০৭:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
বয়কট গুঞ্জনের মধ্যেই টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করল পাকিস্তান চরম তাপের নাটক পেরিয়ে সিনারের প্রত্যাবর্তন, জোকোভিচের চারশো জয়ের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় বাংলাদেশের বদলে স্কটল্যান্ড, আইসিসির সিদ্ধান্তে ক্ষোভ আফ্রিদি ও গিলেস্পির গণভোটে ‘না’ বললেই স্বৈরাচারের দোসর, আর ‘হ্যাঁ’ প্রচার মানেই নাৎসিবাদের সঙ্গী: জিএম কাদের বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার উসকানি, নয়াদিল্লীতে শেখ হাসিনার বক্তব্যে বিস্ময় ও ক্ষোভ ঢাকা জুড়ে বিবিসির কিংবদন্তি সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই বিশ্বকাপ থেকে বাদ বাংলাদেশ, উদ্বেগ জানাল বিশ্ব ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন বিএনপি কর্মীদের ভয় নেই, আশ্রয়ের আশ্বাস নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় বাড়ছে সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা সাদ্দামের স্ত্রী ও শিশুপুত্রের মৃত্যু প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন উপদেষ্টা, ‘কৃষি ছাড়া উত্তর নয়’

উপেক্ষিত সতর্কতা আর দেরিতে উদ্ধার, করাচির গুল প্লাজায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর মিছিল

করাচির ঐতিহাসিক বাণিজ্য কেন্দ্রের গুল প্লাজা শপিং কমপ্লেক্সে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের অবহেলা, তালাবদ্ধ বেরোনোর পথ এবং দেরিতে উদ্ধার তৎপরতা। শুক্রবারের সেই আগুনে অন্তত সাতষট্টি জনের মৃত্যু হয়েছে, এখনো নিখোঁজ রয়েছেন পনেরো জন, যাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই বলেই আশঙ্কা পুলিশের।

মুহূর্তে নেমে আসে অন্ধকার

গুল প্লাজার এক দোকানি মুহাম্মদ ইমরান প্রথমে আগুনটিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তাঁর ধারণা ছিল, আগের মতোই সামান্য আগুন, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ধোঁয়া বাতাস ভরে দেয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে মোবাইলের আলোও কাজে আসেনি। নিজের হাত দেখা যাচ্ছিল না। ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত ইমরান কয়েক কদম এগিয়ে প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, সেদিনের অভিজ্ঞতা ছিল কেয়ামতের মতো, পাশের মানুষকেও দেখা যাচ্ছিল না।

Karachi fire came after ignored warnings, delayed response - PressReader

তালাবদ্ধ দরজা আর সংকীর্ণ পথ

১৯৮০–এর দশকে নির্মিত বহুতল এই বিপণিতে ছিল প্রায় বারোশো পারিবারিক দোকান। শিশুদের পোশাক, খেলনা, বাসনপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রীর এই বাজারে আগুন ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। পুলিশের তথ্য মতে, ষোলটি বেরোনোর পথের মধ্যে তেরটিই রাত দশটার পর নিয়মিতভাবে তালাবদ্ধ থাকত। সংকীর্ণ করিডর, দুর্বল বায়ু চলাচল আর তালাবদ্ধ দরজা আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে তোলে। মানুষ হাত ধরাধরি করে অন্ধকারে পথ খুঁজতে থাকে, কেউ কেউ ভেঙে ফেলে তালা ও দরজা।

ছাদে আটকে পড়া জীবনের লড়াই

নিচে নামার উপায় না পেয়ে প্রায় সত্তর জন মানুষ ছাদে আশ্রয় নেন। নারী, শিশু ও পরিবারগুলো সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে ছিলেন। ভবনের নকশার কারণে ধোঁয়া ওপরের দিকে জমে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। হঠাৎ বাতাসের দিক বদলালে পাশের রিমপা প্লাজা দৃশ্যমান হয়। কয়েকজন তরুণ ভাঙা সিঁড়ি খুঁজে এনে একে একে সবাইকে পার করে দেন। শেষ পর্যন্ত ইমরান নিজে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বের হন। ওপাশে অপেক্ষায় ছিল স্বেচ্ছাসেবী অ্যাম্বুলেন্স।

দেরিতে আসা উদ্ধার তৎপরতা

বেঁচে যাওয়া অনেকের অভিযোগ, অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর উপস্থিতি ছিল দেরিতে এবং প্রস্তুতি ও পর্যাপ্ত ছিল না। আগুনে তখন গুল প্লাজা প্রায় গলিত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছিল। অনেক নিখোঁজই ছিলেন দোকানের কর্মচারী ও ব্যবসায়ী, যারা অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে কিংবা পরিবারের খোঁজে আবার ভেতরে ঢুকে পড়েন।

Dozens missing after massive Karachi mall fire, 21 killed | CNN

অবহেলার দীর্ঘ ইতিহাস

নথি অনুযায়ী, গুল প্লাজা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভবন নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করে আসছিল। ১৯৯২, ২০১৫ ও ২০২১ সালে নিরাপত্তা ঘাটতি ও অনুমোদনহীন নির্মাণ নিয়ে মামলা হয়। দুই বছর আগের পর্যালোচনায় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতিকে গুরুতর বলে সতর্ক করেছিল। তবু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত সম্ভবত একটি কৃত্রিম ফুলের দোকান থেকে, শিশুদের দেশলাই খেলার কারণে আগুন লেগে থাকতে পারে বলে পুলিশ ধারণা করছে।

শোক আর ক্ষতের বাজার

এই অগ্নিকাণ্ড করাচির ব্যবসায়ী সমাজকে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। খেলনার দোকানের কর্মচারী আবদুল গাফফার জানান, তাঁর এক আত্মীয় অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে নিখোঁজ হন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর শেষ কণ্ঠবার্তা। ইমরানের চোখের সামনে এখনো ভাসে সেই দৃশ্য। প্রতিদিনের পরিচিত মুখগুলো আর নেই। জীবন বেঁচে গেলেও প্রশ্ন থেকেই যায়, এমন আগুন কীভাবে সবকিছু গ্রাস করল।

জনপ্রিয় সংবাদ

বয়কট গুঞ্জনের মধ্যেই টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করল পাকিস্তান

উপেক্ষিত সতর্কতা আর দেরিতে উদ্ধার, করাচির গুল প্লাজায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর মিছিল

০৫:৩৮:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

করাচির ঐতিহাসিক বাণিজ্য কেন্দ্রের গুল প্লাজা শপিং কমপ্লেক্সে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের অবহেলা, তালাবদ্ধ বেরোনোর পথ এবং দেরিতে উদ্ধার তৎপরতা। শুক্রবারের সেই আগুনে অন্তত সাতষট্টি জনের মৃত্যু হয়েছে, এখনো নিখোঁজ রয়েছেন পনেরো জন, যাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই বলেই আশঙ্কা পুলিশের।

মুহূর্তে নেমে আসে অন্ধকার

গুল প্লাজার এক দোকানি মুহাম্মদ ইমরান প্রথমে আগুনটিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। তাঁর ধারণা ছিল, আগের মতোই সামান্য আগুন, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ধোঁয়া বাতাস ভরে দেয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে মোবাইলের আলোও কাজে আসেনি। নিজের হাত দেখা যাচ্ছিল না। ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত ইমরান কয়েক কদম এগিয়ে প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, সেদিনের অভিজ্ঞতা ছিল কেয়ামতের মতো, পাশের মানুষকেও দেখা যাচ্ছিল না।

Karachi fire came after ignored warnings, delayed response - PressReader

তালাবদ্ধ দরজা আর সংকীর্ণ পথ

১৯৮০–এর দশকে নির্মিত বহুতল এই বিপণিতে ছিল প্রায় বারোশো পারিবারিক দোকান। শিশুদের পোশাক, খেলনা, বাসনপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রীর এই বাজারে আগুন ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। পুলিশের তথ্য মতে, ষোলটি বেরোনোর পথের মধ্যে তেরটিই রাত দশটার পর নিয়মিতভাবে তালাবদ্ধ থাকত। সংকীর্ণ করিডর, দুর্বল বায়ু চলাচল আর তালাবদ্ধ দরজা আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে তোলে। মানুষ হাত ধরাধরি করে অন্ধকারে পথ খুঁজতে থাকে, কেউ কেউ ভেঙে ফেলে তালা ও দরজা।

ছাদে আটকে পড়া জীবনের লড়াই

নিচে নামার উপায় না পেয়ে প্রায় সত্তর জন মানুষ ছাদে আশ্রয় নেন। নারী, শিশু ও পরিবারগুলো সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে ছিলেন। ভবনের নকশার কারণে ধোঁয়া ওপরের দিকে জমে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। হঠাৎ বাতাসের দিক বদলালে পাশের রিমপা প্লাজা দৃশ্যমান হয়। কয়েকজন তরুণ ভাঙা সিঁড়ি খুঁজে এনে একে একে সবাইকে পার করে দেন। শেষ পর্যন্ত ইমরান নিজে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বের হন। ওপাশে অপেক্ষায় ছিল স্বেচ্ছাসেবী অ্যাম্বুলেন্স।

দেরিতে আসা উদ্ধার তৎপরতা

বেঁচে যাওয়া অনেকের অভিযোগ, অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর উপস্থিতি ছিল দেরিতে এবং প্রস্তুতি ও পর্যাপ্ত ছিল না। আগুনে তখন গুল প্লাজা প্রায় গলিত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছিল। অনেক নিখোঁজই ছিলেন দোকানের কর্মচারী ও ব্যবসায়ী, যারা অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে কিংবা পরিবারের খোঁজে আবার ভেতরে ঢুকে পড়েন।

Dozens missing after massive Karachi mall fire, 21 killed | CNN

অবহেলার দীর্ঘ ইতিহাস

নথি অনুযায়ী, গুল প্লাজা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভবন নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করে আসছিল। ১৯৯২, ২০১৫ ও ২০২১ সালে নিরাপত্তা ঘাটতি ও অনুমোদনহীন নির্মাণ নিয়ে মামলা হয়। দুই বছর আগের পর্যালোচনায় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতিকে গুরুতর বলে সতর্ক করেছিল। তবু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত সম্ভবত একটি কৃত্রিম ফুলের দোকান থেকে, শিশুদের দেশলাই খেলার কারণে আগুন লেগে থাকতে পারে বলে পুলিশ ধারণা করছে।

শোক আর ক্ষতের বাজার

এই অগ্নিকাণ্ড করাচির ব্যবসায়ী সমাজকে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। খেলনার দোকানের কর্মচারী আবদুল গাফফার জানান, তাঁর এক আত্মীয় অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে নিখোঁজ হন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর শেষ কণ্ঠবার্তা। ইমরানের চোখের সামনে এখনো ভাসে সেই দৃশ্য। প্রতিদিনের পরিচিত মুখগুলো আর নেই। জীবন বেঁচে গেলেও প্রশ্ন থেকেই যায়, এমন আগুন কীভাবে সবকিছু গ্রাস করল।