চীনের সরকার অবশেষে দেশের ভেতরের ভোক্তা ব্যয় বাড়াতে চায়। কিন্তু বাস্তব চিত্র এখনো খুব আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি বছরের জানুয়ারির মাঝামাঝি প্রকাশিত সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, দুই হাজার পঁচিশ সালে চীনের মোট দেশজ উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি ছিল রপ্তানি। অথচ একই সময়ে পারিবারিক ভোক্তা ব্যয় বেড়েছে মাত্র চার দশমিক দুই শতাংশ, যা সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় স্পষ্টতই কম।
ভোক্তা ব্যয়ের স্থবিরতা
চীনের ভেতরেই প্রশ্ন উঠছে, আসলে এখন কারা খরচ করছে। দেশটির এক জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন ও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন প্রদেশকে ভাগ করা হয়েছে এমন সব শ্রেণিতে, যারা খরচ করতে সাহসী, যারা সন্তুষ্ট, যারা সতর্ক এবং যারা ভীত। এই বিভাজন অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে, কারণ এতে আঞ্চলিক বৈষম্যের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
![]()
আঞ্চলিক আয়ের পার্থক্য
চীনের উত্তরাঞ্চলের ঠান্ডা প্রদেশ হেইলংজিয়াংয়ে মাথাপিছু গড় আয় প্রায় একত্রিশ হাজার ইউয়ান। এর মধ্যে প্রায় পঁচাত্তর শতাংশই খরচ হয়ে যায়। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের তিব্বতে আয়ের পরিমাণ প্রায় একই হলেও ব্যয় হয় মাত্র একষট্টি শতাংশ। এই বৈষম্য দেখায়, আয়ের পরিমাণ সমান হলেও ব্যয়ের প্রবণতা সব অঞ্চলে এক নয়।
কে খরচে এগিয়ে, কে পিছিয়ে
এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো প্রদেশ যত বেশি আয় করে, সাধারণত তারা আয়ের তুলনায় তত কম অংশ খরচ করে। তবে এই নিয়মের বাইরে কিছু ব্যতিক্রমও আছে। দক্ষিণাঞ্চলের গুয়াংডং প্রদেশে মানুষ গড় প্রবণতার তুলনায় বেশি খরচ করে। এর ফলে জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যাশার চেয়ে অতিরিক্ত বিপুল পরিমাণ ভোক্তা ব্যয়ের অবদান আসে এই প্রদেশ থেকে। বিপরীতে শানডং প্রদেশের ব্যয়ের প্রবণতা তুলনামূলক কম হওয়ায় সামগ্রিক ভোক্তা ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আয় বাড়লে খরচ কতটা বাড়ে
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো আয় বাড়লে খরচ কতটা বাড়ছে, সেই প্রশ্ন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় ঝেজিয়াং প্রদেশে আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে সাংহাইয়ের মতো উচ্চ আয়ের অঞ্চলে আয় বাড়লেও অতিরিক্ত খরচ খুব সামান্য। এতে বোঝা যায়, ধনী অঞ্চলের মানুষ নতুন আয়ের বড় অংশ সঞ্চয়েই রেখে দিচ্ছে।

কেন কম খরচ করছে মানুষ
বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব অঞ্চলে মানুষের প্রাথমিক আয় বেশি, সেখানে অতিরিক্ত আয় খরচ করার আগ্রহ কম। শহরকেন্দ্রিক ও উচ্চ আয়ের এলাকায় এই প্রবণতা স্পষ্ট। আবার যেসব প্রদেশে বেকার ভাতা বা সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় বেশি মানুষ রয়েছে, সেখানে আয় বাড়লে খরচ করার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি যেসব অঞ্চলে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা বেশি, সেখানে অতিরিক্ত ব্যয়ের আগ্রহ কমে যায়।
সরকারের করণীয় কোথায়
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের নীতিনির্ধারকদের নজর দেওয়া উচিত কম আয়ের ও গ্রামভিত্তিক জনসংখ্যা বেশি এমন এলাকায়। সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা, শিশু ও বৃদ্ধদের দেখভালের আর্থিক চাপ কমানো এবং গ্রামীণ আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে ভোক্তা ব্যয় বাড়তে পারে।
তবু লক্ষ্য পূরণ কঠিন
এত কিছুর পরও দুই হাজার ছাব্বিশ সালে চীনের প্রায় পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ সহজ হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ফলে সরকারকে আরও বড় ধরনের প্রণোদনা দিতে হতে পারে। যদি সরকারকেও খরচের সাহসের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, তাহলে চীনের সরকারের এখন সাহস করে উদ্দীপনা দেওয়ার সময় এসেছে বলেই মত বিশ্লেষকদের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















