০১:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬

জাপানের রাজস্ব স্বাস্থ্য যাচাই: মূল্যস্ফীতির ধোঁয়াশায় পুরোনো সূচক

টোকিওর জাতীয় সংসদ ভবন ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে জাপানের রাজস্ব স্বাস্থ্য মাপার একটি পুরোনো সূচক। দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব শৃঙ্খলার মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত প্রাথমিক বাজেট ভারসাম্য এখন ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। বর্তমান প্রশাসনের ঘনিষ্ঠদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই সময়ে ওই সূচক কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছে এবং সময়ের সঙ্গে বেমানান একটি হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

প্রাথমিক বাজেট ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক

শতাব্দীর শুরু থেকে জাপানের একের পর এক সরকার প্রাথমিক বাজেট ভারসাম্যকে রাজস্ব শৃঙ্খলার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে ধরে এসেছে। এই সূচক মূলত সুদের খরচ বাদ দিয়ে কর আয় ও সরকারি ব্যয়ের ব্যবধান নির্দেশ করে, অর্থাৎ সরকার দৈনন্দিন খরচ চালাতে পারছে কি না তা বোঝায়। তবে বর্তমান মূল্যস্ফীতির পরিবেশে এই সূচকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর উপদেষ্টারা।

সরকারপন্থী অর্থনীতিবিদদের যুক্তি, নামমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যখন সুদের হারের চেয়ে বেশি থাকে, তখন প্রাথমিক উদ্বৃত্ত অর্জন না করলেও মোট ঋণের অনুপাত স্বাভাবিকভাবেই কমে যেতে পারে। এই যুক্তির ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক ভারসাম্যের বদলে ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতকে প্রধান সূচক হিসেবে দেখার কথা বলছেন।

সমালোচকদের আশঙ্কা ও বাজারের দৃষ্টিভঙ্গি

এই অবস্থানের কড়া সমালোচকরা বলছেন, প্রাথমিক ভারসাম্যের গুরুত্ব কমিয়ে দেখানো আসলে প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করার কৌশল। তাঁদের মতে, এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জাপানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কেউ কেউ আবার মনে করছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রীর বেশি ব্যয় করার সুযোগ তৈরি করতেই নীরবে এই সূচককে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা

সরকারের বাইরে থাকা বহু অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ অনুপাত কমার পেছনে মূল কারণ অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও তুলনামূলক কম সুদের হার। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। সুদের হার বাড়লে এবং মূল্যস্ফীতি কমলে বর্তমান হিসাব ভেঙে পড়তে পারে। তাঁদের মতে, প্রাথমিক বাজেট উদ্বৃত্ত অর্জন ছাড়া সাধারণত ঋণ ও উৎপাদনের অনুপাত টেকসইভাবে কমে না।

সুদের হার ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে নীতিগত সুদের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলেছে। তবু তা এখনো নামমাত্র প্রবৃদ্ধির নিচে রয়েছে। সরকার আগামী বছরগুলোতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদের হার বাড়লে এই আশাবাদী চিত্র বদলে যেতে পারে। শুধু প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে প্রাথমিক ঘাটতি চালিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সরকারের অবস্থান ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন

সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক ভারসাম্যের লক্ষ্য পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি। তবে এখন বলা হচ্ছে, প্রতি বছর এই লক্ষ্য অর্জনের বদলে কয়েক বছর পরপর সূচকটি পর্যালোচনা করা হবে এবং ধীরে ধীরে ঋণ ও উৎপাদনের অনুপাত কমানোর দিকে জোর দেওয়া হবে। সমালোচকদের মতে, এই পরিবর্তন মূলত লক্ষ্য শিথিল করার একটি অজুহাত, যা দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা (পর্ব-৩৫১)

জাপানের রাজস্ব স্বাস্থ্য যাচাই: মূল্যস্ফীতির ধোঁয়াশায় পুরোনো সূচক

০১:২১:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

টোকিওর জাতীয় সংসদ ভবন ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে জাপানের রাজস্ব স্বাস্থ্য মাপার একটি পুরোনো সূচক। দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব শৃঙ্খলার মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত প্রাথমিক বাজেট ভারসাম্য এখন ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। বর্তমান প্রশাসনের ঘনিষ্ঠদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই সময়ে ওই সূচক কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছে এবং সময়ের সঙ্গে বেমানান একটি হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

প্রাথমিক বাজেট ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক

শতাব্দীর শুরু থেকে জাপানের একের পর এক সরকার প্রাথমিক বাজেট ভারসাম্যকে রাজস্ব শৃঙ্খলার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে ধরে এসেছে। এই সূচক মূলত সুদের খরচ বাদ দিয়ে কর আয় ও সরকারি ব্যয়ের ব্যবধান নির্দেশ করে, অর্থাৎ সরকার দৈনন্দিন খরচ চালাতে পারছে কি না তা বোঝায়। তবে বর্তমান মূল্যস্ফীতির পরিবেশে এই সূচকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর উপদেষ্টারা।

সরকারপন্থী অর্থনীতিবিদদের যুক্তি, নামমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যখন সুদের হারের চেয়ে বেশি থাকে, তখন প্রাথমিক উদ্বৃত্ত অর্জন না করলেও মোট ঋণের অনুপাত স্বাভাবিকভাবেই কমে যেতে পারে। এই যুক্তির ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী প্রাথমিক ভারসাম্যের বদলে ঋণ ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতকে প্রধান সূচক হিসেবে দেখার কথা বলছেন।

সমালোচকদের আশঙ্কা ও বাজারের দৃষ্টিভঙ্গি

এই অবস্থানের কড়া সমালোচকরা বলছেন, প্রাথমিক ভারসাম্যের গুরুত্ব কমিয়ে দেখানো আসলে প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করার কৌশল। তাঁদের মতে, এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জাপানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কেউ কেউ আবার মনে করছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রীর বেশি ব্যয় করার সুযোগ তৈরি করতেই নীরবে এই সূচককে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা

সরকারের বাইরে থাকা বহু অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ অনুপাত কমার পেছনে মূল কারণ অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও তুলনামূলক কম সুদের হার। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। সুদের হার বাড়লে এবং মূল্যস্ফীতি কমলে বর্তমান হিসাব ভেঙে পড়তে পারে। তাঁদের মতে, প্রাথমিক বাজেট উদ্বৃত্ত অর্জন ছাড়া সাধারণত ঋণ ও উৎপাদনের অনুপাত টেকসইভাবে কমে না।

সুদের হার ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে নীতিগত সুদের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলেছে। তবু তা এখনো নামমাত্র প্রবৃদ্ধির নিচে রয়েছে। সরকার আগামী বছরগুলোতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সুদের হার বাড়লে এই আশাবাদী চিত্র বদলে যেতে পারে। শুধু প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে প্রাথমিক ঘাটতি চালিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সরকারের অবস্থান ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন

সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাথমিক ভারসাম্যের লক্ষ্য পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি। তবে এখন বলা হচ্ছে, প্রতি বছর এই লক্ষ্য অর্জনের বদলে কয়েক বছর পরপর সূচকটি পর্যালোচনা করা হবে এবং ধীরে ধীরে ঋণ ও উৎপাদনের অনুপাত কমানোর দিকে জোর দেওয়া হবে। সমালোচকদের মতে, এই পরিবর্তন মূলত লক্ষ্য শিথিল করার একটি অজুহাত, যা দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করতে পারে।