দেশজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর পর পেট্রোল পাম্পগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পাম্প মালিকরা নিরাপত্তা জোরদার ও তেলের সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সরকার একদিকে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকার কথা বলছে, অন্যদিকে সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রির নির্দেশনা দিচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এর ফলে বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ লাইন, বিশৃঙ্খলা এমনকি হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করেছেন মালিকরা। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তারা পাম্প পরিচালনা বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন বলেও সতর্ক করেছেন।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর সিদ্বেশ্বরী সার্কুলার রোডের একটি হোটেলে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বাংলাদেশ পেট্রোলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক।
রেশনিং ব্যবস্থা ও জনমনে বিভ্রান্তি
সংবাদ সম্মেলনে নাজমুল হক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতার কারণে সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। পাম্প মালিকরা সরকারের নির্দেশনা মেনে তা বাস্তবায়ন করছেন।
তবে একই সঙ্গে সরকার পর্যাপ্ত তেল মজুত থাকার কথা বললেও সীমা নির্ধারণ করে তেল সরবরাহের নির্দেশনা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বিধা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এতে অনেকেই ভবিষ্যতের আশঙ্কায় গাড়ির ট্যাংক পূর্ণ করে রাখার চেষ্টা করছেন।
গুজব ও অতিরিক্ত ভিড়
মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে’—এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ পাম্পে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ফলে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে এবং পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
পাম্পে হামলা ও কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় উত্তেজনা বাড়ছে। কোথাও কোথাও পাম্পে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জে এক পাম্প কর্মচারীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়।
পাম্প মালিকদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। আবার নির্দেশনা অনুযায়ী ২০২৫ সালের বিক্রির তুলনায় ১০ শতাংশ কম তেল দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার চেয়েও কম সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। অথচ এ সময়ে যানবাহনের সংখ্যা ও তেলের ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
রাইড শেয়ার মোটরসাইকেলে তেল সরবরাহ নিয়ে আপত্তি
সংবাদ সম্মেলনে রাইড শেয়ার মোটরসাইকেলের জন্য নির্দিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করে ৫ লিটার অকটেন দেওয়ার সরকারি নির্দেশনার সমালোচনা করা হয়। পাম্প মালিকদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগবে। এতে লাইনে দাঁড়ানো অন্য গ্রাহকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে এবং বিশৃঙ্খলা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মোবাইল কোর্ট নিয়ে ক্ষোভ
পাম্প মালিকদের অভিযোগ, মনিটরিংয়ের নামে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে অভিযান চালানো হলে তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। তাদের মতে, কোম্পানি থেকে সরবরাহ করা তেলের পরিমাণ ভূগর্ভস্থ ট্যাংক ও ডিসপেনসারের মিটার রিডিং যাচাই করলেই সহজেই অনিয়ম আছে কি না বোঝা সম্ভব।
কৃষি ও জেনারেটর খাতে সমস্যা
পাম্প মালিকরা বলেন, শহরের বহুতল ভবনের জেনারেটর ও গ্রামাঞ্চলের সেচ পাম্পের জন্য আলাদা নির্দেশনা না থাকায় পাম্পগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক কৃষক সেচ পাম্প চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না বলেও তারা দাবি করেন।
পাম্প মালিকদের আট দফা দাবি
বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে আট দফা দাবি জানিয়েছে পাম্প মালিকদের সংগঠন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে পুলিশের পাশাপাশি সেনা সদস্য মোতায়েন করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মোটরসাইকেলে তেল সরবরাহে কোনো বিভাজন না রাখা, বড় ও ছোট সব পাম্পে সমানভাবে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিপণন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানো।
এ ছাড়া এজেন্সি, পিক পয়েন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে তেল সরবরাহ চালু করা, মনিটরিংয়ের নামে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সামাজিকভাবে হেয় করা বন্ধ করা, কোনো পাম্প বা নৌযানে অবৈধ মজুত ধরা পড়লে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং তেল ডিপোগুলোতে বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধ করার দাবিও জানানো হয়েছে।
সংগঠনের সভাপতি বলেন, এসব দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন করে পাম্প মালিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হলে তারা পাম্প পরিচালনা বন্ধ রাখতে বাধ্য হতে পারেন। এতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার দায় সরকারের ওপরই বর্তাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















