বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি নেতাদের মধ্যে অজেয়তার এক ধরনের ভাব লক্ষ্য করা কঠিন নয়। তাঁদের পক্ষে এমন একজন প্রেসিডেন্টকে পাওয়া গেছে, যিনি তাঁদের স্বাধীনতার ওপর যেকোনো সীমাবদ্ধতাকে সরাসরি আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে আঘাত হিসেবে দেখাতে প্রস্তুত।
এই প্রযুক্তি নেতাদের একমুখী উন্মাদনাই প্রায়ই অগ্রগতির চালিকাশক্তি হয়। সরকার যখন হস্তক্ষেপ করতে চায়, তখন ধীরগতির আইনপ্রণেতারা ধনসম্পদ, গণমাধ্যমের প্রভাব, ভৌগোলিক সীমার বাইরে কাজ করার সুবিধা এবং আইন র্যান্ড দ্বারা প্রভাবিত বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দ্রুতগতির প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে পেরে ওঠেন না। ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক কিংবা স্টারলিংকের মতো প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর নতুন পথও খুলে দেয়।
তবু কেউই চিরকাল স্পর্শাতীত থাকে না। গণতান্ত্রিক ইতিহাস মূলত শক্তিশালী ব্যক্তিদের লাগাম টানার ধারাবাহিকতা—রাজা থেকে শুরু করে করপোরেট ধনকুবের পর্যন্ত। এসব লড়াইয়ে পূর্ণ বিজয় খুব কমই আসে, তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়। এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি মোড়, যা জনগণ ও রাজনীতিকদের একসঙ্গে নাড়িয়ে দেয়।

সম্প্রতি প্রকাশ পায়, ধনকুবের ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট গ্রোক প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের ছবিকে ডিজিটালি নগ্ন করে যৌনচিত্র তৈরি করছিল। এমন পরিস্থিতিতে সহজ ও স্বাভাবিক পদক্ষেপ ছিল ক্ষমা চাওয়া এবং সমস্যার সমাধান করা। এখন মাস্ক কিছুটা পিছু হটতে দেখা গেলেও শুরুতে তাঁর অসংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া আইনপ্রণেতাদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। তাঁর প্রথম প্রবৃত্তি ছিল এই টুলকে প্রিমিয়াম ফিচারে পরিণত করা এবং ‘সেন্সরশিপের যেকোনো অজুহাতের’ বিরুদ্ধে সুর চড়ানো।
এটি কেবল এক্স বা গ্রোকের সমস্যা নয়। অন্যান্য এআই মডেলেও প্রশ্নবিদ্ধ টুল রয়েছে এবং সেগুলোর চাহিদা আসে ব্যবহারকারীদের দিক থেকেই। তবে এটি একটি বড় বিষয় সামনে আনে। এই নগ্নকরণ টুলটি কোনো ত্রুটি ছিল না, ছিল পরিকল্পিত বৈশিষ্ট্য। মাস্ক নিজেই গ্রোকের জন্য ‘স্পাইসি’ মোড তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন।
নাগরিকেরা এখন দেখছেন, সামাজিক নিয়মের সীমানা নির্ধারিত হচ্ছে জবাবদিহিহীন ধনকুবেরদের খেয়ালখুশির ভিত্তিতে। কিছু দেশ, যেমন ব্রিটেন, অর্থনৈতিক কারণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, আসন্ন এআই বিপ্লবে নিজেদের লাডাইট হিসেবে দেখাতে চায় না। তবে অনেক দেশ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নাগরিকেরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ আশা করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা শিথিল করায় এই চাপ আরও বেড়েছে।
গ্রোকের ঘটনা ব্রিটেন, ইউরোপ থেকে শুরু করে ভারত পর্যন্ত আইনপ্রণেতাদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। মাস্ক যদি শুরুতেই সহজ পথ বেছে নিতেন, তাহলে এটি সামান্য ঝড়েই থেমে যেত। কিন্তু তাঁর পিছু হটা বাধ্যতামূলক হওয়ায় ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারের প্রতিটি দৃঢ় অবস্থান অন্যদের সাহস জোগায়। শিশুদের নিরাপত্তা হলো সবচেয়ে সহজ এবং প্রথম সীমারেখা। ব্রিটেনে অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট জনপ্রিয় হয়েছে মূলত শিশুদের ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে রক্ষার প্রতিশ্রুতির কারণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেন্সরশিপের বিরোধিতা করা কনজারভেটিভ পার্টিও গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার অনুকরণে ১৬ বছরের নিচে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অঙ্গীকার করেছে।
বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুর মধ্যে স্পষ্ট বিভাজনকে আদর্শগতভাবে গ্রহণযোগ্য বলা হচ্ছে। কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক বলেন, প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের দেখভাল করতে পারে, কিন্তু শিশুদের সুরক্ষা জরুরি। তবে ভুল তথ্য ও ডিপফেকের মতো অন্যান্য উদ্বেগের মধ্যে এই বিভাজন কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মাস্ক পুরোপুরি ভুল নন যে তাঁকে সেন্সর করতে চাওয়া লোকজন আছে। তবে গ্রোককে ঘিরে বিতর্কটি আসলে মুক্তবাক্যের প্রশ্ন নয়। বরং উদার গণতান্ত্রিক সরকারগুলোকে অস্থিতিশীল করতে নিজের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের কারণেই তাঁর প্রতি বিরাগ আরও বেড়েছে। এখনো পর্যন্ত মন্ত্রীরা এক্স নিষিদ্ধ করার পথ এড়িয়ে চলেছেন, কারণ মুক্তবাক্যের যুক্তি, বিকল্প পথের অস্তিত্ব এবং এই বিষাক্ত গোষ্ঠীগুলো অন্যত্রও আশ্রয় নিতে পারবে—এই বাস্তবতা তাঁরা মানেন।

বিশ্বের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাগুলো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইটগুলো আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। গণতান্ত্রিক দেশগুলো এমন কঠোর পদক্ষেপ থেকে সরে থাকে। তবে বাস্তবতা হলো, অনেক ভোটারই নাগরিক স্বাধীনতার প্রবল সমর্থকদের ধারণার চেয়ে নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণের পক্ষে বেশি সহানুভূতিশীল। নিষেধাজ্ঞা না এলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এমন বিপুল অঙ্কের জরিমানা আরোপের ক্ষমতা নিচ্ছে, যা কোম্পানিগুলোকে হয় মানতে, নয়তো সেবা সীমিত করতে বাধ্য করবে।
ট্রাম্পসমর্থিত প্রযুক্তি জায়ান্টদের মোকাবিলা করা সরকারগুলোর জন্য ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু এটাও স্পষ্ট, সমাজের নিয়ম যদি প্রযুক্তি অলিগার্কদের ব্যতিক্রমী নৈতিকতায় গড়ে ওঠে, তবে জনগণ তা বেশিদিন সহ্য করবে না। একসময় প্রশংসিত ইলন মাস্ক এখন প্রযুক্তি নেতাদের জন্য এক বিপর্যয়কর প্রতিনিধি হয়ে উঠেছেন।
এটি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষয় নয়। অ্যাপল ও মেটা প্রান্ত থেকে প্রান্তে এনক্রিপশন নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের মুখোমুখি হয়েছে, যা মন্ত্রীরা মনে করেন সন্ত্রাসী ও অপরাধী নেটওয়ার্ককে সহায়তা করে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো নিজেদের অজেয় মনে করা। আজ তারা নিরাপদ বোধ করতে পারে, কিন্তু ম্যাগা রিপাবলিকানদের অবিচল সমর্থন চিরস্থায়ী—এমন ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাস্ট ভাঙার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সবচেয়ে শক্তিশালী একচেটিয়া শক্তিও শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে পারে না।

রবার্ট শ্রিমসলি 


















