০৩:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
এআই অবকাঠামো নিয়ে জনরোষ: প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়, নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জাপানি কোম্পানির বিরল খনিজ আমদানি ব্যয় ২২% বেড়েছে, চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে চাপ এআই একচেটিয়া হতে পারে না, বিশ্বজুড়ে সহযোগিতার আহ্বান শি জিনপিংয়ের এফবিআইর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকার গ্যাং সদস্য নিতিশ কৌশল যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১৯% কমেছে, দামে ও পরিমাণে একসঙ্গে ধাক্কা বিশ্বকাপের শেষ বাঁশির পর: ফুটবল যে আয়নায় আমেরিকা ও বিশ্বের ভবিষ্যৎ দেখা গেল প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষত ও অনশনের আর্তনাদ: আমরা কবে শুনব ক্ষুধার ভাষা? শুধু শ্রদ্ধা নয়, শহীদ সেনাদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব এখনই পালন করতে হবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ সুবিধা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফের সতর্কবার্তা: প্রবৃদ্ধি ৩.৫%, মধ্যমেয়াদে ৩ শতাংশের নিচে নামার শঙ্কা

মা যা হইয়াছেন

  • Sarakhon Report
  • ০৮:০০:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪
  • 147

সুমন চট্টোপাধ্যায়

নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে ভারতের মিডিয়া বরাবরই আড়াআড়ি ভাবে বিভক্ত, ভক্ত আর বিদ্বেষী, দু’তরফের পছন্দ-অপছন্দও আবার একই রকম কর্কশ, উচ্চকিত, মাঝেমধ্যে আর্তনাদ বলে বিভ্রম হয়। আমি পুরোনো ঘরানার খবরজীবী, বলতে পারি আনখশির পেশাদার, কোনও ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল মায় নিজের দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে অবিশ্বাসী। আমার শেখা গুরুমন্ত্রটি হোল, সাচ্চা সাংবাদিকের একমাত্র দায়বদ্ধতা সত্যের প্রতি, দেশোদ্ধার করা তার কম্মো নয়। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে গোদী-মিডিয়া বনাম বিদ্রোহী মিডিয়ার এমন নিরন্তর দ্বৈরথে আমার অবস্থান, ‘ঘরেও নহে, পাড়েও নহে। যে জন আছে মাঝখানে।’ একই সঙ্গে আমার ভবিতব্যকেও আমি হাসিমুখে শিরোধার্য করেছি। যে প্রজাতিকে আমি সাংবাদিক বলে চিরকাল জেনে এসেছি আজ তা ডায়নোসরের মতো হয় বিলুপ্ত নয় চিরপ্রস্থানের পথে।

২০১৪ থেকে ২০২৪ এই দশ বছরে বিদ্রোহী মিডিয়া উল্লসিত হওয়ার মতো কোনও সুযোগ পায়নি, বরং তাঁদের অনেককে বিবিধ রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়ন সইতে হয়েছে, তিলকে তাল করে দেখিয়ে অযথা দানবীয় সব আইন প্রয়োগ করে তাদের কাউকে কাউকে দীর্ঘ সময়ের জন্য গুমঘরে চালান করে দেওয়া হয়েছে, অফিসে ঘন ঘন রেইড হয়েছে, কাকভোরে রাজধানী শহরে একই সঙ্গে তল্লাশি হয়েছে জনা পঞ্চাশ সাংবাদিকের বাড়ির অন্তঃপুরে। ‘মাই ওয়ে অর হাইওয়ে’ যদি শাসকের রাষ্ট্র পরিচালনার একমাত্র প্রেরণা হয়, মুক্ত মন, মুক্ত চিন্তা, স্বাধীনচেতা নাগরিক সমাজ তার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে অবরুদ্ধ বোধ করতে বাধ্য, জরুরি অবস্থার পরে সাড়ে তিনটি দশক ধরে চালু ব্যবস্থায় হঠাৎ কাঁপুনি লাগলে এমন অসহনীয় অস্বস্তি খুবই স্বাভাবিক।

বিদ্রোহী মিডিয়া সংখ্যায় অতি অল্প, বৃহৎ পুঁজি তাদের ছায়াও মাড়ায়না, ব্যবসায়ীকুল তাদের অস্পৃশ্য জ্ঞান করে, তাদের বিচরণের ক্ষেত্র শুধুই ইন্টারনেট, আরও সঙ্কুচিত অর্থে পোর্টাল আর ইউ টিউব। দিন আনি দিন খাই করে তারা অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখে, গুগল বাবাজির দান আর গ্রাহকের মুষ্টিভিক্ষাই তাদের একমাত্র পাথেয়। গোদী মিডিয়া যেমন ‘কিং ক্যান ডু নো রঙ’ এই বিলিতি প্রবাদে সম্পূর্ণ আস্থাশীল, বিদ্রোহী মিডিয়া তেমনি বিশ্বাস করে রাজা কোনও সঠিক কাজ করতেই পারেননা। একপক্ষের অন্ধভক্তি আর অন্যপক্ষের অন্ধ ক্রোধ, দুয়েরই অবস্থান স্বচ্ছ, তথ্য অথবা যুক্তি ভিত্তিক আদর্শ সাংবাদিকতা থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে।

এমন আমরা-ওরা জাতীয় রক্তক্ষয়ী, আত্মঘাতী, লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দর্শক অথবা পাঠক যাঁরা গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে নিত্য ঠকে যান। কেননা এই ঠগের বাড়ির ভোজে সত্যটা ছাড়া বাকি সব কিছুই থাকে। কেননা যে যার অবস্থান থেকে সত্যের একটি নিজস্ব ভাষ্য তৈরি করেন। Facts are sacred, opinion free, বহু যুগ ধরে লালিত-পালিত এই চরিত্র-ধর্ম থেকে শাপভ্রষ্টের মতো সবাই স্থালিত। তথ্যের শুচিতার বিন্দুমাত্র আর অবশিষ্ট নেই, সবটাই মতামত, তাও পূতিগন্ধময়, পক্ষপাতদুষ্ট। প্রেডিক্টেবল। কাগজের অথবা খবরের চ্যানেলের নাম দেখেই বলে দেওয়া যায় সেখানে কী ছাপানো হবে বা দেখানো হবে।

বেশ কয়েক বছর দেশ-বিদেশের পন্ডিতকুল একেই ‘পোস্ট ট্রুথ’ বিশ্বে প্রবেশ করা বলে অভিহিত করে যাচ্ছেন। কেননা সত্যের ওপর গণ- বলাৎকার এখন আর ভারত বা এই উপমহাদেশের সমস্যা নয়, এই ব্যাধির ফাঁদে কম-বেশি সব দেশই আজ আক্রান্ত। চটকদার এই ইংরেজি শব্দবন্ধটি বিলেত আর মার্কিন মুলুকে প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল। ইংল্যান্ডে ব্রেক্সিট আর ওয়াশিংটনে ধূমকেতুর মতো ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে। দু’দেশেই তখন মিথ্যার বেসাতি করোনা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। এতটাই যে ২০১৬ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারি বাধ্য হয়েছিল এই বিচিত্র শব্দটিকে ‘ওয়ার্ড অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করতে। তারপর থেকে এটি অভিধানে সসম্মানে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। অনেক পন্ডিতের মতে আগামী সিকি শতকে যাবতীয় আলোচনার নির্নায়ক হবে এই ‘পোস্ট- ট্রুথের ছায়া।

এই ইংরেজি শব্দবন্ধটি কার মস্তিষ্ক প্রসূত, কার লেখায় প্রথম এর স্পষ্ট উল্লেখ মেলে, শব্দ-চয়নের ব্যাখ্যায় সেই অজানা তথ্যটিও উঠে এসেছে। জানা গিয়েছে সার্বিয়ান-আমেরিকান নাট্যকার স্টিভ টেসিচ ১৯৯২ সালে প্রথম “নেশন” পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এটির প্রাঞ্জল ব্যবহার করেছিলেন। ইরান-কনট্রা কেলেঙ্কারি ও পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে টেসিচ মন্তব্য করেছিলেন, ‘We as free people have freely decided to live in a post-truth world.’ স্বাধীন মানুষই স্বাধীনভাবে সত্যকে যূপকাষ্ঠে তোলার সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কাউকে দোষারোপ করার উপায় নেই।

বিশ্বাসের মতো সত্যও নির্বিকল্প। বিশ্বাসের অপর প্রান্তে যদিবা অবিশ্বাস থাকে, সত্যের ওপারে আছে মিথ্যা, অর্থাৎ গাঢ় অন্ধকার। অমানিশার যেমন প্রাকৃতিক অন্ত আছে, অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে আছে অনিবার্য আলোর রেখা তেমনি মিথ্যাশ্রয়ী মাৎস্যন্যায় কখনও কোনও অবস্থায় সমাজ-সংসারে স্থায়ী হতে পারেনা, ওষুধের মতো তারও একটা কার্যকরী মেয়াদ পূর্তির দিন থাকে, ওষুধ তৈরির সময়ই লেবেলে সেই মেয়াদ শেষের তারিখটি সেঁটে দেওয়া হয়। অবশ্য মিডিয়ার এমন দুর্দশার দিনের অবসান আদৌ হবে কিনা হলেও আমার জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারব কিনা আমার তা নিয়ে ঘোরতর সংশয় তো থেকেই যাচ্ছে। ধরেই নিয়েছি, হবেনা। পচন ধরতে যত সময় লাগে নিরাময় হতে লাগে তার বেশি সময়।

কেন? এমনিতে আমি ‘ইনকরিজিবল অপটিমিস্ট’, ব্যতিক্রমের তালিকায় নিজের পেশাকে রাখছি নাচার হয়ে। ভারতবর্ষে অন্তত শাসকের দাসত্ব করার প্রবণতা আজ কেবল লুটিয়েন্সের দিল্লির ক্ষুদ্র পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই, সমস্ত অঙ্গরাজ্যে প্রসারিত। যে কোনও রাজ্যে যে কোনও দলের শাসক আজ এক একজন নির্বাচিত রাজা অথবা রাণী, আরও কড়া করে বললে ‘টিনপট ডিক্টেটর’। দাসত্বে পান থেকে চুন খসলেই ওরা ভাতে মারবে, পানিতেও। অর্থাৎ তৎক্ষণাৎ সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়ে মিডিয়ার শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা শুরু হয়ে যাবে। উপরি পাওনা হিসেবে উকিলের চিঠি, থানায় ডেকে নিয়ে অকারণে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখা, মামলা ঠুকে দেওয়া, গুন্ডাদের দিয়ে ক্রমাগত শাসানি, তাতেও না হলে সোজা গুমঘরে পাঠিয়ে সবক শেখানো। কর্মজীবনের শেষার্ধে আমি নিজেই এমন অশোক স্তম্ভের সিল মারা সরকারি নিপীড়নের মুখে পড়েছি বারেবারে, কী যাতনা বিষে আমি তা বিলক্ষণ জানি। এত কান্ড করেও আমাকে পাঁচ সেন্টিমিটার টলানো যায়নি। কেন? না আমি সেই বিপন্ন প্রজাতির প্রতিনিধি যাদের দেখে নবারুণ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘বাঙালি শুধুই খচ্চর নয় তদোপরি অসহায়।’

মিডিয়া-শাসকের পারস্পরিক সম্পর্কে এমন বৈপ্লবিক বদল হয়ে গেল কেন? নিশ্চয়ই অকারণে নয়। এই ক্ষুদ পরিসরে তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া অসম্ভব। সেটা তোলা থাক পরের কলামের জন্য।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক,সাবেক নির্বাহী সম্পাদক আনন্দবাজার পত্রিকা

জনপ্রিয় সংবাদ

এআই অবকাঠামো নিয়ে জনরোষ: প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়, নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ

মা যা হইয়াছেন

০৮:০০:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ জুন ২০২৪

সুমন চট্টোপাধ্যায়

নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে ভারতের মিডিয়া বরাবরই আড়াআড়ি ভাবে বিভক্ত, ভক্ত আর বিদ্বেষী, দু’তরফের পছন্দ-অপছন্দও আবার একই রকম কর্কশ, উচ্চকিত, মাঝেমধ্যে আর্তনাদ বলে বিভ্রম হয়। আমি পুরোনো ঘরানার খবরজীবী, বলতে পারি আনখশির পেশাদার, কোনও ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল মায় নিজের দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে অবিশ্বাসী। আমার শেখা গুরুমন্ত্রটি হোল, সাচ্চা সাংবাদিকের একমাত্র দায়বদ্ধতা সত্যের প্রতি, দেশোদ্ধার করা তার কম্মো নয়। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে গোদী-মিডিয়া বনাম বিদ্রোহী মিডিয়ার এমন নিরন্তর দ্বৈরথে আমার অবস্থান, ‘ঘরেও নহে, পাড়েও নহে। যে জন আছে মাঝখানে।’ একই সঙ্গে আমার ভবিতব্যকেও আমি হাসিমুখে শিরোধার্য করেছি। যে প্রজাতিকে আমি সাংবাদিক বলে চিরকাল জেনে এসেছি আজ তা ডায়নোসরের মতো হয় বিলুপ্ত নয় চিরপ্রস্থানের পথে।

২০১৪ থেকে ২০২৪ এই দশ বছরে বিদ্রোহী মিডিয়া উল্লসিত হওয়ার মতো কোনও সুযোগ পায়নি, বরং তাঁদের অনেককে বিবিধ রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়ন সইতে হয়েছে, তিলকে তাল করে দেখিয়ে অযথা দানবীয় সব আইন প্রয়োগ করে তাদের কাউকে কাউকে দীর্ঘ সময়ের জন্য গুমঘরে চালান করে দেওয়া হয়েছে, অফিসে ঘন ঘন রেইড হয়েছে, কাকভোরে রাজধানী শহরে একই সঙ্গে তল্লাশি হয়েছে জনা পঞ্চাশ সাংবাদিকের বাড়ির অন্তঃপুরে। ‘মাই ওয়ে অর হাইওয়ে’ যদি শাসকের রাষ্ট্র পরিচালনার একমাত্র প্রেরণা হয়, মুক্ত মন, মুক্ত চিন্তা, স্বাধীনচেতা নাগরিক সমাজ তার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে অবরুদ্ধ বোধ করতে বাধ্য, জরুরি অবস্থার পরে সাড়ে তিনটি দশক ধরে চালু ব্যবস্থায় হঠাৎ কাঁপুনি লাগলে এমন অসহনীয় অস্বস্তি খুবই স্বাভাবিক।

বিদ্রোহী মিডিয়া সংখ্যায় অতি অল্প, বৃহৎ পুঁজি তাদের ছায়াও মাড়ায়না, ব্যবসায়ীকুল তাদের অস্পৃশ্য জ্ঞান করে, তাদের বিচরণের ক্ষেত্র শুধুই ইন্টারনেট, আরও সঙ্কুচিত অর্থে পোর্টাল আর ইউ টিউব। দিন আনি দিন খাই করে তারা অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখে, গুগল বাবাজির দান আর গ্রাহকের মুষ্টিভিক্ষাই তাদের একমাত্র পাথেয়। গোদী মিডিয়া যেমন ‘কিং ক্যান ডু নো রঙ’ এই বিলিতি প্রবাদে সম্পূর্ণ আস্থাশীল, বিদ্রোহী মিডিয়া তেমনি বিশ্বাস করে রাজা কোনও সঠিক কাজ করতেই পারেননা। একপক্ষের অন্ধভক্তি আর অন্যপক্ষের অন্ধ ক্রোধ, দুয়েরই অবস্থান স্বচ্ছ, তথ্য অথবা যুক্তি ভিত্তিক আদর্শ সাংবাদিকতা থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে।

এমন আমরা-ওরা জাতীয় রক্তক্ষয়ী, আত্মঘাতী, লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দর্শক অথবা পাঠক যাঁরা গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে নিত্য ঠকে যান। কেননা এই ঠগের বাড়ির ভোজে সত্যটা ছাড়া বাকি সব কিছুই থাকে। কেননা যে যার অবস্থান থেকে সত্যের একটি নিজস্ব ভাষ্য তৈরি করেন। Facts are sacred, opinion free, বহু যুগ ধরে লালিত-পালিত এই চরিত্র-ধর্ম থেকে শাপভ্রষ্টের মতো সবাই স্থালিত। তথ্যের শুচিতার বিন্দুমাত্র আর অবশিষ্ট নেই, সবটাই মতামত, তাও পূতিগন্ধময়, পক্ষপাতদুষ্ট। প্রেডিক্টেবল। কাগজের অথবা খবরের চ্যানেলের নাম দেখেই বলে দেওয়া যায় সেখানে কী ছাপানো হবে বা দেখানো হবে।

বেশ কয়েক বছর দেশ-বিদেশের পন্ডিতকুল একেই ‘পোস্ট ট্রুথ’ বিশ্বে প্রবেশ করা বলে অভিহিত করে যাচ্ছেন। কেননা সত্যের ওপর গণ- বলাৎকার এখন আর ভারত বা এই উপমহাদেশের সমস্যা নয়, এই ব্যাধির ফাঁদে কম-বেশি সব দেশই আজ আক্রান্ত। চটকদার এই ইংরেজি শব্দবন্ধটি বিলেত আর মার্কিন মুলুকে প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল। ইংল্যান্ডে ব্রেক্সিট আর ওয়াশিংটনে ধূমকেতুর মতো ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে। দু’দেশেই তখন মিথ্যার বেসাতি করোনা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। এতটাই যে ২০১৬ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারি বাধ্য হয়েছিল এই বিচিত্র শব্দটিকে ‘ওয়ার্ড অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করতে। তারপর থেকে এটি অভিধানে সসম্মানে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। অনেক পন্ডিতের মতে আগামী সিকি শতকে যাবতীয় আলোচনার নির্নায়ক হবে এই ‘পোস্ট- ট্রুথের ছায়া।

এই ইংরেজি শব্দবন্ধটি কার মস্তিষ্ক প্রসূত, কার লেখায় প্রথম এর স্পষ্ট উল্লেখ মেলে, শব্দ-চয়নের ব্যাখ্যায় সেই অজানা তথ্যটিও উঠে এসেছে। জানা গিয়েছে সার্বিয়ান-আমেরিকান নাট্যকার স্টিভ টেসিচ ১৯৯২ সালে প্রথম “নেশন” পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধে এটির প্রাঞ্জল ব্যবহার করেছিলেন। ইরান-কনট্রা কেলেঙ্কারি ও পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে টেসিচ মন্তব্য করেছিলেন, ‘We as free people have freely decided to live in a post-truth world.’ স্বাধীন মানুষই স্বাধীনভাবে সত্যকে যূপকাষ্ঠে তোলার সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কাউকে দোষারোপ করার উপায় নেই।

বিশ্বাসের মতো সত্যও নির্বিকল্প। বিশ্বাসের অপর প্রান্তে যদিবা অবিশ্বাস থাকে, সত্যের ওপারে আছে মিথ্যা, অর্থাৎ গাঢ় অন্ধকার। অমানিশার যেমন প্রাকৃতিক অন্ত আছে, অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে আছে অনিবার্য আলোর রেখা তেমনি মিথ্যাশ্রয়ী মাৎস্যন্যায় কখনও কোনও অবস্থায় সমাজ-সংসারে স্থায়ী হতে পারেনা, ওষুধের মতো তারও একটা কার্যকরী মেয়াদ পূর্তির দিন থাকে, ওষুধ তৈরির সময়ই লেবেলে সেই মেয়াদ শেষের তারিখটি সেঁটে দেওয়া হয়। অবশ্য মিডিয়ার এমন দুর্দশার দিনের অবসান আদৌ হবে কিনা হলেও আমার জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারব কিনা আমার তা নিয়ে ঘোরতর সংশয় তো থেকেই যাচ্ছে। ধরেই নিয়েছি, হবেনা। পচন ধরতে যত সময় লাগে নিরাময় হতে লাগে তার বেশি সময়।

কেন? এমনিতে আমি ‘ইনকরিজিবল অপটিমিস্ট’, ব্যতিক্রমের তালিকায় নিজের পেশাকে রাখছি নাচার হয়ে। ভারতবর্ষে অন্তত শাসকের দাসত্ব করার প্রবণতা আজ কেবল লুটিয়েন্সের দিল্লির ক্ষুদ্র পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই, সমস্ত অঙ্গরাজ্যে প্রসারিত। যে কোনও রাজ্যে যে কোনও দলের শাসক আজ এক একজন নির্বাচিত রাজা অথবা রাণী, আরও কড়া করে বললে ‘টিনপট ডিক্টেটর’। দাসত্বে পান থেকে চুন খসলেই ওরা ভাতে মারবে, পানিতেও। অর্থাৎ তৎক্ষণাৎ সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়ে মিডিয়ার শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা শুরু হয়ে যাবে। উপরি পাওনা হিসেবে উকিলের চিঠি, থানায় ডেকে নিয়ে অকারণে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখা, মামলা ঠুকে দেওয়া, গুন্ডাদের দিয়ে ক্রমাগত শাসানি, তাতেও না হলে সোজা গুমঘরে পাঠিয়ে সবক শেখানো। কর্মজীবনের শেষার্ধে আমি নিজেই এমন অশোক স্তম্ভের সিল মারা সরকারি নিপীড়নের মুখে পড়েছি বারেবারে, কী যাতনা বিষে আমি তা বিলক্ষণ জানি। এত কান্ড করেও আমাকে পাঁচ সেন্টিমিটার টলানো যায়নি। কেন? না আমি সেই বিপন্ন প্রজাতির প্রতিনিধি যাদের দেখে নবারুণ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘বাঙালি শুধুই খচ্চর নয় তদোপরি অসহায়।’

মিডিয়া-শাসকের পারস্পরিক সম্পর্কে এমন বৈপ্লবিক বদল হয়ে গেল কেন? নিশ্চয়ই অকারণে নয়। এই ক্ষুদ পরিসরে তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া অসম্ভব। সেটা তোলা থাক পরের কলামের জন্য।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক,সাবেক নির্বাহী সম্পাদক আনন্দবাজার পত্রিকা