যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে ব্যাংকার হওয়া মানে শুধু হিসাবের খাতা সামলানো নয়, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোও। চলতি বছরের শুরুতে ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ব্যাংক প্রাইভাটব্যাংকের প্রধান মিকায়েল বিয়র্নার্ট রাজধানী ও বিভিন্ন শহরের শাখা সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেন। নতুন গ্রাহক আনার জন্য নয়, বরং রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিদ্যুৎহীন মানুষের জন্য কয়েক ঘণ্টার উষ্ণতার ব্যবস্থা করতে।
ব্যাংকিংয়ের কঠিন বাস্তবতা
সুইডেনে জন্ম নেওয়া বিয়র্নার্ট জানেন, যুদ্ধের বাইরে ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ কম নয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই খুচরা ব্যাংক এখন করপোরেট বাজারে প্রবেশ করতে চাইছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার একদিন কমবে, তখন সরকারি বন্ড ও আমানত সনদ থেকে আসা লাভও হ্রাস পাবে। তার ওপর রয়েছে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া এবং ২০২২ সালের পর আরও তিনটি অঞ্চল হারানোর ক্ষতি।

খেলাপি ঋণ কমার চমক
সব প্রতিকূলতার মধ্যেও ইউক্রেনের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমেছে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৯ শতাংশ, এখন তা নেমে এসেছে ২৪ শতাংশে। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায়ও এই হার কম। ইউরোপের গড় মানের চেয়ে অনেক বেশি হলেও এর বড় অংশই যুদ্ধের আগের দুর্নীতিপূর্ণ ব্যাংকিং যুগের উত্তরাধিকার।
প্রাইভাটব্যাংকের পুরোনো বোঝা
দেশের মোট ব্যাংক আমানতের বড় অংশ থাকা প্রাইভাটব্যাংকে খেলাপি ঋণ এখনও বেশি। তবে ২০২২ সালের শুরুতে যেখানে হার ছিল ভয়াবহ, সেখান থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ব্যাংকটির বর্তমান নেতৃত্ব বলছে, পুরোনো মালিকদের সময়কার ঋণ বাদ দিলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার অনেক কম। বিদেশি আদালতের রায়ে ক্ষতিপূরণ আদায় হলে এই হার আরও কমবে।

স্থিতিশীলতার পেছনের শক্তি
প্রাইভাটব্যাংক ও ওশচাদব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা একমত, পশ্চিমা আর্থিক সহায়তা এবং স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকই এই স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। যুদ্ধ রাজনীতিকদেরও বুঝিয়েছে শক্ত ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা। একই সঙ্গে যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ ঋণ পরিশোধে আরও দায়িত্বশীল হয়েছে।
ঋণ ও আমানতের বৈপরীত্য
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় ঋণ দ্রুত বাড়ছে। পরিবার ও ব্যবসায়িক ঋণ দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবুও ব্যাংকগুলোর হাতে আমানত এত বেশি যে তা কাজে লাগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে সরকারকে ঋণ দেওয়াই এখন বড় আয়ের উৎস।

সুশাসন ও আন্তর্জাতিক নজরদারি
আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারিতে ইউক্রেনের ব্যাংকিং সুশাসন শক্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন সদস্য বাধ্যতামূলক এবং শীর্ষ নির্বাহীদের মেয়াদও সীমিত। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বেড়েছে।
জেলেনস্কির জন্য শিক্ষা
যুদ্ধের মাঝেও ব্যাংকিং খাত যেভাবে স্থিতিশীল থেকেছে, তা প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সরকারের জন্য শিক্ষণীয়। অন্য খাতে অতিরিক্ত সরকারি হস্তক্ষেপ দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়িয়েছে। স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মডেল অন্য রাষ্ট্রীয় খাতেও প্রয়োগ করতে পারলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আস্থা আরও বাড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















