নিউইয়র্কে চলমান প্রোটোটাইপ উৎসব এ বছর নারীর কণ্ঠ, নারীর অভিজ্ঞতা আর নারীকেন্দ্রিক সৃজনশীলতাকে সামনে এনে অপেরার নতুন ভাষা তুলে ধরেছে। উৎসবের সূচনা লগ্নে যে দুটি নতুন প্রযোজনা মঞ্চে এসেছে, দুটি নারীদের লেখা এবং নারীর গল্পকে ঘিরে। এই মিল কাকতালীয় নয়। কারণ, এই বছর বেথ মরিসন প্রজেক্ট এর দুই দশক পূর্তি। নতুন, সাহসী ও প্রচলিত ধারার বাইরে থাকা অপেরার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এই উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত।
দ্বাদশ শতকের সাধ্বীর জীবনে ফিরে দেখা
উৎসবের প্রথম বড় প্রযোজনা সারা কার্কল্যান্ড স্নাইডারের অপেরা ‘হিলডেগার্ড’। নিউইয়র্কে এর প্রথম মঞ্চায়ন হয়েছে জেরাল্ড ডব্লিউ লিঞ্চ থিয়েটারে। এই অপেরা দ্বাদশ শতকের বেনেডিক্টিন অ্যাবেস, দার্শনিক ও সুরকার হিলডেগার্ড ফন বিঙ্গেনের জীবন ও মানসিক জগৎকে অনুসন্ধান করে। কাহিনী আবর্তিত হয়েছে এক সংকটময় সময়কে ঘিরে, যখন তাঁর দর্শন লব্ধ ভাবনা পোপের কাছে উপস্থাপিত হয় এবং তাঁকে ভবিষ্যদ্বক্তা না কি ধর্মদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, সেই প্রশ্ন সামনে আসে।
নারী শক্তি, দ্বন্দ্ব আর বিশ্বাসের গল্প
এই অপেরায় হিলডেগার্ডকে দেখানো হয়েছে শক্তিশালী কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত এক চরিত্র হিসেবে। পুরুষশাসিত গির্জার ক্ষমতার বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ় অবস্থান নেন, আবার এক তরুণী সন্ন্যাসিনীর প্রতি নিজের অনুভূতি নিয়েও অস্থির হয়ে পড়েন। দীর্ঘ সময়ের এই প্রযোজনায় নারীবাদ, অসুস্থতা, লজ্জা, শিল্পের গুরুত্ব, ভালোবাসা ও ঈশ্বরের ধারণা একে একে উন্মোচিত হয়। দৃশ্যের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর দর্শন চিত্রগুলো মঞ্চে বিস্ফোরণের মতো হাজির হয়ে দর্শককে মুগ্ধ করে।
সুর, কণ্ঠ আর মঞ্চের মেলবন্ধন
সারা স্নাইডারের সুরে দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই এক অন্য জাগতিক আবহ তৈরি হয়েছে। প্রধান নারী চরিত্রগুলোর আরিয়া আবেগে ভরপুর। হিলডেগার্ডের ভূমিকায় নোলা রিচার্ডসনের স্বচ্ছ কণ্ঠ যেমন গভীরতা এনেছে, তেমনি রিচার্ডিস চরিত্রে মিকায়েলা বেনেটের সুরে ফুটে উঠেছে যন্ত্রণা আর টানাপোড়েন। ছোট আকারের সংগীতদল হলেও তার শব্দ বৈচিত্র্য বিস্ময় জাগায়। আলো, প্রক্ষেপণ আর ঘূর্ণায়মান মঞ্চসজ্জা মধ্যযুগীয় চিত্রকলা ও আধুনিক ভাবনার সেতু তৈরি করেছে। শেষ পর্যন্ত হিলডেগার্ড নারীদের জন্য আলাদা সম্প্রদায় গড়ে তোলার শক্তি খুঁজে পান, যেখানে নারীবাদী আত্মপ্রতিষ্ঠার বিজয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রকৃতি আর নারীর মুক্তির প্রতীকী যাত্রা
উৎসবের আরেক প্রযোজনা ‘প্রেসিপিস’ তুলনামূলকভাবে ছোট, তবে ভিন্ন ধারার। বস্তুনির্ভর থিয়েটার আর চেম্বার অপেরার সংমিশ্রণে এই কাজটি নারীর কণ্ঠরোধ ও প্রকৃতির উপর আধিপত্যের সমালোচনা করে। ছোটবেলার কল্পনাপ্রবণ আনা বড় হয়ে পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি খোঁজে। ভিডিও, ক্ষুদ্র মডেল আর সঙ্গীত মিলিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার স্বপ্ন দৃশ্যমান হয়। শেষ দৃশ্যে ধূসর জগৎ সবুজ গাছে রূপ নেয়, যা নারীর নিজস্ব পরিচয় ফিরে পাওয়ার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
দুই দশকের প্রভাব আর ভবিষ্যতের দিশা
বেথ মরিসন প্রজেক্টস তাদের বিশ বছরের যাত্রা উদযাপন করছে একটি বিশেষ সংকলনের মাধ্যমে, যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী সুরকারের কাজ স্থান পেয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল অপেরায় নতুন মানুষ, নতুন কণ্ঠ আর এমন গল্প আনা, যেখানে নারীর পরিণতি শুধুই ট্র্যাজেডি নয়। প্রোটোটাইপ উৎসবের এই দুটি প্রযোজনা প্রমাণ করে, সেই লক্ষ্য কতটা গভীর প্রভাব ফেলেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















