বিশ্ববাজারে তেলের দাম আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও ভেতরে ভেতরে বড় অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে চীনের তেল আমদানি পরিস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ অবৈধ তেল বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় চীনের জন্য সস্তা নিষেধাজ্ঞা ভুক্ত তেলের সরবরাহের চাপ তৈরি হচ্ছে। ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বর্তমান বাজারে চাপের ইঙ্গিত
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড এর দাম এখনো তুলনামূলক শান্ত। ব্যারেল প্রতি দাম ঘোরাফেরা করছে তেষট্টি ডলারের আশপাশে। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অস্থিরতার পরও দামে বড় লাফ দেখা যায়নি। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি সাময়িক। ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকায় উৎপাদন বাড়াতে অন্তত কয়েক বছর সময় লাগবে। ফলে সরবরাহে ঘাটতির প্রভাব ধীরে ধীরে প্রকৃত বাজারে ধরা পড়বে।
কালো তেলের বাজারে কড়াকড়ি
ভেনেজুয়েলার চারপাশে অবরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের তেলবাহী জাহাজ জব্দের ঘটনা নিষেধাজ্ঞা ভুক্ত বা তথাকথিত অন্ধকার তেলের বাজারের জন্য বড় সতর্কবার্তা। বর্তমানে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল বিশ্ব সরবরাহের প্রায় পনেরো শতাংশে পৌঁছেছে। এই তেল পরিবহনে ব্যবহৃত ছায়া জাহাজবহরও দ্রুত বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্র একাধিক জাহাজ জব্দ করায় এই অবৈধ নেটওয়ার্কে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
চীনের জন্য বাড়তি ঝুঁকি
ভেনেজুয়েলা, ইরান ও রাশিয়া থেকে ছাড়ে তেল কিনে চীন দীর্ঘদিন লাভবান হয়েছে। মোট তেল আমদানির প্রায় এক তৃতীয়াংশই এসেছে এই তিন দেশ থেকে। এতে চীনের জ্বালানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শুধু ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেই গত নভেম্বর মাসে ব্যারেলপ্রতি প্রায় নয় ডলার সাশ্রয় হয়েছিল বলে বাজার তথ্য বলছে।
তবে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। ভেনেজুয়েলার প্রায় পাঁচ লাখ ব্যারেল দৈনিক তেল, যা এতদিন চীন নিত, তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা বেছে বেছে শিথিল করা হবে। এতে অবৈধ চ্যানেল থেকে মূলধারার বাজারে সরবরাহ সরে আসবে। ফলে ভেনেজুয়েলার তেলের ছাড় কমবে এবং দেশটির রাজস্ব বাড়বে। কিন্তু চীনের জন্য এই তেল আর আগের মতো সস্তা থাকবে না।
বিকল্প খোঁজার চাপ
চীন যেসব ভারী তেল ব্যবহার করে, সেগুলোর বিকল্প হিসেবে কানাডা বা অন্য দেশ থেকে তেল কেনা সম্ভব হলেও দাম তুলনামূলক বেশি। এতে চীনের শোধনাগারগুলোর ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত এক বছরে এটি তৃতীয়বার, যখন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপে চীনের জ্বালানি আমদানি হুমকির মুখে পড়ল। এর আগে ইরানে হামলার আশঙ্কা এবং রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা চীনা ক্রেতাদের অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
এই অভিজ্ঞতা চীনকে আগাম মজুদ বাড়াতে উৎসাহিত করেছে। দেশটি অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে বেশি তেল কিনে সংরক্ষণে রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মজুত মার্চ মাস পর্যন্ত টিকে যাবে। এরপর নতুন সরবরাহকারী খুঁজতে হবে।
ভূরাজনীতির দীর্ঘ ছায়া
দীর্ঘমেয়াদে লাতিন আমেরিকায় চীনের বিনিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ভেনেজুয়েলায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ পরিকল্পনা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। একই সঙ্গে ইরানও রাজনৈতিক অস্থিরতায় কম নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠছে। অন্যদিকে রাশিয়া তার ছায়া জাহাজ বহর রক্ষায় আগ্রাসী অবস্থান নিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও উত্তেজনা বাড়াতে পারে।

বিশ্ববাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ থাকায় তেলের দামে এখনো ভূ রাজনৈতিক ঝুঁকির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তবে নিষেধাজ্ঞার ভুক্ত বাজারে চাপ জমছে। সমুদ্রে ভাসমান লাখ লাখ ব্যারেল তেল ক্রেতা না পেয়ে আটকে আছে। এই কালোবাজারে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দ্রুতই এর প্রভাব বৈধ বাজারে পড়তে পারে এবং তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















