মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া সাক্ষ্য দেবেন বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। গুম ও হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এই মামলাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।
বৃহস্পতিবার ৮ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, জিয়াউল আহসানের কর্মকাণ্ড ও ভূমিকা নিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার সাক্ষ্য মামলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে প্রসিকিউশন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগের পরিসর

জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক মানুষকে গুম ও হত্যার অভিযোগে তিনটি পৃথক অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ১৭ ডিসেম্বর এসব অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হয়। এই মামলায় জিয়াউল আহসানই একমাত্র আসামি। অভিযোগ গঠন করা হবে কি না, সে বিষয়ে আগামী ১৪ জানুয়ারি আদেশ দেবেন ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১-এ জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আসামিপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনের দিন ধার্য ছিল বৃহস্পতিবার। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
আসামিপক্ষের অব্যাহতির আবেদনের পর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম আদালতে বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার দেওয়া সাক্ষ্যের বিভিন্ন অংশ তুলে ধরে জিয়াউল আহসানের ভূমিকা নিয়ে প্রসিকিউশনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।

সাক্ষ্য প্রসঙ্গে প্রসিকিউশনের বক্তব্য
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী বলেন, সাবেক সেনাপ্রধান যখন আদালতে সশরীরে সাক্ষ্য দেবেন, তখনই বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হবে। তিনি জানান, আসামিপক্ষ জিয়াউল আহসানকে একজন পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করলেও প্রসিকিউশন আদালতে দেখিয়েছে যে সে সময় বাহিনীর প্রধান হিসেবে ইকবাল করিম ভূঁইয়ার দৃষ্টিতে জিয়াউল আহসানের অবস্থান কী ছিল।
তিনি আরও বলেন, আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাঠ করে শোনানোর মাধ্যমে সেই মনোভাবের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে সাবেক সেনাপ্রধান তাঁর সাক্ষ্যে কী বলেছেন, তা তিনি নিজেই আদালতে উপস্থিত হয়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবেন।

তিনটি অভিযোগের বিবরণ
প্রসিকিউশনের আনা প্রথম অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইল এলাকায় সড়কের পাশে জিয়াউল আহসানের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিনজনকে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালসংলগ্ন বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল ও মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগেও ৫০ জন হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, একই সময়ে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলা এলাকায় সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে তথাকথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে মাসুদসহ আরও ৫০ জনকে হত্যা করা হয়।

গ্রেপ্তার ও বর্তমান অবস্থা
এইসব হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ২৩ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১। এর আগে ১৭ ডিসেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল এবং একই দিনে প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে ২০২৪ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের আগে তিনি ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















