নতুন বছরের শুরুতে শরীরচর্চার প্রতিজ্ঞা অনেকেরই থাকে। কিন্তু আজকের দিনে শুধু ফিট থাকার স্বপ্ন আর নিজের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি অনেকের জন্য যথেষ্ট নয়। জিমে নিয়মিত হাজিরা, ঘাম ঝরানো ক্লাস আর মাসের পর মাস ধরে চালিয়ে যাওয়ার পর মানুষ চায় স্বীকৃতি। একটি ছোট্ট অভিনন্দন, একটি ছবি, কিংবা একটি সাইনবোর্ড—এই সামান্য বিষয়গুলোই অনেকের কাছে হয়ে উঠছে অনুপ্রেরণার বড় উৎস।
মাইলফলক ভুলে গেলে যে কষ্টটা লাগে
নিউ জার্সির ওয়েস্ট অরেঞ্জে থাকা নাইশা রেস্ত্রেপো আট মাস ধরে নিয়মিত ব্যালে ধাঁচের এক ধরনের শরীরচর্চার ক্লাসে যেতেন। মাসে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে প্রায় প্রতিদিন হাজিরা দিয়ে তিনি কমিয়েছেন প্রায় চল্লিশ পাউন্ড ওজন। নিজের শততম ক্লাসের দিনে তিনি খুব বড় কিছু আশা করেননি। শুধু একটি অভিনন্দন, হয়তো একটি ছবি। কিন্তু ক্লাসে ঢুকে দেখলেন, কেউ কিছুই বলছে না। দিনটি যেন হঠাৎ করেই গুরুত্বহীন হয়ে গেল।
ক্লাস শেষে তিনি প্রশিক্ষককে বিষয়টি জানান। ক্ষমা চাওয়া হলো, একটি ছবি তোলা হলো, আগের সদস্যদের মতোই মাইলফলকের সাইন হাতে। কিন্তু সারাদিন অপেক্ষা করেও সেই ছবি আর প্রকাশ পেল না। এই অভিজ্ঞতার কথা তিনি পরে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন। সেখানে তিনি বলেন, নিজের জন্য অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যের স্বীকৃতিও তার কাছে সমান প্রয়োজনীয়।
স্বীকৃতির যুগে শরীরচর্চা
আজকের ফিটনেস সংস্কৃতি শুধু ঘাম আর কষ্টের গল্প নয়, এটি দৃশ্যমান স্বীকৃতির গল্পও। শরীরচর্চার ক্লাসগুলো এখন হয়ে উঠেছে পরিচয় আর শৃঙ্খলার প্রতীক। নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্লাস পূর্ণ করলে সাইনবোর্ড, হাতে লেখা নোট, বিশেষ পোশাক কিংবা ছোট উপহার দেওয়া হচ্ছে। কেউ দশ ক্লাস শেষ করলেই পাচ্ছে বিশেষ মোজা, কেউ শততম ক্লাসে সই করছে ব্যারে বা দেয়ালে। এই সংস্কৃতি ধীরে ধীরে গড়ে তুলছে একটি প্রকাশ্য উদযাপনের অভ্যাস।
যখন সেই স্বীকৃতি মেলে না, তখন কষ্টটা অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে গভীর হয়। সামাজিক মাধ্যমে এমন অনেক ভিডিও দেখা যায়, যেখানে মানুষ তাদের নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্লাসের জন্য কাউন্টডাউন করে, প্রিয় প্রশিক্ষকের ক্লাস বুক করে, আর শেষে স্বীকৃতি না পেয়ে গাড়িতে বসে কাঁদে বা জিম ছাড়ার কথা ভাবে।
কেন এই স্বীকৃতি এত জরুরি
অনেকের কাছে এটি শিশুতোষ মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, বিশেষ করে নারীদের জন্য এই দেখা পাওয়ার অনুভূতিটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সমাজে তাদের শ্রম ও পরিশ্রম খুব কমই প্রকাশ্যে স্বীকৃতি পেয়েছে। মা হিসেবে, কর্মজীবী হিসেবে, কিংবা পরিবার সামলানোর দায়িত্বে তারা অনেক সময় নিজেকে অদৃশ্য মনে করেন। তাই যখন কেউ নিজের জন্য কিছু করেন, তখন সেটির স্বীকৃতি মনকে শক্তি দেয়।

নাইশা রেস্ত্রেপো বলেন, এত টাকা খরচ করে নিয়মিত ক্লাসে গিয়ে যদি শেষ পর্যন্ত অদৃশ্যই থেকে যেতে হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে—এই পরিশ্রমের মূল্য কোথায়। তার মতে, নিজের জন্য কিছু করলে সেটি কেউ লক্ষ করলেই ভালো লাগে।
কমিউনিটির টানেই ফিরে আসা
ওয়াশিংটনের আলানা কাসিনডর্ফ চাকরি হারানোর পরও তার ব্যয়বহুল শরীরচর্চার সদস্যপদ ধরে রেখেছেন। তার ভাষায়, এটি তাকে ঘর থেকে বের হতে সাহায্য করেছে, মানসিকভাবে সুস্থ রেখেছে। তার পাঁচশতম ক্লাসের দিনে স্টুডিওতে হাতে লেখা নোট আর সাজানো বোর্ড তাকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। সেই মুহূর্তের ছবি তিনি পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেন।
একই এলাকায় টিফানি ফেরেটের জন্য পাঁচশতম ক্লাস ছিল বন্ধুবান্ধবের ছোট্ট জমায়েতের মতো। তিনি বলেন, শক্তি বাড়ানোর জন্য এসেছিলেন, কিন্তু থেকে গেছেন মানুষের জন্য, এই কমিউনিটির জন্য।
ব্যবসাও বুঝে গেছে আবেগের শক্তি
জিমগুলোও দ্রুত বুঝে গেছে এই মানসিক চাহিদার মূল্য। অনেক স্টুডিওতে এখন সফটওয়্যারই জানিয়ে দেয় কে কখন মাইলফলকের কাছাকাছি। উপহার, ফুল, হাতে লেখা কার্ড—সবই এখন মাসিক খরচের অংশ। উদ্যোক্তারা বলেন, এটি খুব ব্যক্তিগত বিষয়। কে কোন রঙ পছন্দ করে, সেটিও মাথায় রাখা হয়।

তবে এর উল্টো দিকও আছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই সবকিছু মানুষের মস্তিষ্কে এক ধরনের চাপ তৈরি করছে। নিয়মিত হাজিরা না থাকলে যেন কিছু ভেঙে যাবে—এমন ভয় কাজ করে। কেউ কেউ স্বীকার করেন, এটি এক ধরনের মজার আসক্তির মতো হয়ে উঠেছে।
স্বীকৃতি না পেলে আত্মসম্মানে আঘাত
কিছু মানুষের জন্য মাইলফলক উপেক্ষা করা মানে নিজের মূল্য নিয়ে সন্দেহে পড়া। যেখানে প্রশিক্ষকেরা নাম ধরে ডাকেন, সেখানে হঠাৎ করে একদিনের নীরবতা মনে করিয়ে দেয়, আপনি হয়তো ততটা গুরুত্বপূর্ণ নন। এই অনুভূতি নাটকীয় শোনালেও অনেকের কাছে খুব বাস্তব।
সবাই যে চায়, তা নয়
তবে সবাই এই আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে চায় না। কেউ কেউ ক্লাস শেষে চুপচাপ বাড়ি ফিরতে চান। তাদের কাছে অতিরিক্ত মনোযোগ বরং অস্বস্তির। এমন সদস্যও আছেন, যারা মনে মনে চান, তাদের মাইলফলকটি কেউ ভুলেই যাক।

শেষ কথা
আজকের ফিটনেস সংস্কৃতি কেবল শরীর গড়ার গল্প নয়, এটি স্বীকৃতি, সম্পর্ক আর অন্তর্ভুক্তির গল্পও। কেউ আসে শক্তি বাড়াতে, কেউ আসে মন ভালো রাখতে। আর সেই পথে একটি ছোট্ট অভিনন্দন কারও কাছে হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় প্রেরণা।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















