একজন অত্যাচারী বাবা, ভুয়া এক জ্যোতিষীর ফাঁদে পড়ে মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। কিন্তু মেয়ে আর এক বুদ্ধিমান ভৃত্য হাস্যরস আর কৌতুকের ফাঁদ পেতে সেই প্রতারণা ফাঁস করে দেয়। কাহিনি শুনে মনে হতে পারে, এটি সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত ফরাসি নাট্যকার মলিয়েরেরই কোনো অজানা নাটক। কিন্তু বাস্তবে এই গল্পের জন্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কলমে।
প্যারিসে সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ‘দ্য অ্যাস্ট্রোলজার, অর ফলস ওমেন্স’ নামে একটি নাটক, যা লেখা হয়েছে এমন এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে, যার লক্ষ্য ছিল মলিয়েরের ভাষা, কাঠামো, বিষয়বস্তু আর ব্যঙ্গরসকে অনুকরণ করা। গত দুই বছর ধরে ফরাসি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গোষ্ঠী অবভিয়াস, সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় ও থিয়াত্র মলিয়ের সোরবোন যৌথভাবে এই প্রকল্পে কাজ করেছে।
মলিয়েরের সৃজনপ্রক্রিয়া অনুকরণের চেষ্টা
থিয়াত্র মলিয়ের সোরবোনের পরিচালক মিকায়েল বুফার্দ জানাচ্ছেন, এই উদ্যোগের মূল চালিকা শক্তি ছিল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মলিয়ের কীভাবে ভাবতেন, কীভাবে ধাপে ধাপে একটি নাটক নির্মাণ করতেন, সেই প্রক্রিয়াকে যতটা সম্ভব ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুলভাবে অনুকরণ করা। ডিজিটাল শিল্প উৎসব নেমোর অংশ হিসেবে প্যারিসের সাঁসঁকাত্র শিল্পকেন্দ্রে নাটকটির একটি অংশ মঞ্চস্থ হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনী হবে মে মাসে ভার্সাইয়ের রাজকীয় অপেরায়।
এই সহযোগিতার নেপথ্যে ছিলেন সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও সমাজতাত্ত্বিক পিয়ের-মারি শোভাঁ। তাঁর মতে, অবভিয়াস কেবল প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় নয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিতেও আগ্রহী।
দুই বছরের পরিশ্রম, পনেরোবার সংশোধন
অবভিয়াস মূলত অ্যালগরিদমভিত্তিক দৃশ্যশিল্পের জন্য পরিচিত। তাদের তৈরি একটি চিত্রকর্ম একসময় নিলামে বিক্রি হয়েছিল বিপুল দামে। তবে নাট্যরচনা ছিল সম্পূর্ণ নতুন চ্যালেঞ্জ। মলিয়েরের সমগ্র রচনার ওপর প্রশিক্ষিত বিভিন্ন মডেল দিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা চলেছে। বড় সমস্যার জায়গা ছিল ধারাবাহিকতা, গল্প যত এগোত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ততই শুরুর অংশ ভুলে যেত।
বুফার্দ স্বীকার করেছেন, কয়েক মাস পর তিনি প্রায় হাল ছেড়ে দিতে বসেছিলেন, কারণ কাজটি ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। অবভিয়াসের সদস্য গথিয়ে ভার্নিয়ের মজা করে বলেছেন, মলিয়ের যেখানে দুই সপ্তাহে একটি নাটক লিখতেন, সেখানে তাঁরা দুই বছর ধরে লড়াই করছেন।

তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি ধীরে ধীরে দীর্ঘ রচনার জন্য প্রয়োজনীয় স্থায়িত্ব এনে দেয়। মলিয়ের-বিশেষজ্ঞ গবেষকেরা ধারাবাহিকভাবে মতামত দিয়েছেন। নাটকের সারসংক্ষেপ বদলানো হয়েছে পনেরোবার। লোজান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিস মিশেল বলেন, তিনি এটিকে এক ধরনের খেলা হিসেবেই নিয়েছিলেন, কোথায় মলিয়েরের সুর ঠিক মিলছে না, তা খুঁজে বের করাই ছিল তাঁর কাজ।
প্রশংসা, বিস্ময় আর বিতর্ক
মলিয়েরের সূক্ষ্ম সাহিত্যিক ব্যঙ্গ আর শারীরিক কৌতুকের মিশেল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল। কোথাও রস টানা পড়েছে, কোথাও রসিকতা হয়েছে অতিরিক্ত সরল। তবু অভিনেতাদের প্রতিক্রিয়া আর মানবিক সংশোধনে অনেক সংলাপ এমন এসেছে, যা পুরো দলকে হেসে লুটোপুটি খাওয়াতে বাধ্য করেছে।
তবু সবাই যে উচ্ছ্বসিত, তা নয়। কেউ কেউ মনে করছেন, মলিয়েরের মতো এক ‘পবিত্র’ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে এমন পরীক্ষা ঝুঁকিপূর্ণ। নাট্যপরিচালক অরোর এভাঁ সামাজিক মাধ্যমে এই প্রকল্পকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন এবং বড় বাজেট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
নাটক ছাড়িয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ ভাবনা
এই প্রকল্পে কেবল নাটকের লেখা নয়, মঞ্চসজ্জা, পোশাক আর সংগীত তৈরিতেও আলাদা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে সবকিছুই মলিয়ের যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। মে মাসে ভার্সাইয়ে পূর্ণাঙ্গ উপস্থাপনার পর ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শনীর পরিকল্পনা রয়েছে।
বুফার্দ বলছেন, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অসমাপ্ত নাটক বা সুর সম্পূর্ণ করার কথা ভাবা যেতে পারে, ঠিক যেমন পুরোনো কোনো চিত্রকর্ম পুনরুদ্ধার করা হয়। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনো অহং নেই, নিজস্ব রুচিও নেই। এই নিরপেক্ষতাই একে অতীতের শিল্পরীতিকে নতুন করে অনুকরণ করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উপযোগী করে তোলে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















