ব্রঙ্কস মুসলিম সেন্টারের পুরোনো ভবনে জুমার নামাজ শেষে সরু সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছিলেন প্রায় দুই শতাধিক মুসল্লি। বাইরে পা রেখেই ওসমান আলাহলেমির চোখে পড়ে এক বিশাল নির্মাণকাজ—৩২ হাজার বর্গফুটের নতুন মসজিদ। ‘লিটল ইয়েমেন’ নামে পরিচিত এলাকায় গড়ে ওঠা এই মসজিদ ২০২৬ সালের শেষ দিকে চালু হলে নিউইয়র্ক রাজ্যের সবচেয়ে বড় মসজিদ হবে। ইয়েমেনি খাবারের দোকান, উপহার সামগ্রী ও পোশাকের ব্যবসায় ঘেরা এই পাড়া এখন এক নতুন পরিচয়ে দাঁড়িয়ে।
আলাহলেমি বলেন, এই এলাকায় তারা শুধু বসবাসই করেননি, গড়ে তুলেছেন একটি সমাজ। নতুন মসজিদে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হবে, দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা এখানে আসবেন। একসময় যেখানে ইতালীয় অভিবাসীদের প্রভাব ছিল, সেখানে এখন ইয়েমেনের পতাকা উড়ছে।
বহুজাতিক ও বহু সংস্কৃতির শহর নিউইয়র্কে ক্ষমতার দখল বহুবার হাতবদল হয়েছে। ডাচ, আইরিশ, ইতালীয়, ইহুদি ও আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর পর এবার মুসলিমরা শহরের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গত নভেম্বরে জোহরান মামদানির মেয়র নির্বাচনে জয়ে মুসলিম ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক নতুন যুগের সূচনা হয়।
চৌত্রিশ বছর বয়সী এই আইনপ্রণেতা দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিউইয়র্ক পেল প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় মেয়র। দীর্ঘদিন শহরের ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজেদের অনুপস্থিত মনে করা মুসলিমদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আশা। ব্রুকলিনের বাসিন্দা হাফিজ রাজা বলেন, মামদানির মধ্যে তারা নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান। বহু বছর পর মানুষ কথা বলার শক্তি অনুভব করছে।
নিউইয়র্কের মুসলিম সমাজে দক্ষিণ এশীয়, ইন্দো-ক্যারিবীয়, আরব ও আফ্রিকান অভিবাসীদের পাশাপাশি রয়েছে আফ্রিকান-আমেরিকান মুসলিমদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি। ব্রঙ্কস, ব্রুকলিন ও কুইন্সে তারা গড়ে তুলেছে নতুন নতুন পাড়া, ব্যবসা কেন্দ্র, স্কুল ও উপাসনালয়। একই সঙ্গে অভিবাসন দমন অভিযান ও ইসলামবিদ্বেষী হামলার মতো চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হয়েছে।
দুই ডজনের বেশি মুসলিম বাসিন্দা ও নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক ক্ষমতা বাড়ায় তারা যেমন আশাবাদী, তেমনি মামদানির গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন সবাই। কেউ কেউ পুলিশিং, শিক্ষা ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে তার অবস্থানকে বেশি উদার মনে করেন। তবু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর হয়রানি ও নজরদারির স্মৃতি পেরিয়ে নিউইয়র্ককে এখন তারা তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখছেন।
কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন্সের নিউইয়র্ক শাখার নির্বাহী পরিচালক আফাফ নাশের বলেন, এই নির্বাচন মুসলিম সমাজের জাগরণকে প্রকাশ করেছে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তারা এখন প্রক্রিয়ার অংশ হতে চায়। প্রচারণায় ইসলামবিদ্বেষী অভিযোগের মুখে পড়লেও মামদানি নিজের পরিচয় ও আদর্শ নিয়ে আপসহীন থাকার বার্তা দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারিতে ধর্মীয় পরিচয় গণনা না হওয়ায় নিউইয়র্কে মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেয়ার-এর হিসাবে শহরে প্রায় ১০ লাখ মুসলিম বাস করেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় বারো শতাংশ। অন্য গবেষণায় সংখ্যা তুলনামূলক কম দেখানো হলেও নির্বাচনী তথ্য বলছে, ভোটের রাজনীতিতে মুসলিমদের প্রভাব বেড়েছে।
ডেসিস রাইজিং আপ অ্যান্ড মুভিং নামের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নির্বাচনে মুসলিম ভোটাররা মোট নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় সাত শতাংশ হলেও প্রদত্ত ভোটের প্রায় চৌদ্দ শতাংশ দিয়েছেন। কুইন্সের জামাইকা এলাকায় বাংলাদেশি মুসলিমদের সংখ্যা গত দুই দশকে পাঁচ গুণ বেড়েছে। ব্রুকলিনের সানসেট পার্ক, ব্রঙ্কস ও এমনকি স্টেটেন আইল্যান্ডেও মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
অনেক ভোটার বলেন, শহরকে সাশ্রয়ী করার প্রতিশ্রুতি, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, বিনা মূল্যের বাস ও সার্বজনীন শিশুসেবার মতো প্রতিশ্রুতি তাদের আকৃষ্ট করেছে। গাজা যুদ্ধের বিরোধিতা ও অনথিভুক্ত অভিবাসীদের সুরক্ষার অঙ্গীকারও মুসলিম ভোটারদের সক্রিয় করেছে।
ব্রুকলিনের সানসেট পার্কে মরক্কো থেকে আসা আবদেল তাজঘিনা প্রথমে একসময় ভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত মামদানিকেই ভোট দেন। তার মতে, বাড়িভাড়া, নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মিডউড এলাকায় পাকিস্তানি অধ্যুষিত ‘লিটল পাকিস্তান’-এও নির্বাচনের পর ব্যাপক রাজনৈতিক সক্রিয়তা দেখা গেছে। একসময় বিচ্ছিন্ন হিসেবে পরিচিত এই পাড়া এখন ভোটার নিবন্ধনে এগিয়ে এসেছে এবং ব্যাপকভাবে মামদানিকে সমর্থন করেছে।
তবে মুসলিম সমাজের কিছু দাবি রয়েছে। স্কুলে নামাজের সুবিধা, পুলিশের আচরণে পরিবর্তন এবং নগর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে মুসলিমদের নিয়োগ—এসব বিষয় তারা সামনে আনতে চায়। একই সঙ্গে ইসরায়েল প্রশ্নে মামদানির অবস্থান নিয়ে ইহুদি নেতাদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে।
ব্রঙ্কসের মরিস পার্ক এলাকায় ‘লিটল ইয়েমেন’-এর বাসিন্দারা চান, নতুন মেয়র তাদের কমিউনিটিকে আরও শক্তিশালী করুন। ইয়েমেনি অভিবাসন ও ব্যবসায়িক প্রসারে এলাকায় অর্থনৈতিক চাঙাভাব এসেছে, দোকানপাটের শূন্যতা কমেছে। তবে সংস্কৃতি ও পরিচয় নিয়ে মাঝেমধ্যে টানাপোড়েনও দেখা দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মার্ক ওয়াটসন বলেন, নতুন প্রতিবেশীদের কারণে তার বাড়ির মূল্য বেড়েছে এবং এলাকাটি এখন সত্যিকারের একটি কমিউনিটিতে পরিণত হয়েছে।
ইয়াহাই ওবেইদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহরে একজন মুসলিম মেয়র পাওয়া বড় ঘটনা। মতভেদ থাকলেও তারা তাকে সুযোগ দিতে প্রস্তুত। নিউইয়র্কের রাজনীতিতে এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে শহরের সামাজিক ও রাজনৈতিক গতিপথ নতুনভাবে নির্ধারণ করবে—এমনটাই মনে করছেন অনেকেই।-
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















