০৪:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
হাইলাইট: দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে প্রতিদিন, তবে বন্ধ অনুসন্ধান–মামলা সপ্তাহের শুরুতেই সোনার গহনার দাম ভরিতে কমলো ২২১৬ টাকা   শিকারি-সংগ্রাহকদের মধ্যেও ছিল প্লেগ! ৫,৫০০ বছর আগের মহামারির চাঞ্চল্যকর প্রমাণ এল নিনোর নতুন হুমকি: ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী জলবায়ু ঘটনা কি সামনে? গাছেরও আছে ‘গোপন শ্রবণশক্তি’, প্রতিবেশীর খবর শুনেই বদলায় বেড়ে ওঠার কৌশল নেটফ্লিক্সে হারলান কোবেন ঝড়: রহস্য আর পারিবারিক নাটকের জাদুতে বিশ্বজয় বড়দের নতুন ছুটি: গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে ফিরছে প্রাপ্তবয়স্করা অনলাইনের প্রেমে প্রতারণা: একাকীত্বকে পুঁজি করে বাড়ছে ‘লাভ স্ক্যাম’ চক্র অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারে নতুন আশা, জীবন বাড়াতে পারে যুগান্তকারী ওষুধ চকলেটের মিষ্টি রহস্য: কোকো ফলনে ভরসা রক্তচোষা ক্ষুদে পোকা

বিবিসির কিংবদন্তি সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যাঁর কণ্ঠে বিশ্ব চিনেছে, সেই বিবিসি সাংবাদিক স্যার মার্ক টালি আর নেই। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে উপমহাদেশের যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা ও রাজনৈতিক উথালপাথালের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন তিনি। দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনের শেষে ৯০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের সাক্ষী কণ্ঠ
মার্ক টালির উষ্ণ ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর কয়েক দশক ধরে বিবিসির শ্রোতাদের কাছে ছিল পরিচিত। তাঁকে অনেকেই ভারতের কণ্ঠস্বর বলে অভিহিত করতেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান, নানা দাঙ্গা ও রাজনৈতিক সংকট তিনি গভীর মনোযোগ ও মানবিক দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন।

আয়োধ্যার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
১৯৯২ সালে আয়োধ্যায় প্রাচীন এক মসজিদ ভাঙার সময় তিনি চরম বিপদের মুখে পড়েন। উগ্রপন্থীদের ভিড়ের মধ্যে আটকে পড়ে তাঁকে ঘন্টার পর ঘন্টা একটি কক্ষে বন্দি থাকতে হয়। ভিড় তখন ‘মার্ক টালির মৃত্যু চাই’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও এক হিন্দু পুরোহিতের সহায়তায় তিনি রক্ষা পান। বহু বছর পর এই ঘটনাকে তিনি ভারতের স্বাধীনতার পর ধর্মনিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় ধাক্কা বলে বর্ণনা করেন।

শৈশব ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক
১৯৩৫ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া মার্ক টালি বেড়ে ওঠেন ব্রিটিশ শাসনামলের ভারতে। তাঁর বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মা ছিলেন বঙ্গদেশীয় পরিবার থেকে আসা। শৈশব থেকেই ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর গভীর পরিচয় গড়ে ওঠে।

হিন্দিতে দক্ষতা ও মানুষের আস্থা
বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে বিরলভাবে তিনি সাবলীল হিন্দি বলতে পারতেন। এই দক্ষতার কারণেই ভারতীয় রাজনীতিক, সম্পাদক ও সমাজকর্মীদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বাসযোগ্য ‘টালি সাহেব’। ব্রিটিশ নাগরিক হলেও তিনি ভারতকেই নিজের ঘর বলে মনে করতেন এবং জীবনের অধিকাংশ সময় সেখানেই কাটিয়েছেন।

সাংবাদিকতায় আসার পথ
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব পড়ার পর তিনি একসময় ধর্মযাজক হওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তবে ১৯৬৫ সালে বিবিসিতে যোগ দিয়ে তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায়। প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে শুরু করে দ্রুতই তিনি প্রতিবেদক হিসেবে পরিচিতি পান।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘু অধিকারের পক্ষে অবস্থান
মার্ক টালি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা ও সহনশীলতার দৃঢ় সমর্থক। ভারতের সামাজিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য তাঁর প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপটের বিরুদ্ধে তিনি সরব ছিলেন এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

দীর্ঘ কর্মজীবন ও বিতর্ক
দিল্লিতে বিবিসির ব্যুরো প্রধান হিসেবে তিনি টানা দুই দশকের বেশি সময় কাজ করেছেন। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিবর্তন তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। ১৯৭৫ সালে ভারতে জরুরি অবস্থার সময় তাঁকে দেশছাড়া করা হলেও ১৮ মাস পর তিনি ফিরে আসেন।
১৯৯৩ সালে বিবিসির শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করে তিনি ভয়ের সংস্কৃতির অভিযোগ তোলেন এবং পরের বছর পদত্যাগ করেন।

লেখালেখি ও স্বীকৃতি
পদত্যাগের পরও তিনি বিবিসি রেডিওতে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে অনুষ্ঠান করেছেন। ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি বহু বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ দেয়। ব্রিটেন তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। পরবর্তীতে তিনি ভারতের প্রবাসী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং নিজেকে ভারত ও ব্রিটেন—দুই দেশের নাগরিক বলে পরিচয় দেন।

অমলিন উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের জন্মসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন মার্ক টালি। তাঁর সাংবাদিকতা কেবল খবর নয়, মানুষের গল্প ও সময়ের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাইলাইট: দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে প্রতিদিন, তবে বন্ধ অনুসন্ধান–মামলা

বিবিসির কিংবদন্তি সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই

০৬:৫৩:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যাঁর কণ্ঠে বিশ্ব চিনেছে, সেই বিবিসি সাংবাদিক স্যার মার্ক টালি আর নেই। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে উপমহাদেশের যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা ও রাজনৈতিক উথালপাথালের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন তিনি। দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনের শেষে ৯০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের সাক্ষী কণ্ঠ
মার্ক টালির উষ্ণ ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর কয়েক দশক ধরে বিবিসির শ্রোতাদের কাছে ছিল পরিচিত। তাঁকে অনেকেই ভারতের কণ্ঠস্বর বলে অভিহিত করতেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান, নানা দাঙ্গা ও রাজনৈতিক সংকট তিনি গভীর মনোযোগ ও মানবিক দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন।

আয়োধ্যার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
১৯৯২ সালে আয়োধ্যায় প্রাচীন এক মসজিদ ভাঙার সময় তিনি চরম বিপদের মুখে পড়েন। উগ্রপন্থীদের ভিড়ের মধ্যে আটকে পড়ে তাঁকে ঘন্টার পর ঘন্টা একটি কক্ষে বন্দি থাকতে হয়। ভিড় তখন ‘মার্ক টালির মৃত্যু চাই’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও এক হিন্দু পুরোহিতের সহায়তায় তিনি রক্ষা পান। বহু বছর পর এই ঘটনাকে তিনি ভারতের স্বাধীনতার পর ধর্মনিরপেক্ষতার সবচেয়ে বড় ধাক্কা বলে বর্ণনা করেন।

শৈশব ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক
১৯৩৫ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া মার্ক টালি বেড়ে ওঠেন ব্রিটিশ শাসনামলের ভারতে। তাঁর বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মা ছিলেন বঙ্গদেশীয় পরিবার থেকে আসা। শৈশব থেকেই ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর গভীর পরিচয় গড়ে ওঠে।

হিন্দিতে দক্ষতা ও মানুষের আস্থা
বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে বিরলভাবে তিনি সাবলীল হিন্দি বলতে পারতেন। এই দক্ষতার কারণেই ভারতীয় রাজনীতিক, সম্পাদক ও সমাজকর্মীদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বাসযোগ্য ‘টালি সাহেব’। ব্রিটিশ নাগরিক হলেও তিনি ভারতকেই নিজের ঘর বলে মনে করতেন এবং জীবনের অধিকাংশ সময় সেখানেই কাটিয়েছেন।

সাংবাদিকতায় আসার পথ
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব পড়ার পর তিনি একসময় ধর্মযাজক হওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তবে ১৯৬৫ সালে বিবিসিতে যোগ দিয়ে তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায়। প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে শুরু করে দ্রুতই তিনি প্রতিবেদক হিসেবে পরিচিতি পান।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘু অধিকারের পক্ষে অবস্থান
মার্ক টালি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা ও সহনশীলতার দৃঢ় সমর্থক। ভারতের সামাজিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্য তাঁর প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপটের বিরুদ্ধে তিনি সরব ছিলেন এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

দীর্ঘ কর্মজীবন ও বিতর্ক
দিল্লিতে বিবিসির ব্যুরো প্রধান হিসেবে তিনি টানা দুই দশকের বেশি সময় কাজ করেছেন। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিবর্তন তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। ১৯৭৫ সালে ভারতে জরুরি অবস্থার সময় তাঁকে দেশছাড়া করা হলেও ১৮ মাস পর তিনি ফিরে আসেন।
১৯৯৩ সালে বিবিসির শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করে তিনি ভয়ের সংস্কৃতির অভিযোগ তোলেন এবং পরের বছর পদত্যাগ করেন।

লেখালেখি ও স্বীকৃতি
পদত্যাগের পরও তিনি বিবিসি রেডিওতে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে অনুষ্ঠান করেছেন। ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি বহু বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ দেয়। ব্রিটেন তাঁকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। পরবর্তীতে তিনি ভারতের প্রবাসী নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং নিজেকে ভারত ও ব্রিটেন—দুই দেশের নাগরিক বলে পরিচয় দেন।

অমলিন উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের জন্মসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন মার্ক টালি। তাঁর সাংবাদিকতা কেবল খবর নয়, মানুষের গল্প ও সময়ের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।