০৬:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জেমস ম্যাকনিল হুইসলার: সাধারণ দৃশ্যেই অসাধারণ শিল্পের খোঁজ জন্মদিনের আয়োজনে জেনিফার-নিকোলের ইতালীয় আমেজ, খাবার আর বন্ধুত্বের অনন্য মেলবন্ধন এমিরেটসের প্রিমিয়াম ইকোনমিতে এবার পূর্ণাঙ্গ গোপনীয়তা পর্দা, সঙ্গে বৈদ্যুতিক আসন নিয়ন্ত্রণ এআইয়ের উৎপাদনশীলতা বাড়ছে, কিন্তু লাভ কি শুধু বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর? চোখে জল, হাতে ত্রিবর্ণ পতাকা—শেষ লড়াইয়ে আবেগে ভাসছেন কেটি টেলর স্টিভ আরউইনের মৃত্যুবার্ষিকীতে বাবাকে ‘সুপারহিরো’ বললেন মেয়ে বিন্দি ইউরোপজুড়ে নাশকতার ভয়াবহ বিস্তার, রাশিয়াকেই প্রধান সন্দেহভাজন মনে করছে পশ্চিমারা ৩ বিলিয়ন ডলার তুলতে হংকংয়ে শেয়ারবাজারে আসছে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান মুনশট ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রসীমায় নৌ-ড্রোনের জ্বালানি ভরতে রোবট পরীক্ষা করছে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের তথ্য ফাঁস ঠেকাতে বন্ধ করা হলো বিজ্ঞাপন ট্র্যাকার

বরফ গলছে, বদলাচ্ছে বিশ্বরাজনীতি: কেন গ্রিনল্যান্ড ঘিরে বাড়ছে শক্তির লড়াই

একসময় আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চলকে বিশ্বরাজনীতির প্রায় বাইরে থাকা একটি দুর্গম এলাকা হিসেবে দেখা হতো। বরফে ঢাকা সমুদ্র, ভয়ংকর ঠান্ডা, দীর্ঘ দূরত্ব এবং কঠিন পরিবেশের কারণে মনে করা হতো, এখানে বড় শক্তিগুলোর স্বাভাবিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা খুব একটা পৌঁছাবে না। কিন্তু সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

এর সাম্প্রতিক উদাহরণ ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ডে নতুন করে সেনা মোতায়েন। দেশটির ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ে প্রথমবারের মতো বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণে থাকা তরুণদের গ্রিনল্যান্ডে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাদের কঠিন পরিবেশে প্রশিক্ষণ ও সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

বিষয়টি শুধু কয়েকজন তরুণ সেনাকে বরফের দেশে পাঠানোর ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে অনেক বড় কৌশলগত বার্তা। ডেনমার্ক বোঝাতে চাইছে, গ্রিনল্যান্ড কোনো জনশূন্য বরফের ভূখণ্ড নয়। এটি ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ এবং এই অঞ্চলে নিজের উপস্থিতি ও দায়িত্ব বজায় রাখতে কোপেনহেগেন প্রস্তুত।

কেন হঠাৎ এত গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনল্যান্ড

গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ। আয়তনে এটি পশ্চিম ইউরোপের চেয়েও বড়। তবে এর বিশাল অংশ বরফের চাদরে ঢাকা। সেখানে বসবাস করেন মাত্র প্রায় ৫৭ হাজার মানুষ।

দীর্ঘদিন ধরে গ্রিনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় কৌশলগত গুরুত্ব ছিল এর ভৌগোলিক অবস্থান। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি এবং উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থান করায় অঞ্চলটি সামরিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ, আকাশপথ পর্যবেক্ষণ, মহাকাশ নজরদারি এবং উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের উত্তর দিকের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান বিশেষ সুবিধা দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি বহু আগেই বুঝেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে। বর্তমানে পিটুফিক মহাকাশ ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ও মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে এখন ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি সামরিক ঘাঁটির জায়গা নয়। পুরো আর্কটিক অঞ্চলই একটি স্বতন্ত্র কৌশলগত ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। একইভাবে রাশিয়া, চীন, কানাডা এবং ইউরোপের দেশগুলোও আর্কটিককে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে।Climate change in the Arctic: How melting ice is causing Greenland to  'shrink' | Euronews

বরফ গলছে, খুলছে নতুন পথ

আর্কটিক অঞ্চলে একই সঙ্গে দুটি বড় পরিবর্তন ঘটছে। একটি পরিবেশগত, অন্যটি ভূরাজনৈতিক।

বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের বরফের বিস্তার ও স্থায়িত্ব কমছে। এর ফলে আর্কটিকের কিছু অংশ আগের তুলনায় বেশি সময় ধরে চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠছে।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে আর্কটিক এখন সহজে চলাচলযোগ্য সমুদ্র হয়ে গেছে। এটি এখনো পৃথিবীর অন্যতম কঠিন ও বিপজ্জনক পরিবেশ।

তবে বরফের আংশিক সরে যাওয়াও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে নতুন বা অপেক্ষাকৃত সহজ নৌপথ তৈরি হতে পারে। আগে দুর্গম থাকা খনিজ ও জ্বালানি সম্পদের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে। মাছ ধরার ক্ষেত্র পরিবর্তিত হতে পারে। সমুদ্রতলের সম্পদ অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

আর এর সঙ্গে সামরিক পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আসছে।

যে অঞ্চল একসময় বরফের কারণে স্বাভাবিকভাবেই সুরক্ষিত ছিল, সেটিই এখন প্রবেশ, নজরদারি, সম্পদ আহরণ এবং প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

রাশিয়া ও চীনের বাড়তি আগ্রহ

চীন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনায় আর্কটিককে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে চীন আর্কটিকের সম্পদ ও পরিবহনপথে প্রবেশের সুযোগও বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর্কটিক উপকূলরেখা। দেশটি উত্তরাঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি, রাডার ব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে।

রাশিয়ার কাছে আর্কটিক কোনো দূরের কৌশলগত কৌতূহল নয়। এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।

রাশিয়ার উত্তর উপকূল বরাবর বিস্তৃত উত্তর সমুদ্রপথ ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক করিডোর হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এর পাশাপাশি আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক শক্তির অবস্থান রয়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী ডুবোজাহাজসহ দেশটির পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত।

ফলে আর্কটিকে সামরিক শক্তির ভারসাম্য সরাসরি রাশিয়ার পারমাণবিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।Greenland isn't in a rush to fight climate change because it's good for the  country's economy

ন্যাটো-রাশিয়া উত্তেজনার নতুন ক্ষেত্র

আর্কটিকে ন্যাটোর সামরিক কর্মকাণ্ড বাড়লে মস্কো সেটিকে স্বাভাবিক সামরিক মহড়া হিসেবে দেখে না। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ আর্কটিকে ন্যাটোর বাড়তি সামরিক তৎপরতাকে রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এখানে তৈরি হচ্ছে পুরোনো এক ধরনের নিরাপত্তা সংকট।

ন্যাটো বলছে, রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় উত্তরাঞ্চলের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা দরকার। রাশিয়া বলছে, ন্যাটোর সামরিক সম্প্রসারণই রাশিয়ার জন্য হুমকি তৈরি করছে।

এক পক্ষের পদক্ষেপ অন্য পক্ষের সামরিক প্রস্তুতির যুক্তি হয়ে উঠছে। এর ফলে এমন একটি অঞ্চলেও অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ছে, যা খুব বেশি দিন আগেও প্রচলিত সামরিক সংঘাত থেকে অনেকটাই দূরে ছিল।

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ হয় যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে গ্রিনল্যান্ড নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

প্রস্তাবটি ছিল অসাধারণ। কারণ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ, আর ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রেরই সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য।

ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড—দুই পক্ষই এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে সেই প্রত্যাখ্যান গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব কমায়নি। বরং বিতর্কটি ইউরোপের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—ন্যাটোর সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ যদি একই জোটের আরেক সদস্যের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন কী হবে?

এই প্রশ্ন শুধু গ্রিনল্যান্ডের নয়। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গেও জড়িত।

সার্বভৌমত্ব বনাম বড় শক্তির স্বার্থ

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হলো, কোনো শক্তিশালী দেশ শুধু নিজের ইচ্ছার কারণে দুর্বল কোনো দেশের ভূখণ্ড দখল বা সীমানা পরিবর্তন করতে পারে না।

তাই ডেনমার্ক ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর জোর দিয়ে আসছে।

অদ্ভুত বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো একদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতার মোকাবিলায় নিজেদের জোটকে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড সেই জোটের ভেতরেই একটি বড় রাজনৈতিক মতবিরোধ তৈরি করেছে।

গ্রিনল্যান্ড শুধু ভূখণ্ড নয়

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, এটি মানুষের বাসভূমি।

সেখানে বসবাসকারী মানুষের নিজস্ব পরিচয়, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজস্ব ভাবনা রয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। ডেনমার্ক থেকে ভবিষ্যতে স্বাধীন হওয়ার প্রশ্নও বহু দশক ধরে সেখানকার রাজনৈতিক আলোচনার অংশ।

এ কারণে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাইরের শক্তিগুলোর হিসাব আরও জটিল।

যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডকে উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। ডেনমার্ক দেখে নিজেদের রাজ্যের সার্বভৌমত্বের অংশ হিসেবে। ন্যাটোর কাছে এটি উত্তর আটলান্টিকের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। রাশিয়া দেখে আর্কটিকের সামরিক ভারসাম্যের দৃষ্টিতে।

চীন দেখে সম্পদ, অবকাঠামো, নৌপথ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুযোগের জায়গা হিসেবে।

কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের মানুষের নিজস্ব স্বার্থও রয়েছে। তাই গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আলোচনায় সেখানকার মানুষকে গৌণ করে দেখার সুযোগ নেই।

কোনো ভূখণ্ড যত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সেখানে বসবাসকারী মানুষের রাজনৈতিক মতামতের গুরুত্বও তত বাড়বে।

ডেনমার্কের তরুণ সেনাদের বার্তা

এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণে থাকা তরুণদের পাঠানোর ঘটনা সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম দফার এই তরুণরা ডেনমার্কের সম্প্রসারিত সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অংশ। তারা গ্রিনল্যান্ডে আর্কটিক এন্ডুরেন্স নামের সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। সেখানে গ্রিনল্যান্ডের কর্মীদের সঙ্গে কাজ করে তারা ইউরোপের স্বাভাবিক প্রশিক্ষণ পরিবেশের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কঠিন ভূপ্রকৃতিতে কাজ শেখার সুযোগ পাচ্ছে।

ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এর লক্ষ্য হলো আর্কটিক পরিবেশে সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো।

এটি গ্রিনল্যান্ড ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে ডেনমার্কের সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

সংকট শুরু হওয়ার আগের সামরিক প্রস্তুতি অনেক সময় এমনই হয়। বড় ধরনের সেনা সমাবেশ নয়, বরং প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো তৈরি এবং প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্য দিয়েই প্রস্তুতি শুরু হয়।Melting Ice Raised Sea Levels More Than Previously Thought, Study Says -  Inside Climate News

মাটিতে উপস্থিতিই বড় বার্তা

গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সামরিক উপস্থিতির বাস্তব প্রয়োজন রয়েছে। সেখানে দায়িত্ব পালনের জন্য কঠিন পরিবেশে কাজ করতে সক্ষম সেনা প্রয়োজন।

তবে এর রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়।

কোনো ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতি সেই ভূখণ্ডের ওপর দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণের বাস্তব বার্তা দেয়। মিত্রদের কাছে এটি বোঝায় যে ডেনমার্ক নিজের ভূখণ্ডের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছে। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছেও এটি একটি সতর্কবার্তা—আর্কটিক সম্পূর্ণ অরক্ষিত নয়।

ন্যাটোও আর্কটিকে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। আর্কটিক সেন্ট্রির মতো উদ্যোগের মাধ্যমে নজরদারি, অবকাঠামো, সেনা মোতায়েন এবং সরবরাহব্যবস্থা বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।

এর ফলে বিমান, জাহাজ, সেনা ও নজরদারি ব্যবস্থা আরও বেশি করে উত্তরের দিকে যাচ্ছে।

ফলে আর্কটিক ধীরে ধীরে সামরিকীকরণের দিকে এগোচ্ছে।

লড়াই শুধু ভূখণ্ডের জন্য নয়

আর্কটিকের প্রতিযোগিতার আসল প্রশ্ন শুধু কে গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করবে, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো—কে ভবিষ্যতের আর্কটিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারবে।

এই অঞ্চলে বিরল মৃত্তিকা উপাদানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে এসব খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বরফের পরিবর্তনের কারণে নতুন নৌপথের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। এসব পথ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের চেহারা বদলে দিতে পারে।

তাই আর্কটিক প্রতিযোগিতা শুধু সীমান্ত বা ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন্দর, বিমানঘাঁটি, উপগ্রহ, বরফভাঙা জাহাজ, যোগাযোগব্যবস্থা, সমুদ্রতলের তার, রাডার, খনিজ সরবরাহব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক নৌপথ।

অর্থাৎ আর্কটিকের লড়াই একই সঙ্গে সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত।

জলবায়ু পরিবর্তনই তৈরি করছে নতুন ভূরাজনীতি

আর্কটিকের গল্পের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই।

যে পরিবেশগত পরিবর্তন অঞ্চলটিকে বাইরের বিশ্বের কাছে আরও উন্মুক্ত করছে, সেই পরিবর্তনের মূল কারণই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।

বরফ গলে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অথচ একই সময়ে এই বরফ গলে আর্কটিকের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়ছে।

অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশের বিষয় নয়। এটি ক্রমেই ভূরাজনীতির শক্তিশালী চালকে পরিণত হচ্ছে।

বরফ গলছে, নৌপথ বদলাচ্ছে, মাছের বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক আগ্রহ বাড়ছে। নতুন অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। সেই অবকাঠামো আবার সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্ব পাচ্ছে। সামরিক উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু হয়ে সেই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে।

নতুন শীতল যুদ্ধ, নাকি আরও জটিল প্রতিযোগিতা?

আর্কটিকে চলমান প্রতিযোগিতাকে নতুন শীতল যুদ্ধ বলা সহজ। কিন্তু পুরোনো শীতল যুদ্ধের সঙ্গে এর পুরোপুরি মিল নেই।

আগের শীতল যুদ্ধে মূলত দুটি স্পষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিজোট ছিল। বর্তমান আর্কটিক অনেক বেশি জটিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্ররা নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। রাশিয়া আর্কটিকের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে রয়েছে। চীন আর্কটিক উপকূলীয় দেশ না হলেও নিজেকে কাছাকাছি আর্কটিক রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করে এবং এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত আগ্রহ বাড়াচ্ছে।

কানাডা, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও সুইডেনেরও নিজস্ব আর্কটিক স্বার্থ রয়েছে।

এর বাইরে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সরকারগুলোর অধিকার ও স্বার্থ রয়েছে, যেগুলো বড় শক্তিগুলোর কৌশলের মধ্যে পুরোপুরি মিশিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

তাই আর্কটিক এখন দুই পক্ষের সরল সংঘাত নয়। এটি এমন একটি জটিল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, যেখানে সামরিক শক্তি, অর্থনীতি, পরিবেশ, প্রযুক্তি এবং স্থানীয় রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি যুদ্ধ নয়, ভুল হিসাব

আর্কটিকে সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি হয়তো ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ নয়। বরং ভুল বোঝাবুঝি বা ভুল হিসাব।

আকাশপথে সামরিক বিমানের সংখ্যা বাড়ছে। নৌবাহিনীর জাহাজ কাছাকাছি এলাকায় মহড়া চালাচ্ছে। ডুবোজাহাজ কৌশলগত জলসীমায় চলাচল করছে। বিভিন্ন দেশের নজরদারি ব্যবস্থা একে অপরের সামরিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে।

এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজও এমন সব এলাকায় ঢুকতে শুরু করতে পারে, যেখানে আগে বরফের কারণে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

আর্কটিকের অবকাঠামোর ওপর সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে। সমুদ্রতলের যোগাযোগব্যবস্থা ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো কৌশলগত লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে একটি দুর্ঘটনা বা ভুল বোঝাবুঝির প্রভাব শুধু আর্কটিকেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ইতিহাসে এমন বহু সংকট রয়েছে, যেগুলোর শুরুতে কোনো পক্ষই যুদ্ধ চায়নি। কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল সংকেত এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আর্কটিক তাই ভবিষ্যতে বড় শক্তিগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে—তারা প্রতিযোগিতা করবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতাকে সংঘাতে পরিণত হতে দেবে না।

দূরের দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ আর্কটিক

পাকিস্তানসহ আর্কটিক থেকে দূরের দেশগুলোর কাছে বিষয়টি হয়তো অন্য কারও সমস্যা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব বৈশ্বিক।

নতুন নৌপথ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরন বদলাতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়লে প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়লে সামরিক জোট ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামোও বদলাতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর এক অঞ্চলে যে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন শুরু হয়, তা প্রায় কখনোই শুধু সেই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না।

ভবিষ্যতের বিশ্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে গ্রিনল্যান্ড

আর্কটিক আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও একটি বড় সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পৃথিবীকে উষ্ণ করছে না। এটি পৃথিবীর কৌশলগত মানচিত্রও বদলে দিচ্ছে।

যে অঞ্চল একসময় প্রান্তিক ছিল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যে সম্পদ আগে নাগালের বাইরে ছিল, সেটি অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। যে নৌপথ আগে অসম্ভব ছিল, সেটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।

আর যে জায়গাকে একসময় বিশ্বরাজনীতি থেকে অনেক দূরের বলে মনে করা হতো, সেটিই একদিন সামরিক পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।

গ্রিনল্যান্ড তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রিনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তার দুর্গমতা। এখন সেই দুর্গমতাই তাকে কৌশলগতভাবে মূল্যবান করে তুলছে।

গ্রিনল্যান্ডের পাথুরে ভূমি ও বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে প্রশিক্ষণ নেওয়া তরুণ ডেনিশ সেনারা হয়তো শুধু কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার শিক্ষা নিচ্ছে না। তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন এক অধ্যায়ের অংশ হয়ে উঠছে।

তাদের সংখ্যা কম। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যে শক্তিগুলো একত্রিত হচ্ছে, তাদের প্রভাব অনেক বড়।

একদিকে ন্যাটোর কৌশলগত হিসাব, অন্যদিকে রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় সামরিক শক্তি। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মহাদেশীয় প্রতিরক্ষা ভাবনা, চীনের বাড়তে থাকা আর্কটিক আকাঙ্ক্ষা, ইউরোপের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

সবকিছুর পেছনে রয়েছে বদলে যাওয়া আর্কটিক।

বরফ সরে যাচ্ছে। জাহাজ উত্তরের দিকে এগোচ্ছে। সামরিক বাহিনীও তাদের অনুসরণ করছে।

আগামী কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন হয়তো আর এটি নয় যে আর্কটিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে কি না।

প্রশ্ন হলো—আর্কটিক যখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তখন বিশ্ব তার এই নতুন গুরুত্বকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।

আর সেই ভবিষ্যৎ সবচেয়ে আগে দৃশ্যমান হতে পারে গ্রিনল্যান্ডেই।

জনপ্রিয় সংবাদ

জেমস ম্যাকনিল হুইসলার: সাধারণ দৃশ্যেই অসাধারণ শিল্পের খোঁজ

বরফ গলছে, বদলাচ্ছে বিশ্বরাজনীতি: কেন গ্রিনল্যান্ড ঘিরে বাড়ছে শক্তির লড়াই

০৫:২৭:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একসময় আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চলকে বিশ্বরাজনীতির প্রায় বাইরে থাকা একটি দুর্গম এলাকা হিসেবে দেখা হতো। বরফে ঢাকা সমুদ্র, ভয়ংকর ঠান্ডা, দীর্ঘ দূরত্ব এবং কঠিন পরিবেশের কারণে মনে করা হতো, এখানে বড় শক্তিগুলোর স্বাভাবিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা খুব একটা পৌঁছাবে না। কিন্তু সেই ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

এর সাম্প্রতিক উদাহরণ ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ডে নতুন করে সেনা মোতায়েন। দেশটির ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ে প্রথমবারের মতো বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণে থাকা তরুণদের গ্রিনল্যান্ডে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাদের কঠিন পরিবেশে প্রশিক্ষণ ও সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

বিষয়টি শুধু কয়েকজন তরুণ সেনাকে বরফের দেশে পাঠানোর ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে অনেক বড় কৌশলগত বার্তা। ডেনমার্ক বোঝাতে চাইছে, গ্রিনল্যান্ড কোনো জনশূন্য বরফের ভূখণ্ড নয়। এটি ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ এবং এই অঞ্চলে নিজের উপস্থিতি ও দায়িত্ব বজায় রাখতে কোপেনহেগেন প্রস্তুত।

কেন হঠাৎ এত গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনল্যান্ড

গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ। আয়তনে এটি পশ্চিম ইউরোপের চেয়েও বড়। তবে এর বিশাল অংশ বরফের চাদরে ঢাকা। সেখানে বসবাস করেন মাত্র প্রায় ৫৭ হাজার মানুষ।

দীর্ঘদিন ধরে গ্রিনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় কৌশলগত গুরুত্ব ছিল এর ভৌগোলিক অবস্থান। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি এবং উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থান করায় অঞ্চলটি সামরিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ, আকাশপথ পর্যবেক্ষণ, মহাকাশ নজরদারি এবং উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের উত্তর দিকের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান বিশেষ সুবিধা দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি বহু আগেই বুঝেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে। বর্তমানে পিটুফিক মহাকাশ ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ও মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে এখন ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি সামরিক ঘাঁটির জায়গা নয়। পুরো আর্কটিক অঞ্চলই একটি স্বতন্ত্র কৌশলগত ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। একইভাবে রাশিয়া, চীন, কানাডা এবং ইউরোপের দেশগুলোও আর্কটিককে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে।Climate change in the Arctic: How melting ice is causing Greenland to  'shrink' | Euronews

বরফ গলছে, খুলছে নতুন পথ

আর্কটিক অঞ্চলে একই সঙ্গে দুটি বড় পরিবর্তন ঘটছে। একটি পরিবেশগত, অন্যটি ভূরাজনৈতিক।

বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের বরফের বিস্তার ও স্থায়িত্ব কমছে। এর ফলে আর্কটিকের কিছু অংশ আগের তুলনায় বেশি সময় ধরে চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠছে।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে আর্কটিক এখন সহজে চলাচলযোগ্য সমুদ্র হয়ে গেছে। এটি এখনো পৃথিবীর অন্যতম কঠিন ও বিপজ্জনক পরিবেশ।

তবে বরফের আংশিক সরে যাওয়াও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে নতুন বা অপেক্ষাকৃত সহজ নৌপথ তৈরি হতে পারে। আগে দুর্গম থাকা খনিজ ও জ্বালানি সম্পদের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে। মাছ ধরার ক্ষেত্র পরিবর্তিত হতে পারে। সমুদ্রতলের সম্পদ অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

আর এর সঙ্গে সামরিক পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আসছে।

যে অঞ্চল একসময় বরফের কারণে স্বাভাবিকভাবেই সুরক্ষিত ছিল, সেটিই এখন প্রবেশ, নজরদারি, সম্পদ আহরণ এবং প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

রাশিয়া ও চীনের বাড়তি আগ্রহ

চীন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনায় আর্কটিককে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে চীন আর্কটিকের সম্পদ ও পরিবহনপথে প্রবেশের সুযোগও বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর্কটিক উপকূলরেখা। দেশটি উত্তরাঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি, রাডার ব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে।

রাশিয়ার কাছে আর্কটিক কোনো দূরের কৌশলগত কৌতূহল নয়। এটি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।

রাশিয়ার উত্তর উপকূল বরাবর বিস্তৃত উত্তর সমুদ্রপথ ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক করিডোর হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এর পাশাপাশি আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক শক্তির অবস্থান রয়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী ডুবোজাহাজসহ দেশটির পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত।

ফলে আর্কটিকে সামরিক শক্তির ভারসাম্য সরাসরি রাশিয়ার পারমাণবিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।Greenland isn't in a rush to fight climate change because it's good for the  country's economy

ন্যাটো-রাশিয়া উত্তেজনার নতুন ক্ষেত্র

আর্কটিকে ন্যাটোর সামরিক কর্মকাণ্ড বাড়লে মস্কো সেটিকে স্বাভাবিক সামরিক মহড়া হিসেবে দেখে না। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ আর্কটিকে ন্যাটোর বাড়তি সামরিক তৎপরতাকে রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এখানে তৈরি হচ্ছে পুরোনো এক ধরনের নিরাপত্তা সংকট।

ন্যাটো বলছে, রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় উত্তরাঞ্চলের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা দরকার। রাশিয়া বলছে, ন্যাটোর সামরিক সম্প্রসারণই রাশিয়ার জন্য হুমকি তৈরি করছে।

এক পক্ষের পদক্ষেপ অন্য পক্ষের সামরিক প্রস্তুতির যুক্তি হয়ে উঠছে। এর ফলে এমন একটি অঞ্চলেও অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ছে, যা খুব বেশি দিন আগেও প্রচলিত সামরিক সংঘাত থেকে অনেকটাই দূরে ছিল।

ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ হয় যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে গ্রিনল্যান্ড নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

প্রস্তাবটি ছিল অসাধারণ। কারণ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ, আর ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রেরই সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য।

ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড—দুই পক্ষই এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে সেই প্রত্যাখ্যান গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব কমায়নি। বরং বিতর্কটি ইউরোপের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—ন্যাটোর সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ যদি একই জোটের আরেক সদস্যের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন কী হবে?

এই প্রশ্ন শুধু গ্রিনল্যান্ডের নয়। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গেও জড়িত।

সার্বভৌমত্ব বনাম বড় শক্তির স্বার্থ

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হলো, কোনো শক্তিশালী দেশ শুধু নিজের ইচ্ছার কারণে দুর্বল কোনো দেশের ভূখণ্ড দখল বা সীমানা পরিবর্তন করতে পারে না।

তাই ডেনমার্ক ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর জোর দিয়ে আসছে।

অদ্ভুত বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো একদিকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিযোগিতার মোকাবিলায় নিজেদের জোটকে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড সেই জোটের ভেতরেই একটি বড় রাজনৈতিক মতবিরোধ তৈরি করেছে।

গ্রিনল্যান্ড শুধু ভূখণ্ড নয়

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি ভূখণ্ড নয়, এটি মানুষের বাসভূমি।

সেখানে বসবাসকারী মানুষের নিজস্ব পরিচয়, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজস্ব ভাবনা রয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন রয়েছে। ডেনমার্ক থেকে ভবিষ্যতে স্বাধীন হওয়ার প্রশ্নও বহু দশক ধরে সেখানকার রাজনৈতিক আলোচনার অংশ।

এ কারণে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাইরের শক্তিগুলোর হিসাব আরও জটিল।

যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডকে উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। ডেনমার্ক দেখে নিজেদের রাজ্যের সার্বভৌমত্বের অংশ হিসেবে। ন্যাটোর কাছে এটি উত্তর আটলান্টিকের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। রাশিয়া দেখে আর্কটিকের সামরিক ভারসাম্যের দৃষ্টিতে।

চীন দেখে সম্পদ, অবকাঠামো, নৌপথ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুযোগের জায়গা হিসেবে।

কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের মানুষের নিজস্ব স্বার্থও রয়েছে। তাই গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আলোচনায় সেখানকার মানুষকে গৌণ করে দেখার সুযোগ নেই।

কোনো ভূখণ্ড যত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সেখানে বসবাসকারী মানুষের রাজনৈতিক মতামতের গুরুত্বও তত বাড়বে।

ডেনমার্কের তরুণ সেনাদের বার্তা

এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণে থাকা তরুণদের পাঠানোর ঘটনা সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম দফার এই তরুণরা ডেনমার্কের সম্প্রসারিত সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অংশ। তারা গ্রিনল্যান্ডে আর্কটিক এন্ডুরেন্স নামের সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। সেখানে গ্রিনল্যান্ডের কর্মীদের সঙ্গে কাজ করে তারা ইউরোপের স্বাভাবিক প্রশিক্ষণ পরিবেশের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কঠিন ভূপ্রকৃতিতে কাজ শেখার সুযোগ পাচ্ছে।

ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এর লক্ষ্য হলো আর্কটিক পরিবেশে সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো।

এটি গ্রিনল্যান্ড ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে ডেনমার্কের সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

সংকট শুরু হওয়ার আগের সামরিক প্রস্তুতি অনেক সময় এমনই হয়। বড় ধরনের সেনা সমাবেশ নয়, বরং প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো তৈরি এবং প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্য দিয়েই প্রস্তুতি শুরু হয়।Melting Ice Raised Sea Levels More Than Previously Thought, Study Says -  Inside Climate News

মাটিতে উপস্থিতিই বড় বার্তা

গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের সামরিক উপস্থিতির বাস্তব প্রয়োজন রয়েছে। সেখানে দায়িত্ব পালনের জন্য কঠিন পরিবেশে কাজ করতে সক্ষম সেনা প্রয়োজন।

তবে এর রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়।

কোনো ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতি সেই ভূখণ্ডের ওপর দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণের বাস্তব বার্তা দেয়। মিত্রদের কাছে এটি বোঝায় যে ডেনমার্ক নিজের ভূখণ্ডের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছে। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছেও এটি একটি সতর্কবার্তা—আর্কটিক সম্পূর্ণ অরক্ষিত নয়।

ন্যাটোও আর্কটিকে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। আর্কটিক সেন্ট্রির মতো উদ্যোগের মাধ্যমে নজরদারি, অবকাঠামো, সেনা মোতায়েন এবং সরবরাহব্যবস্থা বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।

এর ফলে বিমান, জাহাজ, সেনা ও নজরদারি ব্যবস্থা আরও বেশি করে উত্তরের দিকে যাচ্ছে।

ফলে আর্কটিক ধীরে ধীরে সামরিকীকরণের দিকে এগোচ্ছে।

লড়াই শুধু ভূখণ্ডের জন্য নয়

আর্কটিকের প্রতিযোগিতার আসল প্রশ্ন শুধু কে গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করবে, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো—কে ভবিষ্যতের আর্কটিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারবে।

এই অঞ্চলে বিরল মৃত্তিকা উপাদানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে এসব খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বরফের পরিবর্তনের কারণে নতুন নৌপথের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। এসব পথ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের চেহারা বদলে দিতে পারে।

তাই আর্কটিক প্রতিযোগিতা শুধু সীমান্ত বা ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বন্দর, বিমানঘাঁটি, উপগ্রহ, বরফভাঙা জাহাজ, যোগাযোগব্যবস্থা, সমুদ্রতলের তার, রাডার, খনিজ সরবরাহব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক নৌপথ।

অর্থাৎ আর্কটিকের লড়াই একই সঙ্গে সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত।

জলবায়ু পরিবর্তনই তৈরি করছে নতুন ভূরাজনীতি

আর্কটিকের গল্পের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই।

যে পরিবেশগত পরিবর্তন অঞ্চলটিকে বাইরের বিশ্বের কাছে আরও উন্মুক্ত করছে, সেই পরিবর্তনের মূল কারণই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।

বরফ গলে নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অথচ একই সময়ে এই বরফ গলে আর্কটিকের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়ছে।

অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশের বিষয় নয়। এটি ক্রমেই ভূরাজনীতির শক্তিশালী চালকে পরিণত হচ্ছে।

বরফ গলছে, নৌপথ বদলাচ্ছে, মাছের বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক আগ্রহ বাড়ছে। নতুন অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। সেই অবকাঠামো আবার সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্ব পাচ্ছে। সামরিক উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু হয়ে সেই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে।

নতুন শীতল যুদ্ধ, নাকি আরও জটিল প্রতিযোগিতা?

আর্কটিকে চলমান প্রতিযোগিতাকে নতুন শীতল যুদ্ধ বলা সহজ। কিন্তু পুরোনো শীতল যুদ্ধের সঙ্গে এর পুরোপুরি মিল নেই।

আগের শীতল যুদ্ধে মূলত দুটি স্পষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিজোট ছিল। বর্তমান আর্কটিক অনেক বেশি জটিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্ররা নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। রাশিয়া আর্কটিকের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে রয়েছে। চীন আর্কটিক উপকূলীয় দেশ না হলেও নিজেকে কাছাকাছি আর্কটিক রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করে এবং এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত আগ্রহ বাড়াচ্ছে।

কানাডা, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও সুইডেনেরও নিজস্ব আর্কটিক স্বার্থ রয়েছে।

এর বাইরে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সরকারগুলোর অধিকার ও স্বার্থ রয়েছে, যেগুলো বড় শক্তিগুলোর কৌশলের মধ্যে পুরোপুরি মিশিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

তাই আর্কটিক এখন দুই পক্ষের সরল সংঘাত নয়। এটি এমন একটি জটিল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, যেখানে সামরিক শক্তি, অর্থনীতি, পরিবেশ, প্রযুক্তি এবং স্থানীয় রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি যুদ্ধ নয়, ভুল হিসাব

আর্কটিকে সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি হয়তো ইচ্ছাকৃত যুদ্ধ নয়। বরং ভুল বোঝাবুঝি বা ভুল হিসাব।

আকাশপথে সামরিক বিমানের সংখ্যা বাড়ছে। নৌবাহিনীর জাহাজ কাছাকাছি এলাকায় মহড়া চালাচ্ছে। ডুবোজাহাজ কৌশলগত জলসীমায় চলাচল করছে। বিভিন্ন দেশের নজরদারি ব্যবস্থা একে অপরের সামরিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে।

এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজও এমন সব এলাকায় ঢুকতে শুরু করতে পারে, যেখানে আগে বরফের কারণে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

আর্কটিকের অবকাঠামোর ওপর সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে। সমুদ্রতলের যোগাযোগব্যবস্থা ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো কৌশলগত লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে একটি দুর্ঘটনা বা ভুল বোঝাবুঝির প্রভাব শুধু আর্কটিকেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ইতিহাসে এমন বহু সংকট রয়েছে, যেগুলোর শুরুতে কোনো পক্ষই যুদ্ধ চায়নি। কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত, ভুল সংকেত এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আর্কটিক তাই ভবিষ্যতে বড় শক্তিগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে—তারা প্রতিযোগিতা করবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতাকে সংঘাতে পরিণত হতে দেবে না।

দূরের দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ আর্কটিক

পাকিস্তানসহ আর্কটিক থেকে দূরের দেশগুলোর কাছে বিষয়টি হয়তো অন্য কারও সমস্যা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব বৈশ্বিক।

নতুন নৌপথ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরন বদলাতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়লে প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়লে সামরিক জোট ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামোও বদলাতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর এক অঞ্চলে যে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন শুরু হয়, তা প্রায় কখনোই শুধু সেই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না।

ভবিষ্যতের বিশ্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে গ্রিনল্যান্ড

আর্কটিক আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও একটি বড় সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পৃথিবীকে উষ্ণ করছে না। এটি পৃথিবীর কৌশলগত মানচিত্রও বদলে দিচ্ছে।

যে অঞ্চল একসময় প্রান্তিক ছিল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যে সম্পদ আগে নাগালের বাইরে ছিল, সেটি অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। যে নৌপথ আগে অসম্ভব ছিল, সেটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।

আর যে জায়গাকে একসময় বিশ্বরাজনীতি থেকে অনেক দূরের বলে মনে করা হতো, সেটিই একদিন সামরিক পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।

গ্রিনল্যান্ড তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রিনল্যান্ডের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তার দুর্গমতা। এখন সেই দুর্গমতাই তাকে কৌশলগতভাবে মূল্যবান করে তুলছে।

গ্রিনল্যান্ডের পাথুরে ভূমি ও বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে প্রশিক্ষণ নেওয়া তরুণ ডেনিশ সেনারা হয়তো শুধু কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার শিক্ষা নিচ্ছে না। তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন এক অধ্যায়ের অংশ হয়ে উঠছে।

তাদের সংখ্যা কম। কিন্তু গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যে শক্তিগুলো একত্রিত হচ্ছে, তাদের প্রভাব অনেক বড়।

একদিকে ন্যাটোর কৌশলগত হিসাব, অন্যদিকে রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় সামরিক শক্তি। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মহাদেশীয় প্রতিরক্ষা ভাবনা, চীনের বাড়তে থাকা আর্কটিক আকাঙ্ক্ষা, ইউরোপের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

সবকিছুর পেছনে রয়েছে বদলে যাওয়া আর্কটিক।

বরফ সরে যাচ্ছে। জাহাজ উত্তরের দিকে এগোচ্ছে। সামরিক বাহিনীও তাদের অনুসরণ করছে।

আগামী কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন হয়তো আর এটি নয় যে আর্কটিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে কি না।

প্রশ্ন হলো—আর্কটিক যখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তখন বিশ্ব তার এই নতুন গুরুত্বকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।

আর সেই ভবিষ্যৎ সবচেয়ে আগে দৃশ্যমান হতে পারে গ্রিনল্যান্ডেই।