একটি বহুল পরিচিত সত্য আছে, মানুষ প্রায়ই চৌর্যবৃত্তি করেও পার পেয়ে যায়। এমনকি সেই চুরি করা লাইনটি যদি হয় সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বাক্যগুলোর একটি। দুই হাজার সাত সালে জেন অস্টেনের উপন্যাসের অধ্যায় সামান্য বদলে আঠারো জন প্রকাশকের কাছে পাঠানো হয়েছিল নতুন উপন্যাস দাবি করে। নাম ছিল প্রথম ছাপ। বিস্ময়করভাবে মাত্র একজন সম্পাদক বুঝতে পেরেছিলেন এই প্রতারণা। বাকিরা চোখ এড়িয়ে গিয়েছিলেন এমন এক লেখা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুখস্থ জানে।
চৌর্যবৃত্তির এই বিস্তৃত ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে রজার ক্রয়ৎসের একটি বই। বিশ শতকের নয়, টানা বিশ শতাব্দীর চৌর্যচর্চার গল্প এতে উঠে এসেছে। সংগীত থেকে সাহিত্য, বক্তৃতা থেকে রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই নকলের ছায়া। বব ডিলান থেকে ডিলান থমাস, এমনকি মার্কিন রাজনীতির মঞ্চ পর্যন্ত। নোবেল বক্তৃতায় সমুদ্রযাত্রার গল্প তুলে ধরেও যে বিতর্ক তৈরি হতে পারে, সেটিও বইটি মনে করিয়ে দেয়।

চৌর্যবৃত্তির পুরনো পাপ, নতুন প্রশ্ন
চৌর্যবৃত্তি নতুন কিছু নয়। শব্দটির জন্মই প্রাচীন রোমে, যেখানে এর অর্থ ছিল অপহরণকারী। তবে আজকের দিনে বিষয়টি নতুন করে জটিল হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কোনটি চুরি আর কোনটি গ্রহণযোগ্য অনুপ্রেরণা, সেই সীমা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। নিজের জন্য একটি আবেদনপত্র বা ব্যক্তিগত চিঠি লিখতে যন্ত্রের সাহায্য নেওয়া কি অপরাধ। আর আইনগতভাবে, কপিরাইটযুক্ত লেখায় প্রশিক্ষিত যন্ত্র কি অপরাধী।
সমস্যা হলো, চৌর্যবৃত্তির কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। হুবহু কপি করা থেকে শুরু করে ধারণা আত্মসাৎ—সবই এর আওতায় পড়ে। অনেকটা অশ্লীলতার মতো, দেখলেই বোঝা যায় বলে ধরে নেওয়া হয়। প্রযুক্তি এই দেখাটাকে আরও সহজ করেছে। শেক্সপিয়ার যখন ইতিহাসের লেখা থেকে দৃশ্য ধার নিয়েছিলেন, তখন হাতে লিখতে হতো। আজ একটা ক্লিকেই অসংখ্য অনুকরণ তৈরি করা যায়।
যন্ত্র, মামলা ও নৈতিক দ্বন্দ্ব
বৃহৎ ভাষা মডেলগুলো বিপুল পরিমাণ লেখা থেকে শেখে, যার বড় অংশই কপিরাইটযুক্ত। তাই লেখকদের অভিযোগ, যন্ত্র তাদের কাজ লুট করছে। একাধিক মামলায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে গণচুরি করার অভিযোগ উঠেছে। বিপুল অঙ্কের সমঝোতাও হয়েছে। বড় প্রকাশকরাও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থাকে ব্যবহারকারীর ভূমিকা নিয়ে। একজন লেখক ও তো অসংখ্য বই পড়ে নিজের ভাষায় লেখেন। সেই অর্থে যন্ত্র ব্যবহার করলেই কি কেউ চোর। রজার ক্রয়ৎসের মতে, এখানে একক কোনো মূল লেখা থেকে নকল নেই, বরং অদৃশ্য ভূতলেখনের মতো কিছু। কিন্তু সমালোচকেরা বলেন, এটি দ্বিস্তরীয় অপরাধ। প্রথমে যন্ত্র শেখে চুরি করে, পরে মানুষ সেই আউটপুট নিজের নামে চালায়।
সাহিত্য, আইন ও ইতিহাসের জটিল নৃত্য
সৃজনশীলতা আর মৌলিকত্বের এই টানাপোড়েন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলছে। সাহিত্য ইতিহাসে যাদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত, তাদের অনেকেই নকলের অভিযোগে অভিযুক্ত। কেউ কেউ নীতিগত অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছেন, আবার নিজেরাও অনিচ্ছায় সেই ফাঁদে পড়েছেন। মার্ক টোয়েনের বিখ্যাত উক্তি মনে করিয়ে দেয়, মানুষের কথাবার্তায় চৌর্য ছাড়া খুব বেশি কিছু নেই।
অষ্টাদশ শতকে কপিরাইট ধারণা আসার পর বিষয়টি আইনি রূপ পায়। লেখালেখি তখন পেশা হয়ে ওঠে, আর পেশার সম্পত্তি পাহারা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে। ছাপাখানা যেমন পাঠক বাড়িয়েছিল, তেমনি চুরি ধরা পড়ার সুযোগও বাড়িয়েছিল।
নতুন যুগে পুরনো খেলা
আজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যন্ত্র দিয়ে যন্ত্রের লেখা ধরতে চায়, আবার শিক্ষার্থীরা সেই লেখাকে আরও মানবিক দেখাতে নতুন কৌশল খোঁজে। নকল লেখা চেনার ভাষাগত বৈশিষ্ট্য ও চিহ্নিত হচ্ছে। শব্দচয়নে একঘেয়েমি, প্রাণহীনতার, অতিরিক্ত সাধারণ শব্দের ব্যবহার—এসবই লক্ষণ।
এই নৃত্য আবার বদলাচ্ছে। আর এখন শুধু লেখক নন, সমাজের সবাই এতে জড়িত। সংবাদমাধ্যমে চৌর্যবৃত্তির উল্লেখ কয়েক দশকে বহুগুণ বেড়েছে। কারণ হয়তো চুরি বেড়েছে। আবার এটাও সত্য, এসব গল্পে এক ধরনের নাটকীয় আনন্দ আছে। পতনের গল্প মানুষকে টানে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সত্যিই মৌলিক কিছু তৈরি করি, নাকি কেবল অন্যের চোখ দিয়েই দেখি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















