১২:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
ভোলায় ভুল রক্ত দেওয়ার অভিযোগে তরুণীর মৃত্যু ইরানে রক্তাক্ত দমন-পীড়ন, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর জবাবের ইঙ্গিত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করলেই যুক্তরাষ্ট্রে পঁচিশ শতাংশ শুল্ক, চূড়ান্ত ঘোষণা ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিত ট্রাম্পের এশিয়ায় মার্কিন বিমানবাহী জাহাজ ঘাটতির আশঙ্কা, ইরান সংকটে নতুন উদ্বেগ নির্বাচনের অজুহাতে সব ভোট স্থগিত, ক্ষোভে ফুঁসছে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ইনকিলাব মঞ্চের নাম ব্যবহার করে প্রতারণা, জনসাধারণকে সতর্কবার্তা জবি শিবির ইউনিটের সভাপতি রিয়াজুল, সম্পাদক আলিম কদমতলীতে নির্মাণাধীন ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু বাংলাদেশে সোনার দামে নতুন রেকর্ড, ভরিতে এক লাফে ৪ হাজার ১৯৯ টাকা বৃদ্ধি

শীত ২০২৬: রোগের ধরণ বদলের এক বাস্তব চিত্র

২০২৬ সালের শীত বাংলাদেশে শুধু তাপমাত্রা হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এই শীত মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির চিত্রকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। নভেম্বরের শেষ দিক থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে শীতজনিত রোগের প্রকোপ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী এই শীতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। শীতের সঙ্গে ঘন কুয়াশা, শুষ্ক বাতাস, অপর্যাপ্ত পুষ্টি এবং পর্যাপ্ত উষ্ণতার অভাব—এই সবকিছু মিলিয়ে ২০২৬ সালের শীতকে স্বাস্থ্যঝুঁকির দিক থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়।

সময়ক্রমে শীতকালীন রোগের বিস্তার

শীতের শুরু: নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের প্রথম ভাগ

শীতের শুরুতেই প্রথম যে পরিবর্তনটি চোখে পড়ে, তা হলো সাধারণ সর্দি-কাশি ও জ্বরের প্রকোপ। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকেই দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে রাতের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যেতে থাকে। এই সময় শিশুদের মধ্যে নাক দিয়ে পানি পড়া, হালকা জ্বর, কাশি ও গলার খুসখুসে ব্যথার মতো উপসর্গ বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ এটিকে সাধারণ ঠান্ডা ভেবে অবহেলা করে, কিন্তু এই পর্যায়েই শ্বাসনালীর সংক্রমণ শুরু হয়ে যায়, যা পরবর্তী সময়ে জটিল রূপ নিতে পারে।

এই সময়ে শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় শ্বাসকষ্ট, বুক ধরা ভাব ও হাঁপানির সমস্যা বাড়তে থাকে। গ্রামাঞ্চলে আবার পর্যাপ্ত উষ্ণ পোশাকের অভাবে শিশু ও বৃদ্ধদের শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সমস্যা দেখা দেয়।

সর্দি-কাশির সমস্যায় উপকারী যেসব ঘরোয়া খাবার | undefined

শীতের মধ্যভাগ: ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির প্রথম ভাগ

ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে শীত যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন রোগের ধরনও বদলে যায়। সাধারণ সর্দি-কাশি ধীরে ধীরে নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস এবং তীব্র শ্বাসকষ্টে রূপ নিতে শুরু করে। এই সময় হাসপাতালে শিশু ও বয়স্ক রোগীর ভিড় লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে যায়।

নিউমোনিয়া এই পর্যায়ের সবচেয়ে ভয়াবহ রোগ হিসেবে দেখা দেয়। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ষাটোর্ধ্ব মানুষ এই রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। শীতের তীব্রতা, কুয়াশা এবং ঠান্ডা বাতাস শ্বাসনালীর স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সহজেই সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

একই সময়ে ডায়রিয়া ও বমিজনিত রোগের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। শীতকালে মানুষ কম পানি পান করে, অনেক সময় উষ্ণ পানি ব্যবহারের অভাবে পানি বিশুদ্ধকরণে ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে অন্ত্রজনিত সংক্রমণ বাড়ে।

শীতের চূড়ান্ত পর্যায়: জানুয়ারির মাঝামাঝি

জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়কে ২০২৬ সালের শীতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই সময় শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকে। উত্তরাঞ্চলে ভোরের দিকে তাপমাত্রা অনেক জায়গায় এক অঙ্কের ঘরে নেমে আসে। এই সময় হাইপোথার্মিয়া বা শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার ঘটনা বাড়ে, বিশেষ করে গৃহহীন ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে।

এই পর্যায়ে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতাও বেড়ে যায়। ঠান্ডার কারণে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, ফলে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রেই শীতজনিত এই জটিলতাগুলো নীরবে ঘটে, উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই বিপদজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়।

District map bangladesh Vector Images & Graphics for Commercial Use |  VectorStock

অঞ্চলভিত্তিক প্রাদুর্ভাবের চিত্র

উত্তরাঞ্চল: সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা

রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও পঞ্চগড়—এই জেলাগুলো ২০২৬ সালের শীতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানে শীত আগে আসে এবং দীর্ঘ সময় ধরে থাকে। শৈত্যপ্রবাহের সময় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং হাইপোথার্মিয়ার প্রকোপ বেশি দেখা গেছে। শিশুদের মধ্যে শ্বাসনালীর সংক্রমণ এবং অপুষ্টির প্রভাবও স্পষ্ট ছিল।

পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল

রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং যশোর অঞ্চলে শীত তুলনামূলক শুষ্ক। এই শুষ্কতা শ্বাসনালীর সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। হাঁপানি, ব্রংকাইটিস ও দীর্ঘমেয়াদি কাশির রোগী এই অঞ্চলে বেশি দেখা গেছে। কৃষিশ্রমিকরা ভোরে মাঠে কাজ করতে গিয়ে ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায় ভুগেছেন।

মধ্যাঞ্চল ও ঢাকা মহানগর

ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় শীতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বায়ুদূষণ। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, এলার্জি, চোখ জ্বালা ও গলা ব্যথার মতো সমস্যা বেড়েছে। শিশুদের মধ্যে ভাইরাল জ্বর ও নিউমোনিয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকায় বসবাসকারীরা এই শীতে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছে।

দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকা

দক্ষিণাঞ্চলে শীত তুলনামূলক কম হলেও আর্দ্রতা বেশি থাকায় সর্দি-কাশি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এখানে ডায়রিয়া ও ত্বকের সংক্রমণও লক্ষ্য করা গেছে। উপকূলীয় এলাকায় বয়স্কদের মধ্যে বাতজনিত ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট বেড়েছে।

শীতের রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায় | The Daily Campus

প্রধান শীতকালীন রোগ সমূহের বিশদ আলোচনা

শ্বাসনালীর সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া

২০২৬ সালের শীতে শ্বাসনালীর সংক্রমণ ছিল সবচেয়ে বেশি দেখা দেওয়া রোগ। হালকা কাশি থেকে শুরু করে গুরুতর নিউমোনিয়া পর্যন্ত এই সংক্রমণ বিস্তৃত ছিল। শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত শ্বাস নেওয়া, বুক দেবে যাওয়া এবং জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা গেছে।

হাঁপানি ও ব্রঙ্কাইটিস

যাদের আগে থেকেই হাঁপানি ছিল, তাদের জন্য এই শীত ছিল সবচেয়ে কষ্টকর। ঠান্ডা বাতাস ও কুয়াশা শ্বাসনালীর সংকোচন বাড়িয়ে দেয়, ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত ওষুধ না নেওয়ার কারণে সমস্যা আরও জটিল হয়েছে।

ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগ

শীতকালে ডায়রিয়া অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত হলেও ২০২৬ সালে এটি একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কম পানি পান করা, অপর্যাপ্ত হাত ধোয়া এবং বিশুদ্ধ পানির অভাব এই রোগ বাড়িয়েছে। শিশু ও বয়স্করা এতে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।

রোজায় হৃদরোগীর রক্তচাপ কমে গেলে কী করবেন?

হৃদরোগ ও রক্তচাপ জনিত জটিলতা

শীতের সময় রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। যারা নিয়মিত ওষুধ নেন না বা শীতকালে চিকিৎসা অবহেলা করেন, তাদের মধ্যে স্ট্রোক ও হার্টের সমস্যা বেড়েছে।

প্রতিরোধের মূল কৌশল

শীতকালীন রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগাম প্রস্তুতি। পর্যাপ্ত উষ্ণ পোশাক পরা, বিশেষ করে সকালে ও রাতে শরীর ঢেকে রাখা অত্যন্ত জরুরি। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে মাথা, বুক ও পা ঢেকে রাখা উচিত।

পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার শীতকালীন রোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখে। গরম খাবার, পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি ও ফলমূল শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। শীতকালে অনেকেই পানি কম পান করেন, কিন্তু এটি একটি বড় ভুল। নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি পান ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে প্রতিকার

শীতের শুরুতেই সর্দি-কাশি বা জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টের সামান্য লক্ষণ দেখলেই দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। হাঁপানি রোগীদের নিয়মিত ইনহেলার ব্যবহার এবং ঠান্ডা বাতাস এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।

Daily Manobkantha:: কেমন আছেন শীতার্ত মানুষ!: Daily Manobkantha

ঘরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং রান্নার খাবার ভালোভাবে গরম করে খাওয়া সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে। রাতে ঘুমানোর সময় পর্যাপ্ত কম্বল ব্যবহার শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখে।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে করণীয়

শীতকালে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য উষ্ণ পোশাক বিতরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও গৃহহীন মানুষের জন্য কম্বল ও শীতবস্ত্র নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে শীতকালীন রোগের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ, অক্সিজেন ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা জরুরি।

জনসচেতনতা বাড়াতে শীতকালীন রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধ বিষয়ে নিয়মিত প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। স্কুল, মসজিদ ও স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারগুলো এই প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৬ সালের শীত বাংলাদেশে শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি বড় অধ্যায় হয়ে উঠেছে। শীতকালীন রোগের ধরন, বিস্তার এবং প্রভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শীতকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, সচেতনতা এবং সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই রোগগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে। শীত আসবে, কিন্তু প্রস্তুতি থাকলে শীতের রোগ ভয় হয়ে উঠবে না—এই শিক্ষাই ২০২৬ সালের শীত আমাদের দিয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভোলায় ভুল রক্ত দেওয়ার অভিযোগে তরুণীর মৃত্যু

শীত ২০২৬: রোগের ধরণ বদলের এক বাস্তব চিত্র

১০:৫৬:০১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

২০২৬ সালের শীত বাংলাদেশে শুধু তাপমাত্রা হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এই শীত মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির চিত্রকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। নভেম্বরের শেষ দিক থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে শীতজনিত রোগের প্রকোপ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী এই শীতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। শীতের সঙ্গে ঘন কুয়াশা, শুষ্ক বাতাস, অপর্যাপ্ত পুষ্টি এবং পর্যাপ্ত উষ্ণতার অভাব—এই সবকিছু মিলিয়ে ২০২৬ সালের শীতকে স্বাস্থ্যঝুঁকির দিক থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়।

সময়ক্রমে শীতকালীন রোগের বিস্তার

শীতের শুরু: নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের প্রথম ভাগ

শীতের শুরুতেই প্রথম যে পরিবর্তনটি চোখে পড়ে, তা হলো সাধারণ সর্দি-কাশি ও জ্বরের প্রকোপ। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকেই দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে রাতের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যেতে থাকে। এই সময় শিশুদের মধ্যে নাক দিয়ে পানি পড়া, হালকা জ্বর, কাশি ও গলার খুসখুসে ব্যথার মতো উপসর্গ বেশি দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ এটিকে সাধারণ ঠান্ডা ভেবে অবহেলা করে, কিন্তু এই পর্যায়েই শ্বাসনালীর সংক্রমণ শুরু হয়ে যায়, যা পরবর্তী সময়ে জটিল রূপ নিতে পারে।

এই সময়ে শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় শ্বাসকষ্ট, বুক ধরা ভাব ও হাঁপানির সমস্যা বাড়তে থাকে। গ্রামাঞ্চলে আবার পর্যাপ্ত উষ্ণ পোশাকের অভাবে শিশু ও বৃদ্ধদের শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সমস্যা দেখা দেয়।

সর্দি-কাশির সমস্যায় উপকারী যেসব ঘরোয়া খাবার | undefined

শীতের মধ্যভাগ: ডিসেম্বরের শেষ থেকে জানুয়ারির প্রথম ভাগ

ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে শীত যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন রোগের ধরনও বদলে যায়। সাধারণ সর্দি-কাশি ধীরে ধীরে নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস এবং তীব্র শ্বাসকষ্টে রূপ নিতে শুরু করে। এই সময় হাসপাতালে শিশু ও বয়স্ক রোগীর ভিড় লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে যায়।

নিউমোনিয়া এই পর্যায়ের সবচেয়ে ভয়াবহ রোগ হিসেবে দেখা দেয়। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ষাটোর্ধ্ব মানুষ এই রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। শীতের তীব্রতা, কুয়াশা এবং ঠান্ডা বাতাস শ্বাসনালীর স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সহজেই সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

একই সময়ে ডায়রিয়া ও বমিজনিত রোগের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। শীতকালে মানুষ কম পানি পান করে, অনেক সময় উষ্ণ পানি ব্যবহারের অভাবে পানি বিশুদ্ধকরণে ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে অন্ত্রজনিত সংক্রমণ বাড়ে।

শীতের চূড়ান্ত পর্যায়: জানুয়ারির মাঝামাঝি

জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়কে ২০২৬ সালের শীতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই সময় শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকে। উত্তরাঞ্চলে ভোরের দিকে তাপমাত্রা অনেক জায়গায় এক অঙ্কের ঘরে নেমে আসে। এই সময় হাইপোথার্মিয়া বা শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার ঘটনা বাড়ে, বিশেষ করে গৃহহীন ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে।

এই পর্যায়ে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতাও বেড়ে যায়। ঠান্ডার কারণে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, ফলে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রেই শীতজনিত এই জটিলতাগুলো নীরবে ঘটে, উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই বিপদজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়।

District map bangladesh Vector Images & Graphics for Commercial Use |  VectorStock

অঞ্চলভিত্তিক প্রাদুর্ভাবের চিত্র

উত্তরাঞ্চল: সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা

রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও পঞ্চগড়—এই জেলাগুলো ২০২৬ সালের শীতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানে শীত আগে আসে এবং দীর্ঘ সময় ধরে থাকে। শৈত্যপ্রবাহের সময় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং হাইপোথার্মিয়ার প্রকোপ বেশি দেখা গেছে। শিশুদের মধ্যে শ্বাসনালীর সংক্রমণ এবং অপুষ্টির প্রভাবও স্পষ্ট ছিল।

পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল

রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং যশোর অঞ্চলে শীত তুলনামূলক শুষ্ক। এই শুষ্কতা শ্বাসনালীর সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। হাঁপানি, ব্রংকাইটিস ও দীর্ঘমেয়াদি কাশির রোগী এই অঞ্চলে বেশি দেখা গেছে। কৃষিশ্রমিকরা ভোরে মাঠে কাজ করতে গিয়ে ঠান্ডাজনিত অসুস্থতায় ভুগেছেন।

মধ্যাঞ্চল ও ঢাকা মহানগর

ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় শীতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বায়ুদূষণ। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, এলার্জি, চোখ জ্বালা ও গলা ব্যথার মতো সমস্যা বেড়েছে। শিশুদের মধ্যে ভাইরাল জ্বর ও নিউমোনিয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকায় বসবাসকারীরা এই শীতে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছে।

দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকা

দক্ষিণাঞ্চলে শীত তুলনামূলক কম হলেও আর্দ্রতা বেশি থাকায় সর্দি-কাশি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এখানে ডায়রিয়া ও ত্বকের সংক্রমণও লক্ষ্য করা গেছে। উপকূলীয় এলাকায় বয়স্কদের মধ্যে বাতজনিত ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট বেড়েছে।

শীতের রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উপায় | The Daily Campus

প্রধান শীতকালীন রোগ সমূহের বিশদ আলোচনা

শ্বাসনালীর সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া

২০২৬ সালের শীতে শ্বাসনালীর সংক্রমণ ছিল সবচেয়ে বেশি দেখা দেওয়া রোগ। হালকা কাশি থেকে শুরু করে গুরুতর নিউমোনিয়া পর্যন্ত এই সংক্রমণ বিস্তৃত ছিল। শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত শ্বাস নেওয়া, বুক দেবে যাওয়া এবং জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা গেছে।

হাঁপানি ও ব্রঙ্কাইটিস

যাদের আগে থেকেই হাঁপানি ছিল, তাদের জন্য এই শীত ছিল সবচেয়ে কষ্টকর। ঠান্ডা বাতাস ও কুয়াশা শ্বাসনালীর সংকোচন বাড়িয়ে দেয়, ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত ওষুধ না নেওয়ার কারণে সমস্যা আরও জটিল হয়েছে।

ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগ

শীতকালে ডায়রিয়া অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত হলেও ২০২৬ সালে এটি একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কম পানি পান করা, অপর্যাপ্ত হাত ধোয়া এবং বিশুদ্ধ পানির অভাব এই রোগ বাড়িয়েছে। শিশু ও বয়স্করা এতে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।

রোজায় হৃদরোগীর রক্তচাপ কমে গেলে কী করবেন?

হৃদরোগ ও রক্তচাপ জনিত জটিলতা

শীতের সময় রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। যারা নিয়মিত ওষুধ নেন না বা শীতকালে চিকিৎসা অবহেলা করেন, তাদের মধ্যে স্ট্রোক ও হার্টের সমস্যা বেড়েছে।

প্রতিরোধের মূল কৌশল

শীতকালীন রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগাম প্রস্তুতি। পর্যাপ্ত উষ্ণ পোশাক পরা, বিশেষ করে সকালে ও রাতে শরীর ঢেকে রাখা অত্যন্ত জরুরি। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে মাথা, বুক ও পা ঢেকে রাখা উচিত।

পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার শীতকালীন রোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখে। গরম খাবার, পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি ও ফলমূল শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। শীতকালে অনেকেই পানি কম পান করেন, কিন্তু এটি একটি বড় ভুল। নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি পান ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক।

ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে প্রতিকার

শীতের শুরুতেই সর্দি-কাশি বা জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টের সামান্য লক্ষণ দেখলেই দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। হাঁপানি রোগীদের নিয়মিত ইনহেলার ব্যবহার এবং ঠান্ডা বাতাস এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।

Daily Manobkantha:: কেমন আছেন শীতার্ত মানুষ!: Daily Manobkantha

ঘরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং রান্নার খাবার ভালোভাবে গরম করে খাওয়া সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে। রাতে ঘুমানোর সময় পর্যাপ্ত কম্বল ব্যবহার শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখে।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে করণীয়

শীতকালে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য উষ্ণ পোশাক বিতরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও গৃহহীন মানুষের জন্য কম্বল ও শীতবস্ত্র নিশ্চিত করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে শীতকালীন রোগের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ, অক্সিজেন ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা জরুরি।

জনসচেতনতা বাড়াতে শীতকালীন রোগের লক্ষণ ও প্রতিরোধ বিষয়ে নিয়মিত প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। স্কুল, মসজিদ ও স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারগুলো এই প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৬ সালের শীত বাংলাদেশে শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি বড় অধ্যায় হয়ে উঠেছে। শীতকালীন রোগের ধরন, বিস্তার এবং প্রভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শীতকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, সচেতনতা এবং সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই রোগগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতে। শীত আসবে, কিন্তু প্রস্তুতি থাকলে শীতের রোগ ভয় হয়ে উঠবে না—এই শিক্ষাই ২০২৬ সালের শীত আমাদের দিয়েছে।