কিয়েভ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ বন্ধের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই দেশের সম্পূর্ণ বিপরীত লক্ষ্য। ইউক্রেন পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গড়তে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অন্যদিকে রাশিয়া যে কোনো মূল্যে ইউক্রেনকে আবার নিজের প্রভাববলয়ে ফিরিয়ে আনতে চায়। এই মৌলিক বিরোধই যুদ্ধের অবসানকে কঠিন করে তুলছে।
নতুন প্রস্তাব, পুরোনো আপত্তি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ভূমিকা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের জন্য ন্যাটোর মতো নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, বর্তমান যুদ্ধরেখা বরাবর নিরস্ত্রীকৃত মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। এসব প্রস্তাব রাশিয়ার যুদ্ধলক্ষ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত হওয়ায় মস্কো এগুলো প্রত্যাখ্যান করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠকের পর পরিস্থিতি
মার-আ-লাগোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের পর কিছুটা আশাবাদ তৈরি হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বৈঠকের আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘ ফোনালাপ করেন। এরপরই ক্রেমলিন দাবি তোলে, ইউক্রেন নাকি পুতিনের একটি অবকাশযাপনের বাসভবনে ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছে। রাশিয়া এই দাবির পক্ষে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি, ইউক্রেনও অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগ ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি রাশিয়ার কড়া বার্তা। এর মাধ্যমে মস্কো বোঝাতে চেয়েছে, বর্তমান শান্তি আলোচনার দিকনির্দেশ তাদের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
কূটনৈতিক চাপ ও পরিবর্তিত প্রস্তাব
গত নভেম্বর থেকে ইউক্রেনকে একটি ২৮ দফা শান্তি প্রস্তাবে স্বাক্ষরের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল, যাতে রাশিয়ার পক্ষে বড় ছাড় ছিল। পরে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতায় সেটি সংক্ষিপ্ত হয়ে ২০ দফায় নেমে আসে। নতুন প্রস্তাবে ইউক্রেনকে দখল হওয়া ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার কথা সরাসরি বলা নেই। এতে কিয়েভ কিছুটা স্বস্তি পেলেও মস্কোর আপত্তি আরও বেড়েছে।
রাশিয়ার সামরিক লক্ষ্য অপরিবর্তিত
রাশিয়া স্পষ্ট করেছে, তারা ইউক্রেনের পশ্চিমা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোতে যোগদানের ইউক্রেনীয় পরিকল্পনা রুখে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য। এই কারণেই ক্রিমিয়া দখল এবং পূর্ব ইউক্রেনে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছিল। নতুন শান্তি প্রস্তাবগুলোর বেশির ভাগই ইউক্রেনের পশ্চিমা সংযোগ শক্তিশালী করে, যা রাশিয়ার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
ড্রোন অভিযোগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
পুতিনের বাসভবনে ড্রোন হামলার অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভারত, পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ রাশিয়ার দাবি মেনে ইউক্রেনকে নিন্দা জানায়, যদিও কোনো স্বাধীন প্রমাণ সামনে আসেনি। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই অভিযোগ আসন্ন বড় ধরনের রুশ হামলার অজুহাত তৈরি করছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা দাবি করেন, রাশিয়ার দেওয়া তথ্যেও অসঙ্গতি রয়েছে। কোথাও বলা হয়েছে ৯১টি ড্রোন ভূপাতিত হয়েছে, আবার কোথাও ৪১টির কথা বলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের কোনো দৃশ্য পাওয়া যায়নি, যা সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।
শান্তির পথ কতটা দূরে
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের অবস্থান এতটাই বিপরীত যে আপস করা প্রায় অসম্ভব। ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী বা মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল—সবকিছুই রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের বিরুদ্ধে যায়। ফলে সরাসরি সমঝোতার বদলে রাশিয়া কৌশলে আলোচনাকে ভণ্ডুল করার পথ বেছে নিচ্ছে।
এক ইউক্রেনীয় সংসদ সদস্যের ভাষায়, রাশিয়া আপস চায় না, শুধু সময় ক্ষেপণ করতে চায় এবং দায় ইউক্রেনের ঘাড়ে চাপাতে চায়। নতুন বছরে তাই যুদ্ধের অবসান নয়, বরং কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















