প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ সেবার একটি পরিপূর্ণ ব্র্যান্ড গড়ে তোলার পর জেটেক্স এখন দৃষ্টি ঘোরাচ্ছে ভিন্ন দিকে। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী আদেল মারদিনির কাছে আজ আসল চ্যালেঞ্জ আকার বা আভিজাত্য নয়, বরং পুরো যাত্রাটিকে কতটা নিরবচ্ছিন্ন ও সময় সাশ্রয়ী করা যায়।
দুবাইয়ের আল মাকতুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জেটেক্স ভিআইপি টার্মিনালে দাঁড়িয়ে মারদিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, মানুষ শুধু আকাশে উড়ার জন্য ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ বেছে নেয় না। তারা সময় বাঁচাতে চায়। কিন্তু অবতরণের পর যদি আবার এক-দুই ঘণ্টা নষ্ট হয়, তাহলে পুরো অভিজ্ঞতাই ভেঙে পড়ে।
এই উপলব্ধি থেকেই জেটেক্সের নতুন অধ্যায় শুরু। এখন লক্ষ্য একটানা যাত্রা, যেখানে উড়োজাহাজ, আকাশপথের ট্যাক্সি, টেকসই জ্বালানি ও বিলাসী জীবনধারার সেবা মিলেমিশে সময়ের অপচয় দূর করবে।

শেষ মাইলের জট খুলতেই নতুন ভাবনা
ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে যাত্রার সবচেয়ে বড় অসংগতি দেখা যায় অবতরণের পর। আকাশে সময় বাঁচলেও, মাটিতে যানজটে আটকে পড়ে আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট হয়। এই শেষ মাইল সমস্যাই জেটেক্সকে বৈদ্যুতিক উল্লম্ব উড্ডয়ন ও অবতরণ যোগ্য উড়োজাহাজের দিকে টেনেছে।
আর্চার ও জবি এভিয়েশনের সঙ্গে অংশীদারিত্বে জেটেক্স নিজেকে গড়ে তুলছে আকাশপথের ট্যাক্সির অবকাঠামো ও সেবাদাতা হিসেবে। মারদিনির মতে, এটি কোনো নতুন কৌতূহল নয়, বরং ব্যক্তিগত যাত্রার সবচেয়ে বড় অকার্যকারিতা দূর করার বাস্তব সমাধান।
জেটেক্সের লক্ষ্য, যাত্রী যেন উড়োজাহাজ থেকে নেমেই সরাসরি আকাশপথের ট্যাক্সিতে উঠতে পারে। মাঝখানে কোনো অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব থাকবে না। দুবাইকে সামনে রেখে এই ব্যবস্থার বিস্তার ঘটবে জেটেক্সের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কজুড়ে।
বিমানবন্দর পেরিয়ে জীবনধারার পরিধি
এই একটানা অভিজ্ঞতার ভাবনাই জেটেক্সকে বিমানবন্দরের বাইরেও নিয়ে যাচ্ছে। দুই হাজার ছাব্বিশ সাল থেকে ক্যাফে, হোটেল ও ব্যক্তিগত সদস্য ক্লাব নিয়ে নিজস্ব জীবনধারা ভিত্তিক স্থাপনা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। জেটেক্সের দৃষ্টিতে বিমানবন্দর এখন আর শেষ গন্তব্য নয়, বরং একটি বড় ব্যবস্থার অংশ।
মারদিনির ভাষায়, যাদের সময় ও গোপনীয়তা নিয়ে তারা ইতিমধ্যেই আস্থা অর্জন করেছে, সেই আস্থার জায়গা থেকেই জীবনের অন্য অংশে প্রবেশ করছে জেটেক্স।
বদলে যাওয়া যাত্রীচিত্র
মহামারীর আগে জেটেক্সের প্রধান গ্রাহক ছিলেন তেল ও গ্যাস খাতের ধনকুবের বা সরকারি উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা, যাদের বয়স সাধারণত পঞ্চাশ থেকে আশির মধ্যে। তখন ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ মানেই ছিল প্রবেশাধিকার ও গোপনীয়তা।
বর্তমানে সেই চিত্র পাল্টেছে। এখন যাত্রীদের গড় বয়স পঁচিশ থেকে পঞ্চান্ন। প্রযুক্তি, ক্রিপ্টো, ফ্যাশন, বিনোদন ও সৃজনশীল খাতের মানুষ বাড়ছে দ্রুত। এরা অত্যন্ত সময়সচেতন এবং আকাশের মতো মাটিতে একই রকম মসৃণ অভিজ্ঞতা চায়।
টেকসই জ্বালানি ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ
দক্ষতা শুধু চলাচলে নয়, জ্বালানি ও অবকাঠামোতেও জরুরি। সাম্প্রতিক দুবাই এয়ার শোতে জেটেক্স যে টেকসই উড্ডয়ন জ্বালানি সরবরাহ করেছিল, তা পুরোপুরি বিক্রি হয়ে যায়। এতে স্পষ্ট, পরিবেশবান্ধব সমাধানের চাহিদা বাড়ছে।
ভৌগোলিকভাবে সৌদি আরব জেটেক্সের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেড সি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একচেটিয়া অপারেটর হিসেবে কাজ শুরু করছে তারা। রিয়াদ, জেদ্দা ও নিওমেও সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই, যেখানেই যাত্রী নামুক, অভিজ্ঞতায় যেন দুবাইয়ের ছাপ থাকে।
সময়ই সবচেয়ে বড় বিলাসিতা
দুবাই থেকে পরিচালিত চব্বিশ ঘণ্টার বৈশ্বিক অপারেশন কেন্দ্র, নিজস্ব প্রযুক্তি আর অভিন্ন সেবামানের মাধ্যমে জেটেক্স চেষ্টা করছে জটিলতাকে পুরোপুরি অদৃশ্য করতে। মারদিনির বিশ্বাস, যদি গ্রাহকের মনে হয় একটি ব্যক্তিগত দলই তার পুরো যাত্রা সামলাচ্ছে, তাহলেই সাফল্য।
পরিকাঠামো বদলাচ্ছে, অভিজ্ঞতা নতুন করে গড়া হচ্ছে। জেটেক্সের পরবর্তী সীমান্ত কেবল আকাশ নয়, সময়কে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















