নির্বাচন কমিশনের উদাসীনতা এবং মাঠপর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তাদের নীরবতার কারণে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তাঁর মতে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো স্পষ্ট হলেও কমিশনের পক্ষ থেকে সমানভাবে আইন প্রয়োগ না হওয়ায় নির্বাচন নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
বুধবার সন্ধ্যায় গুলশানে দলের নির্বাচন কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম খান বলেন, বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও প্রকাশ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বক্তব্য দিচ্ছেন এবং ব্যানার প্রদর্শন করছেন। অথচ সাধারণ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে যেভাবে কঠোরতা দেখানো হচ্ছে, একইভাবে সবার ওপর আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচন কমিশন এই দ্বৈত মানসিকতা থেকে সরে আসবে।

নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে ইসিকে আগেই জানানো
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির এই নেতা জানান, নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে তাঁদের দল আগেই নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেছে। তবু কমিশনের নির্লিপ্ত অবস্থান এবং নির্বাচন কর্মকর্তাদের নীরবতা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তোলার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি এই আচরণকে অনুচিত উল্লেখ করে দ্রুত পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও অংশগ্রহণের প্রশ্ন
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান বলেন, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক এবং তাতে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হোক—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা। তবে বাস্তব পরিস্থিতি সেই পথে এগোচ্ছে না বলে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, নির্বাচনী পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান উত্তরাঞ্চলের নির্ধারিত সফর স্থগিত করেছেন, যাতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা উত্তেজনা সৃষ্টি না হয়। বিএনপি যখন এমন দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তখন অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকেও আচরণবিধি মেনে চলার প্রত্যাশা করেন তিনি।

শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় বিএনপি
নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি সব সময় শান্তিপূর্ণ ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে বিএনপিই বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সামরিক শাসনের অবসান, সংসদীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং এক-এগারোর সময় জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এবারও সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে চায় দলটি।
তিনি আরও বলেন, বহু বছর ভোট দিতে না পারা সাধারণ মানুষ যেন ভয়ভীতি ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেটাই বিএনপির লক্ষ্য। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার প্রয়োগে আস্থা ফেরাতে দলটি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সমতাভিত্তিক মাঠ ও আচরণবিধি প্রয়োগের দাবি
বিএনপির এই নেতা অভিযোগ করেন, সামান্য আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বিএনপির একাধিক প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে, এমনকি একজন প্রার্থীর কন্যার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ধানের শীষে ভোট দিন’ লেখার জন্যও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি এসব সিদ্ধান্ত মেনে নেয়, যদি একই নিয়ম সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।
তবে তাঁর অভিযোগ, অন্য দলের প্রভাবশালী নেতারা নির্বাচন কর্মকর্তাদের সামনে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালালেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এতে সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হচ্ছে না।

ডাকযোগে ভোট ও ব্যালট নকশা নিয়ে উদ্বেগ
ডাকযোগে ভোট নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ব্যালট পেপারের নকশায় উপরের অংশে তিনটি দলের প্রতীক এবং ভাঁজের নিচে বিএনপির প্রতীক রাখা হয়েছে, যা ইচ্ছাকৃত, অন্যায্য ও নৈতিকতাবিরোধী। এ বিষয়ে দ্রুত সংশোধনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে ব্যালট পুনর্মুদ্রণের জন্য এখনও সময় রয়েছে।
তিনি আরও জানান, বাহরাইন ও ওমানসহ কয়েকটি দেশে ব্যক্তিগত বাসায় ডাকযোগে ভোটের ব্যালট পেপার খোলা ও ব্যবহারের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ঘটনায় ভোটের গোপনীয়তা ও নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ব্যালট পেপার সম্পূর্ণ গোপনীয়, ভোটার ছাড়া অন্য কারও তা দেখার সুযোগ নেই। অথচ টেবিলের ওপর স্তূপ করে ব্যালট ব্যবহারের দৃশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

নজরুল ইসলাম খান বলেন, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে এবং কমিশন জানিয়েছে, অন্তত একটি ঘটনার সত্যতা বাংলাদেশ দূতাবাস নিশ্চিত করেছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দুটি ঘটনা সামনে এলে আরও অনেক দেশে এমন অনিয়ম থাকতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব অনিয়ম চলতে থাকলে ডাকযোগে ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন এবং তার গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে পরবর্তী সরকার ভোট কারচুপির অভিযোগের মুখে না পড়ে। এজন্য সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তা না হলে ভবিষ্যতে ডাকযোগে ভোট ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















