কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আধিপত্য ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এবার পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে মহাকাশে পৌঁছেছে। সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কক্ষপথে ডেটা সেন্টার গড়ার দৌড়ে নেমেছে দুই দেশের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। লক্ষ্য একটাই—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল গণনাশক্তির চাহিদা মেটানো এবং নিম্ন কক্ষপথে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
মহাকাশ কেন নতুন যুদ্ধক্ষেত্র
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ও ডেটা প্রক্রিয়াকরণের চাপ দ্রুত বাড়ছে। পৃথিবীতে স্থাপিত ডেটা সেন্টারগুলো এই চাপ সামাল দিতে গিয়ে শক্তি সংকট ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে মহাকাশে সৌরশক্তি নির্ভর ডেটা সেন্টার ভবিষ্যতের সমাধান হিসেবে দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

চীনের এগিয়ে থাকা পদক্ষেপ
এই প্রতিযোগিতায় প্রাথমিকভাবে এগিয়ে আছে চীন। দেশটির নবীন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এডিএ স্পেস এবং আলিবাবা সমর্থিত ঝেজিয়াং গবেষণাগার গত মে মাসে বারোটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে। এসব উপগ্রহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গণনার উপযোগী যন্ত্র বসানো হয়েছে, যা লেজা ভিত্তিক অপটিক্যাল যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। সম্মিলিতভাবে এগুলোর গণনাশক্তি একটি সুপার কম্পিউটারের সমতুল্য।
এই উদ্যোগটি থ্রি বডি কম্পিউটিং কন্সটেলেশন প্রকল্পের প্রথম ধাপ। ভবিষ্যতে প্রায় দুই হাজার আটশো উপগ্রহের মাধ্যমে এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে, যা আবহাওয়া পূর্বাভাস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরক্ষা খাতে তাৎক্ষণিক তথ্য বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হবে।
এ ছাড়া বেইজিং শহরের নেতৃত্বে আরেকটি প্রকল্পে দিন ও রাতের সীমান্তঘেঁষা সূর্য সমলয় কক্ষপথে বড় আকারের কেন্দ্রীভূত গণনা কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার কথা দুই হাজার সাতাশ সালে, যেখানে লক্ষ্য এক কুইন্টিলিয়ন অপারেশন ক্ষমতা অর্জন।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ পরিকল্পনা
চীনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও পিছিয়ে নেই। গুগল তাদের সানক্যাচার প্রকল্পের আওতায় দুই হাজার সাতাশ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ সংবলিত উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করেছে। এসব উপগ্রহ সূর্য সমলয় কক্ষপথে স্থাপন করা হবে, যাতে সারাক্ষণ সূর্যের আলো পাওয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদে এই নেটওয়ার্ক পৃথিবীর বৃহৎ ডেটা সেন্টারের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে নবীন মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্টার ক্লাউড ইতিমধ্যে একটি পরীক্ষামূলক উপগ্রহ পাঠিয়েছে, যেখানে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ ব্যবহার করে মহাকাশে ভাষা মডেল প্রশিক্ষণ ও চিত্র বিশ্লেষণ চালানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে হাজার হাজার উপগ্রহ নিয়ে পাঁচ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি মহাকাশ ডেটা সেন্টার গড়ার স্বপ্ন দেখছে।

প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি
মহাকাশে ডেটা সেন্টার গড়ার পথে বড় বাধা তাপ নিয়ন্ত্রণ। শূন্যে তাপ অপসারণ কঠিন হওয়ায় কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায় অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি লাগবে, যা খরচ ও ওজন বাড়ায়। পাশাপাশি মহাকাশ বিকিরণে চিপ ক্ষতির ঝুঁকিও রয়েছে। এ কারণে বহু উপগ্রহের সমন্বয়ে গঠিত নেটওয়ার্ক পদ্ধতিই আপাতত বেশি কার্যকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে নিরাপত্তা ঝুঁকিও কম নয়। বৈরী দেশের হামলার আশঙ্কায় মহাকাশ ডেটা সেন্টারের পাশাপাশি পৃথিবীতে বিকল্প ব্যবস্থা রাখার বিষয়টি অপরিহার্য হয়ে উঠছে।
ভবিষ্যতের দিকচিহ্ন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই মহাকাশ প্রতিযোগিতা শুধু প্রযুক্তির নয়, বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সূর্যের শক্তিতে ভর করে কক্ষপথে ডেটা প্রক্রিয়াকরণের যুগ শুরু হলে পৃথিবীর প্রযুক্তি মানচিত্রই বদলে যেতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















