মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মাঝেও দুবাই দীর্ঘদিন ধরে ছিল নিরাপদ ও বিলাসবহুল আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। ইরানি ব্যবসায়ী, মার্কিন তারকা ও রুশ ধনকুবেরদের জন্য শহরটি ছিল নিশ্চিন্ত ঠিকানা। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরানি হামলা সেই ধারণায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান পারস্য উপসাগরীয় কয়েকটি ধনী রাষ্ট্রে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। এই দেশগুলোতেই রয়েছে একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা সরাসরি ছড়িয়ে পড়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে।
দুবাইয়ে অগ্নিকাণ্ড ও আতঙ্ক
রোববার দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরে হামলার পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠতে দেখা যায়। পাঁচতারকা হোটেলে আগুন লাগে, আবাসিক টাওয়ারের জানালা কেঁপে ওঠে বিস্ফোরণে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এতে অন্তত সাতজন আহত হন। রাতের আকাশে আগুনের গোলা ছুটে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রবাসী শ্রমিক ও প্রভাবশালীরা আতঙ্কিত মুহূর্তের দৃশ্য ধারণ করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটিকে লক্ষ্য করে ২০০-র বেশি ড্রোন ও ১৩৭টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। অধিকাংশই প্রতিহত করা সম্ভব হলেও ১৪টি ড্রোন আমিরাতের ভূখণ্ড ও জলসীমায় আঘাত হানে। আকাশেই ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ শহরের বিভিন্ন স্থানে পড়ে অতিরিক্ত ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা ঘটে।
নিরাপত্তার ভাবমূর্তিতে আঘাত
ইউরোপীয় পররাষ্ট্র সম্পর্ক কাউন্সিলের গবেষক সিনজিয়া বিয়াঙ্কো বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল তাদের নিরাপত্তার ভাবমূর্তি। তারা সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের স্থিতিশীল ও নিরপেক্ষ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল। এই হামলা সেই কৌশলকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে।
দুবাই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। তবু এই সম্পর্ক হামলা থেকে দেশটিকে রক্ষা করতে পারেনি। শুধু আমিরাত নয়, উপসাগরীয় কোনো দেশই হামলা এড়াতে পারেনি।
ওমানেও হামলা
ওমান, যেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছিল, সেখানেও হামলা হয়েছে। আরব সাগর উপকূলের দুকম বন্দরের আবাসিক এলাকায় একটি ড্রোন আঘাত হানে। এতে একজন বিদেশি শ্রমিক আহত হন বলে ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়।
প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর প্রভাব
উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক বসবাস করেন। হামলার ঘটনায় তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কুয়েতে একটি ড্রোন বিমানবন্দরে আঘাত হানলে নয়জন শ্রমিক আহত হন। আবুধাবির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধ্বংস হওয়া ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন এশীয় নাগরিক নিহত ও সাতজন আহত হন।
আবুধাবির ইতিহাদ টাওয়ারস কমপ্লেক্সের সামনেও একটি ড্রোনের অংশ আঘাত হানে। ওই কমপ্লেক্সে ইসরায়েলি দূতাবাস অবস্থিত। এতে এক নারী ও তার সন্তান সামান্য আহত হন।
কাতার ও বাহরাইনে ক্ষয়ক্ষতি
কাতারে অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন বলে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশজুড়ে নিক্ষিপ্ত ১৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। কাতারে একটি বড় মার্কিন বিমানঘাঁটি রয়েছে।
বাহরাইন, যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি আছে, সেখানে ৪৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৯টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে সরকার। রাজধানী মানামার কয়েকটি আবাসিক ভবন লক্ষ্যবস্তু ছিল বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়। অন্তত চারজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতার শঙ্কা
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উপসাগরীয় সরকারগুলো প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ এড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছিল। তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো নির্ভর করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর। নিরাপদ বিনিয়োগ ও পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তাদের বড় শক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা সেই নিরাপদ আশ্রয়ের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই সংঘাত কতদূর গড়াবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কত দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে পারবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















