বাংলাদেশের নদীবহুল ভূখণ্ডে প্রতিটি নদীই স্থানীয় জীবন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি অঞ্চলের ঝিনাই নদীও এর ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাস, কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে নদীটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
উৎপত্তি ও প্রবাহ
ঝিনাই নদী মূলত ব্রহ্মপুত্রের একটি পুরাতন ধারা। ব্রহ্মপুত্র যখন প্রবল প্রবাহে যমুনা নদীতে অধিকাংশ পানি সরিয়ে নেয়, তখন ঝিনাই সেই বিচ্ছিন্ন ধারা হিসেবে আলাদা পথ তৈরি করে। নদীটি জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি হয়ে প্রবাহিত হয়। এর এক শাখা দক্ষিণে যমুনায় মিশে গেছে, আরেকটি শাখা টাঙ্গাইল জেলার দিকে গিয়ে শেষ হয়েছে। গবেষণায় নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৩ কিলোমিটার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
অতীতে ঝিনাই নদী স্থানীয় কৃষি ও বাণিজ্যের প্রধান ভরসা ছিল। নদীপথে পণ্য পরিবহন, নৌকাভিত্তিক যাতায়াত এবং মাছ ধরার সংস্কৃতি এই অঞ্চলের মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সরিষাবাড়ি ও আশেপাশের গ্রামগুলোতে নদীর তীরে হাটবাজার গড়ে উঠেছিল, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রেখেছিল।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা
ঝিনাই নদী কৃষির সেচ, মৎস্যচাষ, যাতায়াত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ। একসময় নদীর ওপরে নির্মিত সেতুটি সরিষাবাড়ি ও মাদারগঞ্জকে সংযুক্ত করেছিল। কিন্তু ২০২০ সালের ভয়াবহ বন্যায় সেতুটি ভেঙে পড়ে। এর ফলে অন্তত ২৫টি গ্রামের মানুষের যাতায়াতে বিপর্যয় নেমে আসে। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী—সবারই খরচ ও সময় বেড়ে যায়, এবং ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে চলাচল করতে বাধ্য হয় তারা।
পানির গুণমান ও পরিবেশ
গবেষণায় দেখা গেছে, ঝিনাই নদীর পানির মান ক্রমশ খারাপ হচ্ছে।
- নদীতে দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ (TDS), লবণাক্ততা, pH ও রাসায়নিক উপাদানের মাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপদ সীমার বাইরে গেছে।
- তীরবর্তী শিল্প কারখানা, প্রিন্টিং-ডাইং কারখানা, পোল্ট্রি খামার ও ওষুধ শিল্পের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে।
- এর ফলে মাছের মধ্যে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, যা বাজারজাতকরণে সমস্যা সৃষ্টি করছে।
- পানি শোধনের অভাব ও অব্যবস্থাপনার কারণে নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে।

নদীর জীববৈচিত্র্য
ঝিনাই নদী একসময় নানা প্রজাতির মাছের আধার ছিল। রুই, কাতলা, শোল, টাকি, কইসহ অসংখ্য দেশি প্রজাতির মাছ এই নদীতে পাওয়া যেত। বর্ষাকালে মাছের প্রজনন হতো এবং শুষ্ক মৌসুমেও নদী মাছের ভাণ্ডার ছিল। কিন্তু দূষণ, জলজ উদ্ভিদ (বিশেষ করে শাপলা, কচুরিপানা), অতিরিক্ত বালি উত্তোলন এবং অব্যবস্থাপনার কারণে মাছের প্রজনন কমে যাচ্ছে। ২০২২ সালে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল যে, নদীতে এত বেশি কচুরিপানা ভেসে আসে যে মানুষ হাঁটতে পারত। এটি পরিবহন ও মৎস্যচাষ উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ
১. যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: সেতু ভেঙে পড়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়েছে।
২. পানিদূষণ: শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য ও খামারের অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলা পানিকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে।
৩. তীরভাঙন: নদীর তীর ধ্বসে ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে যাচ্ছে।
৪. জলজ আগাছা: কচুরিপানা নদীর প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টি করছে।
৫. জীববৈচিত্র্য ধ্বংস: দেশি মাছের প্রজনন কমে গেছে এবং কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে।

সমাধান ও সুপারিশ
- সেতু পুনর্নির্মাণ: জরুরি ভিত্তিতে নতুন সেতু নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে হবে।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য শোধনাগার ছাড়া নদীতে ফেলার অনুমতি দেওয়া যাবে না।
- তীর রক্ষা বাঁধ: ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ জরুরি।
- জলজ আগাছা অপসারণ: নিয়মিত উদ্যোগ নিয়ে কচুরিপানা সরানো উচিত।
- জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ: মাছের প্রজনন মৌসুমে জাল ফেলা বন্ধ ও নদীতে দেশি প্রজাতির মাছের পুনরায় অবমুক্তকরণ কার্যক্রম চালু করা দরকার।
- গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ: নদীর পানির মান, গভীরতা ও প্রবাহ নিয়মিতভাবে পরিমাপ করে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
ঝিনাই নদী কেবল একটি জলধারা নয়, বরং সরিষাবাড়ির মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যোগাযোগ সংকট, দূষণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং নদী ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনা এই নদীকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঝিনাই নদী তার ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলবে। আর নদী হারালে হারাবে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার প্রধান ভরসা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















