গত বছরের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্সির শুরুর পর থেকে মাত্র বারো মাসেই বিশ্ব রাজনীতি, জলবায়ু নীতি, জনস্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একের পর এক বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের প্রভাব সীমিত ছিল বলে যাঁরা মনে করেছিলেন, তাঁদের সেই ধারণা এবার পুরোপুরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই সিদ্ধান্তের বন্যা নামিয়ে বিরোধী শিবির ও গণমাধ্যমকে চাপে রাখার কৌশল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে নির্গমন কমানোর একটি ঐতিহাসিক বৈশ্বিক চুক্তি ভেস্তে দিয়েছে। দেশের ভেতরে প্রেসিডেন্সিয়াল আদেশের মাধ্যমে এবং সরকারি দক্ষতা দপ্তরের উদ্যোগে জলবায়ু, শিল্পদূষণ ও জনস্বাস্থ্য–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলিতে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। আবহাওয়া, পরিবেশ ও মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বহু প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পরিবেশ ও জলবায়ু সংস্থাগুলির ভাঙন
ট্রাম্প প্রশাসনের নিশানায় শুরু থেকেই ছিল পরিবেশ ও বিজ্ঞানভিত্তিক সরকারি সংস্থাগুলি। মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সহায়তাকারী জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশনের কর্মীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষণায় অগ্রণী সংস্থাগুলির গবেষণা কেন্দ্র বন্ধ হয়েছে, বহু বিজ্ঞানী চাকরি হারিয়েছেন। আবহাওয়া পরিষেবায় জনবল কমে যাওয়ায় ঝড়, বন্যা ও চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। মহাকাশ গবেষণায় বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানগুলিও বাজেট সংকোচনের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষতির অনেকটাই স্থায়ী। ভবিষ্যতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেও গবেষণা পরিকাঠামো পুনর্গঠনে বছর নয়, দশক লেগে যেতে পারে। এর প্রভাব সরাসরি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার ওপর পড়বে।

শুল্ক নীতিতে বৈশ্বিক ধাক্কা
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতেও তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। একযোগে বহু দেশ ও অঞ্চলের ওপর পাল্টা শুল্ক চাপানোয় দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি বড় ধাক্কা খেয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পনির্ভর অর্থনীতিগুলিতে রপ্তানি কমেছে, লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কাজ ঝুঁকিতে পড়েছে। আফ্রিকার বহু দেশেও শুল্ক বাড়ার ফলে শিল্প ও কৃষিখাতে চাকরি হ্রাসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই শুল্ক নীতির ফলে দীর্ঘদিনের সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে। অনেক পণ্য মাঝপথে বন্দরে আটকে গেছে বা ফেরত পাঠাতে হয়েছে। উৎপাদনকারী দেশগুলিতে অনিশ্চয়তা এতটাই বেড়েছে যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আবহাওয়া সতর্কতা থেকে জনস্বাস্থ্য সংকট
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও জলবায়ু বিশ্লেষণে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দেওয়া সংস্থাগুলির বাজেট ব্যাপকভাবে কমানো হয়েছে। ঝড়, তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা এতে দুর্বল হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রাণঘাতী বন্যা ও তাপদাহের সময় এই ঘাটতির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও একই ছবি। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত বহু অভিজ্ঞ কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন। সংক্রামক রোগের নজরদারি ও তথ্য প্রকাশে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। এর ফলে কিছু রাজ্যে টিকাদান নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
জ্বালানি নীতিতে ইউটার্ন
পরিষ্কার জ্বালানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক অতীতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলেও ট্রাম্প প্রশাসন সেই গতি থামিয়ে দিয়েছে। বায়ু ও সৌর শক্তি প্রকল্পে নতুন অনুমতি স্থগিত হয়েছে, করছাড় বাতিল করা হয়েছে এবং সরকারি জমিতে এসব প্রকল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। এর বিপরীতে তেল, গ্যাস ও কয়লা খননের পথ আরও প্রশস্ত করা হয়েছে। উপকূল ও সংরক্ষিত এলাকাতেও খননের পরিকল্পনা সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতির ফলে আগামী এক দশকে কার্বন নির্গমন কমানোর গতি অর্ধেকেরও বেশি কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের দাম বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির জন্য।
বন্যপ্রাণ ও বন সংরক্ষণে চাপ
বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ সংস্থাগুলিতেও কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। বহু সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সড়ক নির্মাণ ও কাঠ কাটার ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চল ও কার্বনসমৃদ্ধ পুরোনো বন ধ্বংসের আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে বন্যপ্রাণের আবাসস্থল খণ্ডিত হবে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরই যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও প্রশাসনে গভীর পরিবর্তন এনেছে। জলবায়ু, জনস্বাস্থ্য, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সমর্থকদের মতে এটি আমূল সংস্কার, সমালোচকদের চোখে এটি ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















