারে।
কারা এসব নাশকতা চালাচ্ছে
ইউরোপের অধিকাংশ রুশ নাশকতার ঘটনায় সরাসরি রুশ গোয়েন্দা বা সামরিক কর্মকর্তাদের বদলে রাশিয়ার হয়ে কাজ করা ভাড়াটে লোকজনের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে।
তাদের অনেকেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের রুশভাষী নাগরিক। অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে তাদের নিয়োগ করা হয়। রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে অর্থনৈতিক লাভই তাদের প্রধান প্রেরণা বলে ধারণা করা হয়।
অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যক্তিকে রাশিয়ায় থাকা ‘পরিচালনাকারীরা’ অনলাইনের মাধ্যমে নির্দেশ দেয় বলে মনে করা হয়।
আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি এসব নাশকতাকারীকে অনেকটা আত্মঘাতী চালকবিহীন উড়োজাহাজের সঙ্গে তুলনা করেছে। তারা তুলনামূলকভাবে সস্তা, সহজে নিয়োগযোগ্য এবং প্রয়োজন হলে বড় সংখ্যায় ব্যবহার করা যায়। কাজ শেষ হওয়ার পর তাদের হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে নিয়োগকারীরা।
তবে অপেশাদার নাশকতাকারীদের ভুলও বড় বিপদ তৈরি করতে পারে। ২০২৪ সালের পার্সেলবোমা পরিকল্পনায় এক ব্যক্তি নির্ধারিত সংগ্রহস্থল খুঁজে না পাওয়ায় পুরো অভিযান ব্যর্থ হয়ে যায়।
লাইপজিগ বিমানবন্দরের ঘটনায় যদি সত্যিই রাশিয়া পেশাদার লোক ব্যবহার করে থাকে, তাহলে সেটি আরও উদ্বেগজনক। কারণ এর অর্থ হতে পারে, মস্কো এবার আরও নির্ভুল ও সফল হামলা চালানোর চেষ্টা করছে।
তবে লাইপজিগে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো শেষ পর্যন্ত ঠিকভাবে কাজ করেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শীতল যুদ্ধের কৌশলের পুনরাবৃত্তি?
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, ইউরোপে রাশিয়ার বর্তমান নাশকতা অনেকটাই শীতল যুদ্ধের সময়কার কৌশলের সঙ্গে মিলে যায়।
গবেষক দানিয়েলা রিখতেরোভার গবেষণায় দেখা গেছে, সোভিয়েত আমলেও একই ধরনের স্থাপনাকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ছোট আকারের এবং অস্বীকারযোগ্য হামলার মাধ্যমে শান্তিকালীন পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি করা ছিল সেই কৌশলের অংশ।
তার মতে, ইউরোপ এখন যুদ্ধ ও শান্তির মধ্যবর্তী একটি ধূসর অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক নাশকতার ঘটনাগুলো সেই সীমারেখাকে আরও সংকুচিত করছে।
ফলে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ছে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা অনিচ্ছাকৃত সংঘাত
ইউরোপীয় দেশগুলো এখন সবচেয়ে বেশি চিন্তিত সম্ভাব্য ভুল হিসাব নিয়ে। ছোট ছোট নাশকতার ঘটনা একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে না।
যেমন, ২০২৪ সালের কোনো বিস্ফোরক পার্সেল যদি আকাশে থাকা কোনো বিমানে বিস্ফোরিত হতো, তাহলে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারত। একইভাবে লাইপজিগ বিমানবন্দরের চালকবিহীন উড়োজাহাজ যদি কোনো যাত্রীবাহী বিমানকে আঘাত করত, তাহলেও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।
এমন কোনো ঘটনায় ন্যাটোর ওপর সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর চাপ তৈরি হতে পারে।
ইউরোপে ইতোমধ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। তার মধ্যে কোনো নাশকতা যদি বড় প্রাণহানি বা সামরিক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে একটি ছোট ঘটনা দ্রুত বড় আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু বিচ্ছিন্ন অগ্নিকাণ্ড বা নাশকতার ঘটনা নয়। ইউরোপের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে এগুলো রাশিয়া ও পশ্চিমা জোটের মধ্যকার ক্রমশ বাড়তে থাকা ছায়াযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















