বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা নতুন কোনো বিষয় নয় বাংলাদেশে। বার বার ঘটেছে। তারপরেও ইতিহাসের প্রকৃত মাটিতে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ যমজ শব্দ। এ নিয়ে তর্ক করা, নতুন করে কিছু লেখা বাতুলতা মাত্র।
ইতিহাস কোনো কল্পকাহিনী নয়, বাস্তব ঘটনা। তা নিয়ে যত ধরনের ন্যারেটিভ দাঁড় করানো হোক না কেন, সবই অর্থহীন এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা রাজনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক।
ইতিহাসে যার যা অবস্থান তা ইতিহাসই নির্ধারণ করে। আর মনে রাখা দরকার যে কোনো জাতির ইতিহাস শুধু ওই জাতির ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্যে লেখা হয় না। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কোনো গবেষক এ ইতিহাস লেখে।

তাই ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্যে যদি অতিরঞ্জনের চেষ্টা হয় আবার মুছে দেওয়ার চেষ্টা হয়—কোনোটাই টিকে থাকে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পৃথিবীর গেম চেঞ্জার নন, তবে বাংলাদেশের তিনিই মূল ও একমাত্র গেম চেঞ্জার।
আজ যে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র, বাঙালি মুসলিমের মধ্যে বিশাল মিডল ক্লাস গড়ে উঠেছে, আজ যে কুঁড়ে ঘর থেকে শুরু করে কুলি-কামিনের ছেলে-মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারছে, রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হতে পারছে—এমনকি বিশ্বসভায় গিয়ে আসন নিয়ে বসতে পারছে—এটা তাঁর নেতৃত্ব ও সংগ্রামের ফসল।
তার নেতৃত্বের মূল লক্ষ্যই ছিল দরিদ্র বাঙালি মুসলিমকে বাঁচানো ও শিক্ষিত করা। কারণ, কয়েক ঘর জমিদার মুসলিম ও কিছু সামন্ত মুসলিম পরিবারের বাইরে পূর্ববাংলার বেশিরভাগ মুসলিমই ছিল দরিদ্র।
এক্ষেত্রে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক যুক্তবঙ্গের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। তবে আজকের এই অবস্থার জন্য সব থেকে বড় নিয়ামক স্বাধীন বাংলাদেশে। আর সেটা সৃষ্টির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

আর এই বাংলাদেশ সৃষ্টির মূল নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, যা তিনি ১৯৭১এ এসে হঠাৎ করে হননি। বরং পূর্ব পাকিস্তানের সকল নেতাকে পিছে ফেলে তিনি সামনে চলে আসেন, আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করার পরেই। যখন আইয়ুব খান এবডো ও প্রোডোর মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের সামনে দুটো অপশন ফেলে দেন—হয় তাদের মুচলেকা দিয়ে রাজনীতি করা থেকে বিরত থাকতে হবে—না হয় কারাবরণ করতে হবে। তখন সিনিয়র নেতারা প্রায় সবাই মুচলেকার পথ নিয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর তরুণ সঙ্গীরা কারাবরণের পথ নেন। আর সেই দিনই তিনি অন্যদের পিছে ফেলে সামনে চলে আসেন।
তার পর থেকে ধীরে ধীরে পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস ও সংগ্রাম তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। আর যার ফল মানুষ দেখেছে—মুক্তিযুদ্ধে বুলেটের থেকেও ভয়ংকর ছিল “জয় বাংলা” ও “জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান।
আর বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ যে তখন শেখ মুজিবেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে গিয়েছিল তার প্রমাণ তো মুক্তিসংগ্রামের ওই গান—“শোনো একটি মুজিবের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মুজিবের কণ্ঠ ধ্বনি।”
বাস্তবে সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিকামী মানুষ আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সংগ্রাম মিলে-মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। যেখানে বাংলাদেশের পতাকা, মানচিত্র ও শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি একই কাতারে দাঁড়িয়ে ছিল—ভালোবাসায় ও মর্যাদায়।
এর পরে বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন। ইতিহাসের ন্যারেটিভ রাষ্ট্রক্ষমতার কুটিল স্বার্থে বার বার পরিবর্তন হয়েছে। তাতে জাতি হিসেবে বাঙালি বাস্তবে অসম্মানিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কোনো ক্ষতি হয়নি—ইতিহাসে তাঁর নিজস্ব অবস্থান থেকে।

যেমন ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরলে প্রথম যে বিজয় দিবস আসে, ওই বিজয় দিবসের আগের দিনের রাতের একটি ঘটনা: কবি সৈয়দ আতিকুল্লাহ তখন একটি বিশেষ মর্যাদায় সংবাদে কাজ করতেন। রাত দশটার দিকে তিনি এক আড্ডায় এসে বলেন, “আজ সংবাদ বিজয় দিবসের নিউজ মেকআপ করছিল শুধুমাত্র জাতীয় স্মৃতিসৌধের ছবি দিয়ে, আমি দেখতে পেয়ে বলি ওর ভেতর শেখ মুজিবের ছবি দাও, তা না হলে বিজয় দিবসের নিউজের পূর্ণতা আসে না।” পরদিন সকালের সংবাদপত্রিকায় আমরা সেভাবেই দেখেছিলাম।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতা ছিলেন কি ছিলেন না, তিনি কী করেছিলেন—কী করেননি—এই সবই অর্বাচীন তর্ক —এ সম্পর্কে কেবল একটা কথাই বলা যায়—এ কোনো সুস্থতার লক্ষণ নয়।
বরং এটাই বলা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিজয় দিবস থেকে বাদ দিয়ে—ইতিহাস থেকে তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দিয়ে—আজ যে বিজয় দিবস পালন হচ্ছে, এর সঙ্গে সঠিকভাবে মিলে যায় বঙ্গবন্ধুর ভেঙে ফেলা বাড়ির ছবিটি। ওই ভেঙে ফেলা বাড়ির ছবিই—যারা বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া বিজয় দিবস পালন করছে, তাদের বিজয় দিবসের প্রকৃত উপমা।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।

স্বদেশ রায় 



















