০৫:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
হাইলাইট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম–গেস্টরুম বন্ধ হয়েছে, ‘ট্যাগ’ দিয়ে নির্যাতন থামেনি ‘ফেডএক্স পার্সেলে মাদক’-ফোনকলেই ফাঁদে পড়লেন ভারতীয় কৌতুকশিল্পী চীন-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র: নতুন এক ত্রিভুজ রাজনীতির সূচনা? গাজার নীরব কারাগার আর বিশ্বের বিবেকহীনতা রুপির সংকট শুধু মুদ্রার নয়, আস্থারও পরীক্ষা ঢাকার পশুর হাট ইজারায় বিএনপির প্রাধান্য, প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে জামায়াত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ধবলধোলাই, তাইজুলের ঘূর্ণিতে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারাল টাইগাররা শান্তিনগরের শপিং মলে আগুন, দগ্ধ চারজন হাসপাতালে ভারতে ৪৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় অচল বান্দা, সকাল ১০টার পরই থেমে যায় জনজীবন তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কে ভয়াবহ ধস, উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগে বড় শঙ্কা

ভারতে লবণশ্রমিকদের স্বাস্থ্য বিপর্যয়: বৈশ্বিক খাদ্য শিল্পের লুকানো মূল্য

হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত এক শ্রমিক

গুজরাটের কচ্ছের রণ অঞ্চলের সাদা কাদামাটির লবণক্ষেত্রে কাজ করতে করতে হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রহিম সুলতান। ৪৯ বছর বয়সী এই শ্রমিক লবণ ঘষতে ঘষতে বুকে ও হাতে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। পরিবারের লোকজন তাকে ট্র্যাক্টরে করে তিন ঘণ্টা পথ অতিক্রম করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা জানান, তিনি বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাক করেছেন। আগের মৌসুমগুলোতে যে ছোটখাটো ব্যথা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন, সেগুলো আসলে ক্ষুদ্র হৃদরোগ ছিল।

আগারিয়া সম্প্রদায় ও তাদের জীবন

রহিম আগারিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা প্রায় নয় মাস পরিবারসহ মরুভূমির প্রান্ত থেকে কচ্ছের রণে এসে অস্থায়ী ঘরে বসবাস করে লবণ উৎপাদনে নিয়োজিত হয়। গুজরাট ভারতের ৮৭ শতাংশ লবণ উৎপাদন করে, আর কচ্ছের রণ হচ্ছে সবচেয়ে বড় লবণক্ষেত্র। বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত প্রতি ১০ কেজি লবণের মধ্যে একটি কেজি এখান থেকে যায়।

প্রচণ্ড গরম ও শ্রমের ভার

গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, অনেক সময় তা ৫০ ছুঁয়ে যায়। শ্রমিকরা খালি পায়ে ও খালি হাতে নোনাজলে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেন। লবণকণা ত্বক কেটে ক্ষত সৃষ্টি করে, যেখান দিয়ে নোনাজল রক্তে প্রবেশ করে। এতে রক্তচাপ বেড়ে যায়, কিডনির ক্ষতি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ ও মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ে।

কর্পোরেট মুনাফা বনাম শ্রমিকদের দুর্দশা

ভারতের লবণ শিল্পে টাটা সল্টসহ বড় বড় কোম্পানি বাজার দখল করে রেখেছে। তারা কোটি কোটি টাকার মুনাফা করছে, কিন্তু শ্রমিকরা পাচ্ছে সামান্য মজুরি। অনেকেই বছরে ৬০০ ডলারেরও কম আয় করেন। পরিবারসহ দিনভর কঠিন পরিশ্রম করেও প্রতিদিন আয় হয় মাত্র ১.৬০–৪.৮০ ডলার।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চিকিৎসা সংকট

চিকিৎসকরা জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ ও নারী শ্রমিকদের মধ্যে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও বিকলাঙ্গতা সাধারণ ব্যাপার। অনেকে ৪০ বছরের পর আর শারীরিকভাবে কাজ চালাতে পারেন না। কিন্তু চিকিৎসার খরচ সামলানো তাদের পক্ষে অসম্ভব। একবার স্টেন্ট প্রতিস্থাপন করতে রহিমকে আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছিল।

নারীদের জন্য অতিরিক্ত কষ্ট

নারী শ্রমিকরা ভোগেন আরও পানির সংকট, স্যানিটেশন সমস্যায় ও মাসিকের সময় বাড়তি যন্ত্রণায়। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে পানি কম পান করেন, ফলে প্রস্রাবের সংক্রমণ দেখা দেয়। পুষ্টির অভাবে তারা দ্রুত ওজন হারান, দুধ কমে যায় এবং গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

জীবনের কষ্টকর পরিবেশ

শ্রমিকরা অস্থায়ী খড়ের ঘরে থাকেন। সপ্তাহে একবার ট্যাংকারে পানি আসে। মরুভূমির পানি ব্যবহারযোগ্য নয়, তা ত্বকে চুলকানি ও জ্বালা সৃষ্টি করে। চোখে সর্বক্ষণ জ্বালা ও পানি পড়া সাধারণ ব্যাপার। খাবার বলতে শুকনো মরিচ, ডাল ও কিছু শস্য, সবজি, দুধ কিংবা মাংসের নাগাল মেলে না।

অবহেলার মাঝে ঐতিহ্যের টান

সরকার কিছু মৌলিক সহায়তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধান হয়নি। স্বাস্থ্যহানির পরও আগারিয়া সম্প্রদায়ের অনেকে পেশা ছাড়তে চান না। তাদের মতে, লবণ উৎপাদন একটি ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া এক শিল্প, যা তারা সহজে হারাতে রাজি নন।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাইলাইট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম–গেস্টরুম বন্ধ হয়েছে, ‘ট্যাগ’ দিয়ে নির্যাতন থামেনি

ভারতে লবণশ্রমিকদের স্বাস্থ্য বিপর্যয়: বৈশ্বিক খাদ্য শিল্পের লুকানো মূল্য

১১:০৯:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৫

হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত এক শ্রমিক

গুজরাটের কচ্ছের রণ অঞ্চলের সাদা কাদামাটির লবণক্ষেত্রে কাজ করতে করতে হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রহিম সুলতান। ৪৯ বছর বয়সী এই শ্রমিক লবণ ঘষতে ঘষতে বুকে ও হাতে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। পরিবারের লোকজন তাকে ট্র্যাক্টরে করে তিন ঘণ্টা পথ অতিক্রম করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা জানান, তিনি বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাক করেছেন। আগের মৌসুমগুলোতে যে ছোটখাটো ব্যথা তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন, সেগুলো আসলে ক্ষুদ্র হৃদরোগ ছিল।

আগারিয়া সম্প্রদায় ও তাদের জীবন

রহিম আগারিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা প্রায় নয় মাস পরিবারসহ মরুভূমির প্রান্ত থেকে কচ্ছের রণে এসে অস্থায়ী ঘরে বসবাস করে লবণ উৎপাদনে নিয়োজিত হয়। গুজরাট ভারতের ৮৭ শতাংশ লবণ উৎপাদন করে, আর কচ্ছের রণ হচ্ছে সবচেয়ে বড় লবণক্ষেত্র। বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত প্রতি ১০ কেজি লবণের মধ্যে একটি কেজি এখান থেকে যায়।

প্রচণ্ড গরম ও শ্রমের ভার

গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, অনেক সময় তা ৫০ ছুঁয়ে যায়। শ্রমিকরা খালি পায়ে ও খালি হাতে নোনাজলে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেন। লবণকণা ত্বক কেটে ক্ষত সৃষ্টি করে, যেখান দিয়ে নোনাজল রক্তে প্রবেশ করে। এতে রক্তচাপ বেড়ে যায়, কিডনির ক্ষতি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ ও মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ে।

কর্পোরেট মুনাফা বনাম শ্রমিকদের দুর্দশা

ভারতের লবণ শিল্পে টাটা সল্টসহ বড় বড় কোম্পানি বাজার দখল করে রেখেছে। তারা কোটি কোটি টাকার মুনাফা করছে, কিন্তু শ্রমিকরা পাচ্ছে সামান্য মজুরি। অনেকেই বছরে ৬০০ ডলারেরও কম আয় করেন। পরিবারসহ দিনভর কঠিন পরিশ্রম করেও প্রতিদিন আয় হয় মাত্র ১.৬০–৪.৮০ ডলার।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চিকিৎসা সংকট

চিকিৎসকরা জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ ও নারী শ্রমিকদের মধ্যে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও বিকলাঙ্গতা সাধারণ ব্যাপার। অনেকে ৪০ বছরের পর আর শারীরিকভাবে কাজ চালাতে পারেন না। কিন্তু চিকিৎসার খরচ সামলানো তাদের পক্ষে অসম্ভব। একবার স্টেন্ট প্রতিস্থাপন করতে রহিমকে আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছিল।

নারীদের জন্য অতিরিক্ত কষ্ট

নারী শ্রমিকরা ভোগেন আরও পানির সংকট, স্যানিটেশন সমস্যায় ও মাসিকের সময় বাড়তি যন্ত্রণায়। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে পানি কম পান করেন, ফলে প্রস্রাবের সংক্রমণ দেখা দেয়। পুষ্টির অভাবে তারা দ্রুত ওজন হারান, দুধ কমে যায় এবং গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

জীবনের কষ্টকর পরিবেশ

শ্রমিকরা অস্থায়ী খড়ের ঘরে থাকেন। সপ্তাহে একবার ট্যাংকারে পানি আসে। মরুভূমির পানি ব্যবহারযোগ্য নয়, তা ত্বকে চুলকানি ও জ্বালা সৃষ্টি করে। চোখে সর্বক্ষণ জ্বালা ও পানি পড়া সাধারণ ব্যাপার। খাবার বলতে শুকনো মরিচ, ডাল ও কিছু শস্য, সবজি, দুধ কিংবা মাংসের নাগাল মেলে না।

অবহেলার মাঝে ঐতিহ্যের টান

সরকার কিছু মৌলিক সহায়তা দিলেও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার সমাধান হয়নি। স্বাস্থ্যহানির পরও আগারিয়া সম্প্রদায়ের অনেকে পেশা ছাড়তে চান না। তাদের মতে, লবণ উৎপাদন একটি ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া এক শিল্প, যা তারা সহজে হারাতে রাজি নন।