প্রায় আট বছর পর নতুন পূর্ণদৈর্ঘ্যের অ্যালবাম নিয়ে ফিরেছেন মার্কিন র্যাপ তারকা এএসএপি রকি। নামটি যেমন ইঙ্গিত দেয়, তেমনি সঙ্গীতেও ছড়িয়ে আছে বৈপরীত্য, দোলাচল আর ঘন ঘন মুড বদলের ছাপ। একদিকে তীব্র, আক্রমণাত্মক হিপহপ, অন্যদিকে ধোঁয়াটে সোল আর আরঅ্যান্ডবি। কিন্তু এত বৈচিত্র্যের মাঝেও প্রশ্ন থেকে যায়—এই অ্যালবাম আসলে কতটা গভীর কিছু বলতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে তারকাখ্যাতির উত্থান
দুই হাজারের শেষ ভাগ আর দুই হাজার দশকের শুরুর দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য হয়ে উঠেছিল পরীক্ষাগার। অনলাইনে গান আবিষ্কার আর টাম্বলার ঘিরে গড়ে ওঠা কমিউনিটি অনেক শিল্পী গোষ্ঠীকে পরিচিত করে তোলে। লস অ্যাঞ্জেলেসে যেমন অড ফিউচার গোষ্ঠী থেকে উঠে এসেছিলেন টাইলার দ্য ক্রিয়েটর, আর্ল সোয়েট শার্ট ও ফ্র্যাঙ্ক ওশেন, ঠিক তেমনি নিউইয়র্কে এএসপি মবের মধ্য থেকে সবচেয়ে আলোচিত নাম হয়ে ওঠেন হারলেমে জন্ম নেওয়া রাকিম মেয়ার্স, যিনি পরিচিত এএসএপি রকি নামে।
টাম্বলারের ভিজ্যুয়াল সমৃদ্ধ তা আর সহজে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই দলটি গড়ে তোলে এক ধরনের রহস্যময় নান্দনিকতা। তার ফল দ্রুতই মেলে। দুই হাজার তেরো সালে রকির প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের প্রথম সপ্তাহেই শীর্ষ চার্টে উঠে আসে। পরের দুই অ্যালবাম ও সাফল্য পায়।
দীর্ঘ বিরতির পেছনের গল্প
গানের বাইরে রকির জীবন ছিল নানা ব্যস্ততায় ভরা। সিনেমায় অভিনয়, সৃজনশীল সংস্থা গড়া, ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ, নিজের মদ্যপ পানীয়ের ব্র্যান্ড, আর পপতারকা রিহানার সঙ্গে সম্পর্ক ও সন্তান। এর সঙ্গে যোগ হয় আইনি জটিলতা। সব মিলিয়ে নতুন অ্যালবাম আসতে প্রায় আট বছর লেগে যায়। অবশেষে প্রকাশ পায় চতুর্থ অ্যালবাম।
শব্দ আর মুডের প্রদর্শনী
শুরু থেকেই রকিকে বেশি প্রশংসা করা হয়েছে তার রুচি আর নান্দনিক বোধের জন্য, সরাসরি গীতিকৌশলের জন্য নয়। নতুন অ্যালবামেও সেটিই স্পষ্ট। বিভিন্ন ঘরানার গান থাকলেও সাজানো হয়েছে এমনভাবে, যাতে কিছুটা সময় ধরে একই আবহ বজায় থাকে। শুরুতে রয়েছে খোঁচা দেওয়া বিট আর বিকৃত শব্দ, যেখানে রকি কখনো বিরক্ত, কখনো ক্ষুব্ধ। কিছু গান শক্তি আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, যেন শরীরচর্চার সময়ের সাউন্ডট্র্যাক।
হঠাৎ করেই বদলে যায় আবহ। তীব্রতা ছেড়ে ঢুকে পড়ে নরম আরঅ্যান্ডবি আর সাইকেডেলিক সোল। সুর আর প্রযোজনায় বৈচিত্র্য থাকলেও কথায় তেমন গভীর টান নেই। মনে রাখার মতো লাইন বা তীক্ষ্ণ ছবি খুব একটা মেলে না। তবে শব্দের স্তরবিন্যাস সহজেই মনোযোগ ধরে রাখে।

দোলাচলের ভেতরেই অ্যালবামের পরিচয়
এই অ্যালবামের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার দোলাচল। একদিকে শিল্পঘেঁষা, কঠিন শব্দের গান, অন্যদিকে স্বপ্নালু, হালকা মেলানকোলির ট্র্যাক। কিছু গানে ভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠ যুক্ত হয়ে নতুন মাত্রা এনে দেয়। কোথাও জ্যাজের ছোঁয়া, কোথাও বিকল্প রকের স্মৃতি। পুরো অ্যালবাম জুড়ে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে, যা একসঙ্গে আকর্ষণীয়ও, আবার বিভ্রান্তিকরও।
শেষ গানেই ধরা পড়ে সীমাবদ্ধতা
অ্যালবামের শেষ গানটি সামাজিক সমস্যা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করে। স্কুলে সহিংসতা, প্রযুক্তি আসক্তি, পরিবেশ সংকট—সবই ছুঁয়ে যেতে চায়। কিন্তু কথাগুলো শোনায় কৃত্রিম আর সরলীকৃত। অতিথি শিল্পীর কণ্ঠ মায়াবী হলেও গানটি নিজের সম্ভাবনা পূরণ করতে পারে না। এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে অ্যালবামের বড় দুর্বলতা। এত শব্দ, এত মুড, এত পথ ঘুরেও রকির বলার মতো গভীর বক্তব্য খুব একটা নেই।

মোটের ওপর নতুন অ্যালবামটি শোনার অভিজ্ঞতা হিসেবে পরিপাটি ও ধারাবাহিক। কিছু মুহূর্তে তা রোমাঞ্চ জাগায়, কিছু জায়গায় শুধু আবহ তৈরি করে থেমে যায়। শেষ নোট বাজলে মনে হয়, অনেক কিছু দেখালেও হিসাবটা ঠিক জমে ওঠেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















