বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অপ্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। তিনি বলেছেন, প্রকৃত প্রয়োজন যাচাই না করেই বড় পরিসরে জমি অধিগ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে, যা একদিকে জনসম্পদের অপচয় ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকায় ঝুঁকি তৈরি করছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। উপদেষ্টার মতে, তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ হয়, ক্ষতিপূরণ দিতে দেরি হয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হয় এবং খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

জমির সংকট ও বাস্তবতার কথা তুলে ধরে আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে বড় প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই জমি অধিগ্রহণের আগে যথাযথ মূল্যায়ন ও সতর্কতা জরুরি। তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও অধিগ্রহণ কর্তৃপক্ষের আগ্রাসী মানসিকতারও সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, অনেক সময় মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জমির প্রকৃত চাহিদা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সংশ্লিষ্ট সচিবরাই উপস্থিত থাকেন না। কোথাও আবার রাস্তার পাশে একটি অতিথিশালা নির্মাণের জন্য দেড় থেকে দুই একর জমি চাওয়া হয়, যা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।
ভূমি উপদেষ্টা আরও জানান, কৃষিজমি ও বসতভিটা অধিগ্রহণ এড়াতে ভূমি মন্ত্রণালয় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে পুরো ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বসতভিটা অধিগ্রহণ নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। এটি শুধু অর্থের বিষয় নয়, মানুষের বংশপরম্পরায় গড়ে ওঠা জমির সঙ্গে আবেগ ও স্মৃতি জড়িয়ে থাকে, সেই মূল্যও সম্মান করতে হবে।
সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণায় বলা হয়, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থাকে সহজ ও আধুনিক করতে বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এই গবেষণায় সহায়তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ও কোরিয়া বিশ্বব্যাংক অংশীদারিত্ব তহবিল। গবেষণায় পরিবেশ ও ভৌগোলিক তথ্য সেবা কেন্দ্র যুক্ত ছিল।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কার্যক্রম ব্যবস্থাপক গেইল মার্টিন বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতার কারণে বাংলাদেশে ছয়টি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সম্মিলিতভাবে প্রায় নয় দশমিক সাত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থায় জনবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি রয়েছে। দীর্ঘসূত্রতা সামাজিক উত্তেজনা বাড়ায়। আধুনিক ও কার্যকর ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। চাহিদাসম্পন্ন সংস্থা ও জেলা প্রশাসন, বিশেষ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে ক্ষমতায়িত করা গেলে অনেক জটিলতা দূর করা সম্ভব।
গবেষণা দলের নেতা হাফিজা খাতুন বলেন, জমি অধিগ্রহণ হওয়া উচিত শেষ বিকল্প। অনেক প্রকল্প সরাসরি জমি ক্রয়, ইজারা, ভাড়া, বিনিময়, অস্থায়ী ব্যবহার কিংবা জমি একত্রিকরণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায়। তিনি জানান, সবচেয়ে বেশি দেরি হয় জমির ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে। আইন অনুযায়ী জমি দখলের আগে ক্ষতিপূরণ পরিশোধের কথা থাকলেও মালিকানা বিরোধ, দখল সংক্রান্ত জটিলতা এসব প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে, ফলে খরচ বাড়ে এবং প্রকল্প দীর্ঘায়িত হয়।
সমাপনী বক্তব্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের মানসম্মত কার্যপ্রণালী তৈরি করা হচ্ছে এবং ভূমি সংক্রান্ত সব সেবা ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দেরি কমে। তিনি এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















