এতটুকুই সময় নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দিতে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও বার্তায়। তিনি কংগ্রেসে যাননি। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কোনো প্রস্তাবও নেননি। বরং তার দ্বিতীয় মেয়াদে সবচেয়ে রাজতান্ত্রিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি নিয়ে তিনি এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়িয়ে দিয়েছেন।
আমি ইরানের শাসনব্যবস্থার তীব্র সমালোচক। শনিবারের বিমান হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতেও আমি শোকাহত নই। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে ইরাকে আমার দায়িত্বকালে যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাদের কেউ কেউ ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের ব্যবহৃত ইরানি অস্ত্রে নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা ব্যক্তিগত ক্ষোভ তৈরি করেছে।
কিন্তু ব্যক্তিগত অনুভূতি সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়। অনেকেই হয়তো বলবেন, আদর্শ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু যা হয়েছে তা মেনে নেওয়াই ভালো। এই মনোভাব সম্পূর্ণ ভুল।
মূল কথা হলো: ইরানে হামলার আগে ট্রাম্পের কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া উচিত ছিল, না হলে হামলা করা উচিত ছিল না। অনুমোদন ছাড়া এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছে এবং অতীতে শক্তিধর দেশগুলোর করা ভুল পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
সংবিধান ও যুদ্ধের ক্ষমতা
১৭৮৭ সালের সংবিধানের মূল লক্ষ্য ছিল একটি প্রজাতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। রাজতান্ত্রিক ক্ষমতা ভেঙে তা সরকারের বিভিন্ন শাখায় ভাগ করে দেওয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।
সামরিক বিষয়ে সংবিধান যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে দিয়েছে, আর সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্টকে দায়িত্ব দিয়েছে। অর্থাৎ, কংগ্রেসের নির্দেশ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যাবে না; কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে সেনাবাহিনী পরিচালনা করবেন প্রেসিডেন্ট।
এই কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি শান্তির পক্ষে একটি প্রাথমিক ধারণা তৈরি করে। কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের বোঝাতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যেতে পারে না।

এ নিয়ম সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য—যেমন উপসাগরীয় যুদ্ধে ডেজার্ট স্টর্ম, আফগানিস্তানে অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম এবং ইরাকে অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম।
এই প্রক্রিয়া শুধু অনুমোদনই দেয় না, জবাবদিহিও নিশ্চিত করে। প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসে যুদ্ধের কারণ, লক্ষ্য, সম্ভাব্য সাফল্য ও ঝুঁকি ব্যাখ্যা করতে হয়। এতে সিদ্ধান্তের দুর্বলতা খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়।
ইতিহাসের শিক্ষা ও সম্ভাব্য বিপদ
শুধু আকাশপথে শাসনব্যবস্থার বাহিনী দুর্বল করলে নিরস্ত্র বা প্রায় নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ সুযোগ পেয়ে সরকার উৎখাত করবে—এই ধারণা অতীতে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
ডেজার্ট স্টর্ম শেষে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকি সেনাবাহিনীকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করেছিল। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতাচ্যুত হবেন। কিন্তু তার কাছে যথেষ্ট অস্ত্র ও অনুগত বাহিনী ছিল। তিনি বিদ্রোহ দমন করে এক দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় টিকে থাকেন এবং হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেন।
ইরানের শাসনব্যবস্থা পতন প্রাপ্য—এ কথা সত্য। কিন্তু যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া হামলা করলে আরও বেসামরিক হত্যাকাণ্ডের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
আর যদি শাসনব্যবস্থা ভেঙেও পড়ে, ফলাফল আমাদের পক্ষে নাও যেতে পারে। ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—গৃহযুদ্ধ বিশৃঙ্খলা, চরমপন্থা, সন্ত্রাসবাদ ও উদ্বাস্তু সংকট সৃষ্টি করে।
জনসম্মতি ও দায়িত্ব
একটি প্রকৃত সংসদীয় বিতর্ক হলে জনগণকে সম্ভাব্য হতাহতের সংখ্যা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় সম্পর্কে প্রস্তুত করা যেত। কিন্তু ট্রাম্প তার সংক্ষিপ্ত ভাষণে শুধু বলেছেন, “সাহসী আমেরিকানদের প্রাণহানি হতে পারে, এটাই যুদ্ধের বাস্তবতা।”
কিন্তু ঝুঁকি এর চেয়ে অনেক বড়। জনগণ আরও বিশদ ব্যাখ্যা পাওয়ার অধিকার রাখে।
ইরানে হামলার পক্ষে যুক্তি
আমার সহকর্মী ব্রেট স্টিফেন্স যুক্তি দিয়েছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ও আগ্রাসী। ১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকট থেকে শুরু করে বহু সরাসরি ও পরোক্ষ হামলায় তারা জড়িত।
১৯৮৩ সালে লেবাননে মার্কিন মেরিন ব্যারাকে বোমা হামলায় ২৪১ জন আমেরিকান নিহত হন। ১৯৯৬ সালে সৌদি আরবে খোবার টাওয়ার্স হামলায় ১৯ জন নিহত হন। ইরাক যুদ্ধে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা শত শত মার্কিন সেনাকে হত্যা করে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের সমর্থন এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানে ড্রোন সরবরাহ—এসবই ইরানকে বিশ্বে অস্থিতিশীল শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে।
দেশের ভেতরে তারা ভিন্নমত দমন করে, নারীদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয় এবং প্রতিবাদ দমন করতে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে।
পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ পাওয়া উচিত নয়—এমন দেশের তালিকায় ইরান শীর্ষে থাকবে। তাই তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানো যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ।
হামলার বিপক্ষে যুক্তি
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সতর্ক করেছেন—এই অভিযানে বড় ধরনের প্রাণহানি হতে পারে এবং নির্ভুল অস্ত্রের মজুত কমে যেতে পারে। এমন সময়ে, যখন তাইওয়ান ঘিরে সম্ভাব্য চীনা পদক্ষেপ ঠেকাতে এসব অস্ত্র প্রয়োজন হতে পারে।
ইরান এখন হয়তো আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে তারা ইতিমধ্যে হামলা চালিয়েছে। এখনই ধরে নেওয়া যাবে না যে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের বড় ক্ষতি করতে পারবে না।
যদি প্রাণহানি ঘটে, অথচ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস না হয়, শাসনব্যবস্থা বদল না হয় এবং বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত না হয়—তবে এই যুদ্ধ অর্থহীন ও প্রাণঘাতী প্রমাণিত হবে।
কংগ্রেসের ভূমিকা ও ঐতিহাসিক উদাহরণ
২০০২ সালে বিচার বিভাগ প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে জানিয়েছিল যে, কংগ্রেসের নতুন অনুমোদন ছাড়াও ইরাকে শক্তি প্রয়োগের সাংবিধানিক ক্ষমতা তার আছে। তবু বুশ কংগ্রেসের অনুমোদন চেয়েছিলেন এবং পেয়েছিলেন। তার পিতা উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও একই কাজ করেছিলেন।
যখন ইরাকে মার্কিন সেনারা যুদ্ধে গিয়েছিল, তারা জানত যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ও উভয় দলের রাজনীতিবিদরা তাদের সমর্থন করেছেন।
আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। কোনো জাতীয় ঐকমত্য নেই। এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও নয়। আছে কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এমন একজন, যিনি এমনকি একটি নিবন্ধও পুনঃপ্রকাশ করেছেন যেখানে দাবি করা হয়েছে—ইরান ২০২০ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছিল এবং এখন নতুন যুদ্ধে জড়িয়েছে।
রাজতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিপদ
১৮৪৮ সালে মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধের শেষে কংগ্রেসম্যান আব্রাহাম লিংকন লিখেছিলেন, রাজারা প্রায়ই জনগণের মঙ্গলের অজুহাতে যুদ্ধ চাপিয়ে দেন, যা জনগণকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। তাই সংবিধান এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনো এক ব্যক্তি এককভাবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে না পারেন।
তখন যেমন সত্য ছিল, এখনো তেমনই সত্য। ট্রাম্প রাজা নন। কিন্তু একক সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে নিয়ে গিয়ে তিনি ঠিক রাজাদের মতো আচরণ করেছেন।
ডেভিড ফ্রেঞ্চ 

















