জাপানের জ্বালানি বাজার বিষয়ক তথ্যসেবা প্রতিষ্ঠান জাপান এনআরজি–এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরি গ্রুপের সভাপতি ইউরিয়ি হাম্বার।
নাট্যকার আন্তন চেখভের নামে একটি নীতির কথা প্রচলিত আছে। কোনো নাটকের প্রথম অঙ্কে যদি একটি বন্দুক দেখানো হয়, তবে শেষ অঙ্কে সেটির গুলি ছোড়া হবেই; নইলে সেটি অপ্রাসঙ্গিক এবং বাদ দেওয়াই উচিত। জ্বালানি নীতির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র যদি পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করে, শেষ পর্যন্ত সেগুলো চালু হবেই।
জার্মানি ও তাইওয়ানকে প্রায়ই ব্যতিক্রম হিসেবে তুলে ধরা হয়। দুই দেশই কয়েক দশক ব্যবহারের পর তাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করেছে। কিন্তু কোনো দেশই পুরোপুরি সেগুলো অপসারণ করতে পারেনি, আর উভয় দেশেই জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুতের দাম ও ভূরাজনীতি সামনে আসতেই পুনরারম্ভ নিয়ে জনআলোচনা আবার জেগে উঠেছে। একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর প্রস্তুতি নেওয়া জাপান আসলে একই যাত্রাপথে কিছুটা এগিয়ে আছে মাত্র।
ফুকুশিমা দাইইচিতে ভূমিকম্প ও সুনামিজনিত ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রায় পনেরো বছর পর জাপান আগামী ২০ জানুয়ারি কাশিওয়াজাকি–কারিওয়া পারমাণবিক কেন্দ্রের ইউনিটগুলো আবার চালু করতে যাচ্ছে। সরকারি ব্যাখ্যাটি পরিচিত। তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির মুখে থাকা দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরারম্ভ হলে বিদ্যুৎ বিল কমানো সম্ভব, যেখানে গৃহস্থালি ও ব্যবসায়িক খরচ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
এই যুক্তি সঠিক। তবে এক বা দুই বছর আগেও এটি সমানভাবে সঠিক ছিল। মূল্যস্ফীতি ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং এখনো প্রায় তিন শতাংশে রয়েছে। জাপানের শক্তিশালী পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা আট বছরেরও বেশি আগে কাশিওয়াজাকি–কারিওয়া পুনরারম্ভের অনুমোদন দিয়েছিল। বিলম্বের কারণ কেবল নিয়ন্ত্রক সতর্কতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, যদিও জাপানে কিছু চুল্লির পর্যালোচনা ত্রয়োদশ বছরে গড়িয়েছে।

আসল ব্যাখ্যাটি নানা সীমাবদ্ধতার জটিল ধাঁধা। কিছু প্রযুক্তিগত, কিছু রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রতীকী। ফুকুশিমার পাঁচ বছর পর প্রথম যেসব চুল্লি চালু হয়েছিল, সেগুলো ছিল টোকিও ও দুর্ঘটনাস্থল থেকে সবচেয়ে দূরের কেন্দ্রগুলোতে। পারমাণবিক শক্তি নিয়ে জনরোষ ও অবিশ্বাস দুর্ঘটনার প্রায় এক দশক পর ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ২০২১ সালের মার্চে মাত্র চারটি চুল্লি চালু ছিল। পাঁচ বছর পর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চৌদ্দে। ফিরে আসার পথটি ছিল ধীর, সচেতন এবং নীতির মতোই মানসিকতার দ্বারা প্রভাবিত।
কাশিওয়াজাকি–কারিওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, নিগাতা প্রদেশ, ২০ নভেম্বর ২০২৫।
ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ, ৮ মার্চ ২০২৫।
তবে এগুলো জাপানের পারমাণবিক পুনরুজ্জীবনের কেবল কীভাবে অংশ। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কেন এটি আদৌ ঘটছে।
প্রথমে মৌলিক বিষয়গুলো দেখা যাক। বড় আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যেগুলোতে তিন বছরে একবার জ্বালানি ভরতে হয়, মাসিক কয়লা, তেল বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল কেন্দ্রগুলোর তুলনায় সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও পরিবহন ঝুঁকির প্রভাবও এতে অনেক কম, যা জাপানের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ায়। একই সঙ্গে পারমাণবিক কেন্দ্র সমপরিমাণ সৌর বা বায়ু স্থাপনার তুলনায় অনেক বেশি বিদ্যুৎ দেয় এবং আবহাওয়া নির্বিশেষে নিরবচ্ছিন্নভাবে তা সরবরাহ করে। বাড়তি সুবিধা হিসেবে এগুলো কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন করে না, ফলে নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে জাপানের অগ্রগতি হয়।
এরপর আসে হিসাবনিকাশের বাস্তবতা। বন্ধ থাকা একটি পারমাণবিক কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিবছরই কোটি কোটি ডলার খরচ হয়—নিরাপত্তা পরীক্ষা, যন্ত্রপাতি উন্নয়ন ও জনবল ধরে রাখতে। কোনো কেন্দ্র অপসারণের পথে গেলে তা বহু দশকের দায়ে পরিণত হয়। আর কোনো চুল্লির বয়স যদি বিশ বছরের কম হয়, তবে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে বড় অঙ্কের হিসাবগত ক্ষতিও স্বীকার করতে হয়। বিপরীতে, একটি বড় চালু চুল্লি বছরে প্রায় একশ বিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় তেষট্টি কোটি ডলার মুনাফা দিতে পারে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কাশিওয়াজাকি–কারিওয়ার মালিক টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি কার্যত জনগণের মালিকানাধীন। জাপানি রাষ্ট্রের হাতে এর ছাপ্পান্ন শতাংশ শেয়ার রয়েছে এবং প্রতিটি নাগরিক ইতিমধ্যে ফুকুশিমা পরিষ্কার ও ক্ষতিপূরণ ব্যয়ে প্রায় এক লাখ ইয়েন করে দিয়েছেন। প্রতি বছর চুল্লিগুলো বন্ধ থাকলে টেপকোকে আয় ছাড়াই বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত করদাতাদের ওপরই পড়ে।
যদি জাপান সব পারমাণবিক উৎপাদন স্থগিত রেখে পুরোপুরি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে, তবে ব্যবসার জন্য বিদ্যুতের দাম প্রায় ত্রিশ শতাংশ এবং গৃহস্থালির জন্য প্রায় বিশ শতাংশ বেড়ে যাবে। এটি কল্পনাভিত্তিক নয়। ফুকুশিমার পরের বছরগুলোতে চুল্লি বন্ধ হওয়া এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা আমদানি বাড়ায় ঠিক এটাই ঘটেছিল।
পুরোপুরি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পারমাণবিক শক্তির বিকল্প খুঁজতেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। খুবই প্রাথমিক এক হিসাব অনুযায়ী, সৌর ও বায়ু শক্তির সমান মিশ্রণ গড়ে তুলতে এবং অনিয়মিত উৎপাদন সামাল দিতে ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বসাতে প্রয়োজন হতে পারে পঁয়ত্রিশ ট্রিলিয়ন থেকে ষাট ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ। এই হিসাব প্রায় একশ গিগাওয়াট অতিরিক্ত নবায়নযোগ্য সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে এবং অনিবার্য গ্রিড উন্নয়নের ব্যয় এতে ধরা নেই। মৌসুমি অমিল, স্থানীয় অংশীজনদের ক্ষতিপূরণ, অর্থায়নের খরচ ও পরিচালন ব্যয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

প্রসঙ্গত, জাপানের মন্ত্রিসভা সদ্য ২০২৬ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড একশ বাইশ ট্রিলিয়ন ইয়েন বাজেট অনুমোদন করেছে, যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় হবে।
এত বড় বিনিয়োগ বহন করার সামর্থ্য থাকলেও আরেকটি সীমাবদ্ধতা দ্রুত সামনে আসে। সৌর প্যানেলের প্রায় পুরো বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের আধিপত্য, ব্যাটারি সংরক্ষণ উৎপাদনের প্রায় সত্তর শতাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে, বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বায়ু টারবাইন তারা স্থাপন করে এবং বিদ্যুৎ গ্রিড সরঞ্জামের বড় সরবরাহকারীও তারা। আজকের বাজারে পারমাণবিক শক্তির বদলে পুরোপুরি নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিলে জাপানের বার্ষিক জাতীয় বাজেটের এক তৃতীয়াংশ বা তার বেশি বিদেশে, মূলত চীনে, পাঠাতে হবে। একই সঙ্গে জাপানি উৎপাদকরা চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় কাঠামোগতভাবে বেশি বিদ্যুৎমূল্যের ফাঁদে পড়বে।
এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জাপানের সৌর কৌশলকে পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তির দিকে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন, যেখানে দেশীয় সরবরাহকারীদের এখনও টিকে থাকার সুযোগ আছে। একই কারণে জ্বালানি কর্মকর্তারা চীনা ইউনিটনির্ভর ব্যাটারি প্রকল্পে ভর্তুকি সীমিত করছেন।
অবশিষ্ট বিকল্প, অর্থাৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার ওপর আরও নির্ভরতা, সস্তাও নয়, টেকসইও নয়। এতে জ্বালানি নিশ্চিত করতে প্রতিবছর অতিরিক্ত তিন থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিদেশে পাঠাতে হবে এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় ব্যয় করতে হবে। একই সঙ্গে জাপান আরও গভীরভাবে অস্থির বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ঝুঁকিতে পড়বে।
এভাবেই আমরা দেয়ালে ঝোলানো সেই বন্দুকের কথায় ফিরে আসি। জাপান একা নয়। জার্মানি ও তাইওয়ান দেখেছে, চুল্লি বন্ধ করা যতটা সহজ, সেগুলো ভেঙে ফেলা এবং তার বিকল্প জোগান তৈরি করা ততটা নয়। জাপানের ক্ষেত্রে এখনো উনিশ গিগাওয়াট পারমাণবিক সক্ষমতা বন্ধ পড়ে আছে এবং আরও চার গিগাওয়াট নির্মাণাধীন। এই কেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগ চালু থাকলে দেশের মোট বিদ্যুতের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি সরবরাহ দিতে পারত।
এর কোনোটিই পারমাণবিক শক্তির ঝুঁকি অস্বীকার করার জন্য নয়। বর্জ্য নিষ্পত্তির বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত, আর ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে জনমনে উদ্বেগ স্বাভাবিক।
তবু প্রশ্নটি আর এই নয় যে জাপান চুল্লি চালু করবে কি না। প্রশ্ন হলো, বিকল্প আছে বলে ভান করতে গিয়ে দেশটি তার মূল্য কতটা দিতে রাজি।
ইউরিয়ি হাম্বার 


















