চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন নেমে এসেছে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
প্রথমার্ধে বাস্তবায়নের চিত্র
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের হিসাবে, জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে মূল বরাদ্দের মাত্র ১৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়িত হয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে এটি প্রথমার্ধের অন্যতম দুর্বল পারফরম্যান্স হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রথম ছয় মাসে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৪১ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।

ধীরগতির পেছনের কারণ
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে ক্রয়প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, সময়মতো অর্থ ছাড় না হওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরির মতো সমস্যা বছরের পর বছর ধরে রয়ে গেছে। মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাও এই ধীরগতির বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
বরাদ্দ বাড়লেও বাস্তবায়ন পিছিয়ে
গত কয়েক বছরে উন্নয়ন কর্মসূচির মোট আকার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ এ ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ এ ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ এ ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। তবে বরাদ্দ বাড়লেও বাস্তবায়নের গতি বাড়েনি।

প্রথমার্ধের বাস্তবায়ন হার ধারাবাহিকভাবে কমছে
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বাস্তবায়ন ছিল ২৪ দশমিক ০৬ শতাংশ। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ৫৩ শতাংশে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নেমে আসে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে এবং ২০২৪-২৫ এ হয় ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা আরও কমে ১৭ দশমিক ৫৪ শতাংশে ঠেকেছে। এই ধারাবাহিক পতন কাঠামোগত দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডিসেম্বরে ব্যয়ও ছিল কম
সাধারণত ডিসেম্বর মাসে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কিছুটা বাড়ে। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সেই চিত্রও দেখা যায়নি। ওই মাসে মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো মাত্র ১৩ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা ব্যয় করতে পেরেছে, যা মোট কর্মসূচির ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ।

কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনে বিলম্ব, দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের অভাব এবং আর্থিক কড়াকড়ির কারণে ব্যয় নিয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা বাস্তবায়নকে আরও মন্থর করে তুলেছে। তাঁদের মতে, এই ধীরগতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সেবাদান ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে যখন বেসরকারি বিনিয়োগও কম।
এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারের অর্থনীতিকে চাঙা করার প্রধান হাতিয়ারই হলো উন্নয়ন কর্মসূচি। বছরের মাঝামাঝি সময়ে যদি বাস্তবায়ন ২০ শতাংশের নিচে থাকে, তবে বাকি সময়ে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং শেষ দিকে তাড়াহুড়ো করে ব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়।
পরিকল্পনা উপদেষ্টার বক্তব্য
পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, চলতি অর্থবছরজুড়েই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের এই ধীরগতি অব্যাহত থাকতে পারে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের বৈঠক শেষে তিনি জানান, সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন ব্যয়ের মান ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর দিকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে কাঠামোগত, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে মোট উন্নয়ন ব্যয় এখনও সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। স্বল্পমেয়াদে এতে বাস্তবায়ন ধীর হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ইতিবাচক প্রভাব আশা করা হচ্ছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















