০৪:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২৬
ইনকুইজিশনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো: ডোনা গ্রাসিয়ার সাহসী লড়াই হাজারীবাগে যুবককে কুপিয়ে হত্যা রাজশাহীর পুঠিয়ায় বালুবাহী ট্রাক উল্টে চারজন নিহত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হোস্টেল থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার ২০২৬ সালের শুরুতে জ্বালানির দাম লিটারে দুই টাকা কমাল বাংলাদেশ পানামা খালের ছায়ায় ভূরাজনীতি: চীনা স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙা নিয়ে নতুন বিতর্ক চিপ শিল্পে দেশীয়তার কঠোর শর্ত চীনের, নতুন সক্ষমতায় অর্ধেক যন্ত্র হতেই হবে ঘরোয়া শিশুকালে অতিরিক্ত পর্দা, কৈশোরে উদ্বেগের ঝুঁকি রেলপথে হাতির মৃত্যু বাড়াচ্ছে উন্নয়ন চাপ, সংকটে ভারতের হাতি করিডর সংস্কৃতির মিলনেই সিঙ্গাপুরের শক্তি, যৌথ পরিচয় আরও দৃঢ় হবে

ইনকুইজিশনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো: ডোনা গ্রাসিয়ার সাহসী লড়াই

ষোড়শ শতকের ইউরোপে ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য সময়টা ছিল ভয়ংকর। ধর্মীয় ইনকুইজিশনের চোখরাঙানি, সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া এবং কারাবরণের আশঙ্কা ঘিরে ধরেছিল বহু পরিবারকে। সেই অন্ধকার সময়েই ইউরোপের ইহুদি প্রবাসী সমাজের একজন অসাধারণ নেত্রী হিসেবে উঠে আসেন ডোনা গ্রাসিয়া। বিপুল সম্পদ, তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বুদ্ধি এবং অদম্য সাহস দিয়ে তিনি নিজের পরিবার ও সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে যান।

পর্তুগালে বিপদের শুরু

ডোনা গ্রাসিয়া, যিনি জন্মসূত্রে গ্রাসিয়া মেন্দেস নাসি নামে পরিচিত, অল্প বয়সেই স্বামী হারান। স্বামী ফ্রান্সিসকো মেন্দেস ছিলেন একজন ধনী মসলা ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার। তাঁর মৃত্যুর পর গ্রাসিয়া বিপুল সম্পদের মালিক হলেও লিসবনের ক্যাথলিক ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন গোপন ইহুদি হিসেবে সেই সম্পদই হয়ে ওঠে তাঁর জন্য বড় বিপদ। ইনকুইজিশন শুরু হওয়ার আগেই ঘুষ দাবি, রাজকীয় চাপ এবং কন্যা আনার ভবিষ্যৎ নিয়ে ষড়যন্ত্র তাঁকে কোণঠাসা করে তোলে।

দেশ ছাড়ার কৌশল

পর্তুগাল থেকে কথোপকথনমূলকভাবে ইহুদি পরিবারদের দেশত্যাগ নিষিদ্ধ ছিল। তবু ডোনা গ্রাসিয়া একসঙ্গে দুটি পরিকল্পনা নেন। একদিকে রাজাকে বোঝান যে তাঁর সম্পদের বড় অংশ রয়েছে অ্যান্টওয়ার্পে, তাই সেখানে যাওয়ার অনুমতি প্রয়োজন। অন্যদিকে ভ্যাটিকান থেকে বিশেষ নিরাপদ ভ্রমণ অনুমতিপত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেন, যা তাঁকে ইউরোপজুড়ে চলাচলের সুযোগ দিত। এই দ্বৈত কৌশলই শেষ পর্যন্ত তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে দেশ ছাড়ার পথ করে দেয়।

অ্যান্টওয়ার্পে নতুন চ্যালেঞ্জ

অ্যান্টওয়ার্পে গিয়েও সমস্যার শেষ হয়নি। সেখানকার শাসকরাও ডোনা গ্রাসিয়ার কন্যাকে রাজনৈতিক স্বার্থে বিয়ের পণ্যে পরিণত করতে চায়। ডোনা গ্রাসিয়া স্পষ্টভাবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর সরাসরি ও দৃঢ় অবস্থান শাসকদের বিস্মিত করে, কিন্তু এতে তাঁর ওপর চাপ আরও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে আবারও শহর ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

পরিবারের ভেতরের বিশ্বাসঘাতকতা

এই সময়েই পারিবারিক দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শ্যালক ডিওগোর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানদের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। নিজের বোনের বিরুদ্ধেই গোপন ইহুদি পরিচয়ের অভিযোগ ওঠে, যা ডোনা গ্রাসিয়াকে আবার পালাতে বাধ্য করে। তিনি ভেনিস হয়ে ফেরারায় আশ্রয় নেন।

Unsung Women | Dona Gracia Nasi Mendes – The Forward

সম্প্রদায়ের পক্ষে নেতৃত্ব

ব্যক্তিগত সংকটের মাঝেও ডোনা গ্রাসিয়া থেমে যাননি। তিনি ইনকুইজিশনের হাত থেকে ইহুদিদের উদ্ধার করতে গোপন পালানোর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। ইতালির আনকোনা বন্দরে ইহুদি নিপীড়নের প্রতিবাদে বাণিজ্য বয়কটের নেতৃত্বও দেন, যদিও তা দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়নি।

খোলামেলা ইহুদি জীবন ও তিবেরিয়াস

অবশেষে ১৫৫৩ সালে তিনি কনস্টান্টিনোপলে বসতি স্থাপন করেন। এখানে তিনি প্রকাশ্যে ইহুদি হিসেবে জীবনযাপন করতে পারেন। উসমানীয় সুলতানের অনুমতিতে তিনি তিবেরিয়াস শহর পুনর্গঠনে অর্থ সহায়তা দেন। এই শহরটি হয়ে ওঠে ইউরোপ থেকে পালিয়ে আসা ইহুদিদের নিরাপদ আশ্রয়। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে আধুনিক ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক প্রচেষ্টাগুলোর একটি।

Gracia Mendes Nasi, Renaissance Businesswoman - HeadStuff

অবিস্মরণীয় উত্তরাধিকার

ডোনা গ্রাসিয়া ১৫৬৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। সময়ের সঙ্গে তাঁর নাম অনেকটাই আড়ালে চলে গেলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় নতুন নথি উঠে এসেছে, যা তাঁর জীবন ও পরিচয় সম্পর্কে নতুন আলোকপাত করছে। নিজের চিঠিপত্রে তিনি ‘ইহুদার সিংহ’ সিল ব্যবহার করতেন, যা ইঙ্গিত দেয় তিনি নিজেকে শুধু ধনী ব্যবসায়ী নয়, বরং এক ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের ধারক হিসেবেও দেখতেন।

ডোনা গ্রাসিয়ার জীবন প্রমাণ করে, প্রতিকূল সময়েও সাহস, বুদ্ধি ও দৃঢ়তার মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া সম্ভব।

ইনকুইজিশনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো: ডোনা গ্রাসিয়ার সাহসী লড়াই

ইনকুইজিশনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো: ডোনা গ্রাসিয়ার সাহসী লড়াই

০২:৫৯:৩৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬

ষোড়শ শতকের ইউরোপে ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য সময়টা ছিল ভয়ংকর। ধর্মীয় ইনকুইজিশনের চোখরাঙানি, সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া এবং কারাবরণের আশঙ্কা ঘিরে ধরেছিল বহু পরিবারকে। সেই অন্ধকার সময়েই ইউরোপের ইহুদি প্রবাসী সমাজের একজন অসাধারণ নেত্রী হিসেবে উঠে আসেন ডোনা গ্রাসিয়া। বিপুল সম্পদ, তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বুদ্ধি এবং অদম্য সাহস দিয়ে তিনি নিজের পরিবার ও সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে যান।

পর্তুগালে বিপদের শুরু

ডোনা গ্রাসিয়া, যিনি জন্মসূত্রে গ্রাসিয়া মেন্দেস নাসি নামে পরিচিত, অল্প বয়সেই স্বামী হারান। স্বামী ফ্রান্সিসকো মেন্দেস ছিলেন একজন ধনী মসলা ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার। তাঁর মৃত্যুর পর গ্রাসিয়া বিপুল সম্পদের মালিক হলেও লিসবনের ক্যাথলিক ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন গোপন ইহুদি হিসেবে সেই সম্পদই হয়ে ওঠে তাঁর জন্য বড় বিপদ। ইনকুইজিশন শুরু হওয়ার আগেই ঘুষ দাবি, রাজকীয় চাপ এবং কন্যা আনার ভবিষ্যৎ নিয়ে ষড়যন্ত্র তাঁকে কোণঠাসা করে তোলে।

দেশ ছাড়ার কৌশল

পর্তুগাল থেকে কথোপকথনমূলকভাবে ইহুদি পরিবারদের দেশত্যাগ নিষিদ্ধ ছিল। তবু ডোনা গ্রাসিয়া একসঙ্গে দুটি পরিকল্পনা নেন। একদিকে রাজাকে বোঝান যে তাঁর সম্পদের বড় অংশ রয়েছে অ্যান্টওয়ার্পে, তাই সেখানে যাওয়ার অনুমতি প্রয়োজন। অন্যদিকে ভ্যাটিকান থেকে বিশেষ নিরাপদ ভ্রমণ অনুমতিপত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেন, যা তাঁকে ইউরোপজুড়ে চলাচলের সুযোগ দিত। এই দ্বৈত কৌশলই শেষ পর্যন্ত তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে দেশ ছাড়ার পথ করে দেয়।

অ্যান্টওয়ার্পে নতুন চ্যালেঞ্জ

অ্যান্টওয়ার্পে গিয়েও সমস্যার শেষ হয়নি। সেখানকার শাসকরাও ডোনা গ্রাসিয়ার কন্যাকে রাজনৈতিক স্বার্থে বিয়ের পণ্যে পরিণত করতে চায়। ডোনা গ্রাসিয়া স্পষ্টভাবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর সরাসরি ও দৃঢ় অবস্থান শাসকদের বিস্মিত করে, কিন্তু এতে তাঁর ওপর চাপ আরও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে আবারও শহর ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

পরিবারের ভেতরের বিশ্বাসঘাতকতা

এই সময়েই পারিবারিক দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শ্যালক ডিওগোর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানদের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। নিজের বোনের বিরুদ্ধেই গোপন ইহুদি পরিচয়ের অভিযোগ ওঠে, যা ডোনা গ্রাসিয়াকে আবার পালাতে বাধ্য করে। তিনি ভেনিস হয়ে ফেরারায় আশ্রয় নেন।

Unsung Women | Dona Gracia Nasi Mendes – The Forward

সম্প্রদায়ের পক্ষে নেতৃত্ব

ব্যক্তিগত সংকটের মাঝেও ডোনা গ্রাসিয়া থেমে যাননি। তিনি ইনকুইজিশনের হাত থেকে ইহুদিদের উদ্ধার করতে গোপন পালানোর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। ইতালির আনকোনা বন্দরে ইহুদি নিপীড়নের প্রতিবাদে বাণিজ্য বয়কটের নেতৃত্বও দেন, যদিও তা দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়নি।

খোলামেলা ইহুদি জীবন ও তিবেরিয়াস

অবশেষে ১৫৫৩ সালে তিনি কনস্টান্টিনোপলে বসতি স্থাপন করেন। এখানে তিনি প্রকাশ্যে ইহুদি হিসেবে জীবনযাপন করতে পারেন। উসমানীয় সুলতানের অনুমতিতে তিনি তিবেরিয়াস শহর পুনর্গঠনে অর্থ সহায়তা দেন। এই শহরটি হয়ে ওঠে ইউরোপ থেকে পালিয়ে আসা ইহুদিদের নিরাপদ আশ্রয়। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যে আধুনিক ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক প্রচেষ্টাগুলোর একটি।

Gracia Mendes Nasi, Renaissance Businesswoman - HeadStuff

অবিস্মরণীয় উত্তরাধিকার

ডোনা গ্রাসিয়া ১৫৬৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। সময়ের সঙ্গে তাঁর নাম অনেকটাই আড়ালে চলে গেলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় নতুন নথি উঠে এসেছে, যা তাঁর জীবন ও পরিচয় সম্পর্কে নতুন আলোকপাত করছে। নিজের চিঠিপত্রে তিনি ‘ইহুদার সিংহ’ সিল ব্যবহার করতেন, যা ইঙ্গিত দেয় তিনি নিজেকে শুধু ধনী ব্যবসায়ী নয়, বরং এক ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের ধারক হিসেবেও দেখতেন।

ডোনা গ্রাসিয়ার জীবন প্রমাণ করে, প্রতিকূল সময়েও সাহস, বুদ্ধি ও দৃঢ়তার মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া সম্ভব।