নতুন বছরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জানুয়ারি মাসে উৎপাদক পর্যায়ে পণ্য ও সেবার দাম প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হারে বেড়েছে। বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি বাদে অন্যান্য পণ্যের দাম সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি শুল্কের বাড়তি চাপ এবং ব্যবসায়ীদের মুনাফা মার্জিন বৃদ্ধি—এই দুই কারণ মিলেই বাজারে নতুন করে মূল্যচাপ তৈরি করেছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শিগগির সুদের হার কমাবে—এমন সম্ভাবনা এখন অনেকটাই ক্ষীণ।
উৎপাদক মূল্যসূচকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বৃদ্ধি
শ্রম দপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, চূড়ান্ত চাহিদার জন্য উৎপাদক মূল্যসূচক জানুয়ারিতে ০.৫ শতাংশ বেড়েছে। ডিসেম্বর মাসে সংশোধিত হিসাবে এই বৃদ্ধি ছিল ০.৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা জানুয়ারিতে ০.৩ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে তার চেয়ে বেশি বৃদ্ধি হয়েছে।
বার্ষিক হিসাবে জানুয়ারি পর্যন্ত গত ১২ মাসে উৎপাদক মূল্যসূচক বেড়েছে ২.৯ শতাংশ। ডিসেম্বর মাসে এই হার ছিল ৩ শতাংশ। আগের বছরের তুলনামূলক উচ্চ ভিত্তি হিসাব থেকে বাদ পড়ায় বার্ষিক বৃদ্ধির হার সামান্য কমেছে।
খাদ্য ও জ্বালানি বাদে মূল উৎপাদক মূল্যসূচক জানুয়ারিতে ০.৮ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২২ সালের মাঝামাঝির পর সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি। ডিসেম্বর মাসে এই বৃদ্ধি ছিল ০.৬ শতাংশ। বার্ষিক হিসাবে মূল উৎপাদক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৩.৬ শতাংশে।
সেবা খাতে দামের চাপ বেশি
জানুয়ারি মাসে সেবা খাতে মূল্য ০.৮ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যে মুনাফার মার্জিন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে পেশাগত ও বাণিজ্যিক সরঞ্জামের পাইকারি বিক্রিতে মার্জিন ১৪.৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসায়ীরা আমদানি শুল্কের অতিরিক্ত ব্যয় ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।
রাসায়নিক পণ্য, টেলিযোগাযোগ সেবা, স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যপণ্য এবং খাদ্য ও পানীয় খাতেও মূল্য বেড়েছে। পরিবহন ও গুদামজাত সেবার দামও ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিমান ভাড়া জানুয়ারিতে ২.৬ শতাংশ বেড়েছে। পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনা ফি বেড়েছে ১.৫ শতাংশ। চিকিৎসকদের সেবার খরচ ০.৮ শতাংশ বেড়েছে। তবে হাসপাতালের বহির্বিভাগের খরচ ০.৯ শতাংশ কমেছে এবং অন্তর্বিভাগের খরচ ০.২ শতাংশ বেড়েছে। হোটেল ও মোটেল কক্ষের পাইকারি ভাড়া ৪.১ শতাংশ কমেছে।
পণ্যমূল্যে মিশ্র প্রবণতা
উৎপাদক পর্যায়ে সামগ্রিক পণ্যমূল্য জানুয়ারিতে ০.৩ শতাংশ কমেছে। জ্বালানির দাম ২.৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং পেট্রোলের মূল্য ৫.৫ শতাংশ কমেছে। পাইকারি খাদ্যদ্রব্যের দাম ১.৫ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে তাজা ফল ও তরমুজজাত পণ্যের দাম ১০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।
ডিমের দাম ৬৩.৯ শতাংশ কমে গেছে, যা বড় ধরনের পতন। তবে গরু ও বাছুরের মাংসের দাম ১.১ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে মূলধনী যন্ত্রপাতির পাইকারি মূল্য ০.৬ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের কারণে এই চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি খাতে কেনা মূলধনী যন্ত্রপাতির ব্যয় ২.৬ শতাংশ বেড়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বৃদ্ধির সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
মূল ভোক্তা মূল্যসূচকেও চাপ
খাদ্য ও জ্বালানি বাদে ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় সূচক, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা পরিমাপে গুরুত্বপূর্ণ, জানুয়ারিতে মাসিক হিসাবে প্রায় ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডিসেম্বর মাসে এই হার ছিল ০.৪ শতাংশ, যা ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল।
বার্ষিক হিসাবে এই সূচক ৩.১ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে, যা প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সুদের হার নিয়ে কী ভাবছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদক পর্যায়ে এই মূল্যবৃদ্ধি আগামী মাসগুলোতে ভোক্তা পর্যায়েও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ ব্যবসায়ীরা সেবা ও পণ্যের বাড়তি খরচ ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেন। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাজার এখনও স্থিতিশীল রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মার্চ মাসের বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, জুন মাসের মাঝামাঝি বৈঠকের আগে সুদ কমানোর সম্ভাবনা খুবই কম।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর শেয়ারবাজারে কিছুটা পতন দেখা গেছে। ডলারের মান সামান্য কমেছে এবং সরকারি বন্ডের ফলনও নিম্নমুখী হয়েছে।
সব মিলিয়ে জানুয়ারি মাসের তথ্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফলে সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত আরও কিছুটা সময়ের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















