০৪:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
দক্ষিণ কোরিয়ায় কীভাবে ‘ইয়েলো পাইথন’ এলো আর্কটিকে নীরব দখলযুদ্ধ: স্বালবার্ডে কর্তৃত্ব জোরালো করছে নরওয়ে পরিচয়ের আয়নায় মানবতার সাক্ষ্য: জন উইলসনের শিল্পভ্রমণ দুই ভাইয়ের অভিযানে বদলে যাচ্ছে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের সত্য লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানলের পরে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ততা দীর্ঘ বিরতির পর বিটিএসের প্রত্যাবর্তন: দশম অ্যালবাম ও বিশ্বভ্রমণ গোষ্ঠী থেরাপির শক্তি: একক থেরাপির বিকল্প বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে ইরানের প্রতিবেশী সতর্ক বার্তা ইরানের অস্থিরতায় বেইজিংয়ের সামনে কঠিন সমীকরণ চীন সফরের আগমুহূর্তে ধাক্কা, কানাডা থেকে আমদানি কমিয়ে দিল বেইজিং

পরিচয়ের আয়নায় মানবতার সাক্ষ্য: জন উইলসনের শিল্পভ্রমণ

পরিচয়ের প্রশ্নে ভেতরের দিকে তাকানো এবং একই সঙ্গে বাইরের জগৎকে প্রত্যক্ষ করার যে দ্বৈত দৃষ্টি, সেটিই গড়ে তুলেছে মার্কিন শিল্পী জন উইলসনের শিল্পভাষা। বোস্টনে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর কাজ নিয়ে নিউইয়র্কে আয়োজিত বৃহৎ প্রদর্শনী মানবতা, রাজনীতি ও আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ এক যাত্রার দলিল হয়ে উঠেছে।

শৈশব, বর্ণবাদ এবং শিল্পের বীজ

গায়ানা থেকে আসা অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান জন উইলসনের বেড়ে ওঠা বোস্টনে। পরিবারটি মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে এলেও যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবিভাজনের কঠিন বাস্তবতায় তা ভেঙে পড়ে। চাকরি হারানো বাবার জায়গায় গৃহকর্ম করে সংসার চালাতে হয় মাকে। তবু সংস্কৃতি ও শিক্ষার গুরুত্বে পরিবার কখনো আপস করেনি। বই পড়া, শিল্পচর্চা আর কল্পনার জগৎই ছিল উইলসনের শৈশবের আশ্রয়।

তরুণ বয়সেই দৃঢ় শিল্পীসত্তা

কিশোর বয়সেই বোস্টনের ফাইন আর্টস স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন উইলসন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার আঁকা চিত্রকলা ও ছাপচিত্রে দেখা যায় বিস্ময়কর পরিপক্বতা। উনিশ শত চল্লিশের দশকের আত্মপ্রতিকৃতিতে তিনি আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু একই সময়ের ছাপচিত্রে ফুটে ওঠে সামাজিক অস্থিরতা, যুদ্ধের ছায়া আর কৃষ্ণাঙ্গ জীবনের গভীর উদ্বেগ।

রাজনীতি ও দ্বৈত চেতনার শিল্প

উইলসনের বহু কাজে একসঙ্গে দেখা যায় গর্বিত আত্মপরিচয় আর বৈরী সমাজের বাস্তবতা। শ্রমজীবী কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষের ক্লান্ত দেহ, একাকী দাঁড়িয়ে থাকা কিশোর, কিংবা যুদ্ধকালীন সহিংসতার মুখোমুখি পরিবার—সবকিছু মিলিয়ে তার শিল্পে ধরা পড়ে দ্বৈত চেতনার অভিজ্ঞতা। এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তী জীবনে তার শিল্পচর্চার ভিত্তি হয়ে ওঠে।

PDF) The Entangled Gaze: Indigenous and European Views of Each Other

স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

ছাত্রাবস্থাতেই আধুনিক শিল্প জাদুঘরে তার কাজ সংগ্রহে নেওয়া হয়। এরপর ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘ সময় কাটান তিনি। প্যারিসে আধুনিক ধারার পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মেক্সিকোতে রাজনৈতিক শিল্পীদের সঙ্গে কাজ তার দৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করে। যদিও সেই সময়ের সব কাজ সমানভাবে শক্তিশালী নয়, তবু এই অভিজ্ঞতাই তাকে পরবর্তী পর্বে নতুন ভাষা খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

বিমূর্ততা ও মানব অবয়বের মিলন

যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে উইলসন বিমূর্ত শিল্পের ভাষাকে ব্যবহার করেন রাজনৈতিক বক্তব্যে। যখন সমকালীন শিল্পে মানব অবয়ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, তখন তিনি উল্টোভাবে মানুষের শরীর, মুখ ও গল্পকেই আঁকড়ে ধরেন। তার কাজে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের বিকৃত উপস্থাপনার বিরুদ্ধে এক দৃঢ় প্রতিবাদ ধরা পড়ে।

ছাপচিত্র থেকে ভাস্কর্যে রূপান্তর

সত্তরের দশকে উইলসন বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটেন। ছাপচিত্র ছেড়ে তিনি মন দেন ভাস্কর্যে। পিতা ও সন্তানের একসঙ্গে বসে পড়ার দৃশ্য কিংবা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের স্মৃতিতে নির্মিত ভাস্কর্যগুলোতে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও জাতিগত ইতিহাস মিলেমিশে যায়।

চূড়ান্ত অভিব্যক্তি মানবতার

তার সবচেয়ে স্মরণীয় ভাস্কর্য এক বিশাল মানবমুখ, যেখানে লিঙ্গ ও বর্ণের সীমা মুছে যায়। ভেতরের দিকে তাকানো আবার বাইরের জগতকেও দেখার এই মুখ যেন সার্বজনীন মানবতার প্রতীক। উইলসনের ভাষায়, এখানেই রাজনৈতিক ক্ষোভ আর মানবিক আকাঙ্ক্ষার মীমাংসা।

প্রদর্শনী ও উত্তরাধিকার

নিউইয়র্কের এই প্রদর্শনী শুধু এক শিল্পীর কাজের সমীক্ষা নয়, এটি আমেরিকার ইতিহাস, বর্ণবাদ, সংগ্রাম আর মানবতার দীর্ঘ কথোপকথন। জন উইলসনের শিল্প আজও স্মরণ করিয়ে দেয়, পরিচয়ের অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত মানবতার দিকেই নিয়ে যায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

দক্ষিণ কোরিয়ায় কীভাবে ‘ইয়েলো পাইথন’ এলো

পরিচয়ের আয়নায় মানবতার সাক্ষ্য: জন উইলসনের শিল্পভ্রমণ

০২:০১:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

পরিচয়ের প্রশ্নে ভেতরের দিকে তাকানো এবং একই সঙ্গে বাইরের জগৎকে প্রত্যক্ষ করার যে দ্বৈত দৃষ্টি, সেটিই গড়ে তুলেছে মার্কিন শিল্পী জন উইলসনের শিল্পভাষা। বোস্টনে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর কাজ নিয়ে নিউইয়র্কে আয়োজিত বৃহৎ প্রদর্শনী মানবতা, রাজনীতি ও আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ এক যাত্রার দলিল হয়ে উঠেছে।

শৈশব, বর্ণবাদ এবং শিল্পের বীজ

গায়ানা থেকে আসা অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান জন উইলসনের বেড়ে ওঠা বোস্টনে। পরিবারটি মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে এলেও যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবিভাজনের কঠিন বাস্তবতায় তা ভেঙে পড়ে। চাকরি হারানো বাবার জায়গায় গৃহকর্ম করে সংসার চালাতে হয় মাকে। তবু সংস্কৃতি ও শিক্ষার গুরুত্বে পরিবার কখনো আপস করেনি। বই পড়া, শিল্পচর্চা আর কল্পনার জগৎই ছিল উইলসনের শৈশবের আশ্রয়।

তরুণ বয়সেই দৃঢ় শিল্পীসত্তা

কিশোর বয়সেই বোস্টনের ফাইন আর্টস স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন উইলসন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার আঁকা চিত্রকলা ও ছাপচিত্রে দেখা যায় বিস্ময়কর পরিপক্বতা। উনিশ শত চল্লিশের দশকের আত্মপ্রতিকৃতিতে তিনি আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু একই সময়ের ছাপচিত্রে ফুটে ওঠে সামাজিক অস্থিরতা, যুদ্ধের ছায়া আর কৃষ্ণাঙ্গ জীবনের গভীর উদ্বেগ।

রাজনীতি ও দ্বৈত চেতনার শিল্প

উইলসনের বহু কাজে একসঙ্গে দেখা যায় গর্বিত আত্মপরিচয় আর বৈরী সমাজের বাস্তবতা। শ্রমজীবী কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষের ক্লান্ত দেহ, একাকী দাঁড়িয়ে থাকা কিশোর, কিংবা যুদ্ধকালীন সহিংসতার মুখোমুখি পরিবার—সবকিছু মিলিয়ে তার শিল্পে ধরা পড়ে দ্বৈত চেতনার অভিজ্ঞতা। এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তী জীবনে তার শিল্পচর্চার ভিত্তি হয়ে ওঠে।

PDF) The Entangled Gaze: Indigenous and European Views of Each Other

স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

ছাত্রাবস্থাতেই আধুনিক শিল্প জাদুঘরে তার কাজ সংগ্রহে নেওয়া হয়। এরপর ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘ সময় কাটান তিনি। প্যারিসে আধুনিক ধারার পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং মেক্সিকোতে রাজনৈতিক শিল্পীদের সঙ্গে কাজ তার দৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করে। যদিও সেই সময়ের সব কাজ সমানভাবে শক্তিশালী নয়, তবু এই অভিজ্ঞতাই তাকে পরবর্তী পর্বে নতুন ভাষা খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

বিমূর্ততা ও মানব অবয়বের মিলন

যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে উইলসন বিমূর্ত শিল্পের ভাষাকে ব্যবহার করেন রাজনৈতিক বক্তব্যে। যখন সমকালীন শিল্পে মানব অবয়ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, তখন তিনি উল্টোভাবে মানুষের শরীর, মুখ ও গল্পকেই আঁকড়ে ধরেন। তার কাজে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের বিকৃত উপস্থাপনার বিরুদ্ধে এক দৃঢ় প্রতিবাদ ধরা পড়ে।

ছাপচিত্র থেকে ভাস্কর্যে রূপান্তর

সত্তরের দশকে উইলসন বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটেন। ছাপচিত্র ছেড়ে তিনি মন দেন ভাস্কর্যে। পিতা ও সন্তানের একসঙ্গে বসে পড়ার দৃশ্য কিংবা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের স্মৃতিতে নির্মিত ভাস্কর্যগুলোতে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও জাতিগত ইতিহাস মিলেমিশে যায়।

চূড়ান্ত অভিব্যক্তি মানবতার

তার সবচেয়ে স্মরণীয় ভাস্কর্য এক বিশাল মানবমুখ, যেখানে লিঙ্গ ও বর্ণের সীমা মুছে যায়। ভেতরের দিকে তাকানো আবার বাইরের জগতকেও দেখার এই মুখ যেন সার্বজনীন মানবতার প্রতীক। উইলসনের ভাষায়, এখানেই রাজনৈতিক ক্ষোভ আর মানবিক আকাঙ্ক্ষার মীমাংসা।

প্রদর্শনী ও উত্তরাধিকার

নিউইয়র্কের এই প্রদর্শনী শুধু এক শিল্পীর কাজের সমীক্ষা নয়, এটি আমেরিকার ইতিহাস, বর্ণবাদ, সংগ্রাম আর মানবতার দীর্ঘ কথোপকথন। জন উইলসনের শিল্প আজও স্মরণ করিয়ে দেয়, পরিচয়ের অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত মানবতার দিকেই নিয়ে যায়।