এক দশকেরও কম সময়ে টিকটক কিশোরদের জীবন থেকে শুরু করে আমেরিকার রাজনীতির ঘুম কেড়ে নিয়েছে। শুরু থেকেই পশ্চিমা সরকারগুলোর সন্দেহ, এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও অ্যাপটি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বিস্তারের একটি হাতিয়ার। ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারণা ছড়ানোর অভিযোগে বিষয়টি বারবার নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
নিষেধের হুমকি ও আইনি লড়াই
দুই হাজার বিশ সালে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ডোনাল্ড ট্রাম্প টিকটককে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। তখন অভিযোগ ছিল, অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য চীনে পাঠাচ্ছে এবং মতাদর্শিক প্রভাব বিস্তার করছে। চার বছর পর জো বাইডেনের সময় কংগ্রেসে দ্বিদলীয় সমর্থনে একটি আইন পাস হয়, যাতে বলা হয় চীনা মালিকানা থেকে আলাদা না হলে টিকটককে নিষিদ্ধ করা হবে। সুপ্রিম কোর্ট সেই আইন বহাল রাখার পর মনে হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের দিন শেষ।

আইনের বাইরে থেকেও টিকে থাকা
সব জল্পনার বিপরীতে এক বছর পরও যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক দিব্যি চলছে। ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প প্রথমেই নির্দেশ দেন, পঁচাত্তর দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না করতে। সেই সময়সীমা বারবার বাড়ানো হয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, অ্যাপটি হয়তো থেকেই যাচ্ছে। বড়দিনের আগে টিকটকের প্রধান কর্মীদের জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রম হস্তান্তরের একটি চুক্তি হয়েছে এবং জানুয়ারির শেষ দিকে তা চূড়ান্ত হওয়ার কথা। যদিও শেষ মুহূর্তে আইনি জটিলতা ছিল, তবু সমাধান কাছাকাছি বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন মালিকানা, পুরোনো সংশয়
প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী বিদেশি শত্রু রাষ্ট্রের বিনিয়োগ সীমিত রাখার আইনি শর্ত মানা হচ্ছে। চীনা মালিক বাইটড্যান্স তাদের অংশ কমিয়ে নির্ধারিত সীমার নিচে আনছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এবং মধ্যপ্রাচ্যের একটি সার্বভৌম তহবিল বড় অংশীদার হচ্ছে। ব্যবহারকারীদের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রেই সংরক্ষণ করা হবে এবং অ্যালগরিদম পুনর্গঠন করা হবে বলে ঘোষণা এসেছে।

কিন্তু সমস্যাটি এখানেই শেষ নয়। বাইটড্যান্স পুরোপুরি সরে যাচ্ছে না। তাদের বোর্ডে উপস্থিতি থাকবে এবং অ্যালগরিদম ব্যবহারের বিনিময়ে বড় অঙ্কের রাজস্ব পাবে। বিজ্ঞাপন ও ই–বাণিজ্য কার্যক্রমেও তাদের ভূমিকা থাকবে। ফলে কাগজে কলমে মালিকানা বদলালেও বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ কতটা আলাদা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। এক বিশ্লেষকের ভাষায়, গাড়ির মালিক বদলালেও ইঞ্জিন তো একই রয়ে গেল।
জনমত ও রাজনীতির হিসাব
ট্রাম্পের অবস্থান বদলের পেছনে বড় কারণ জনমত। এক সময় টিকটক ছিল কেবল কিশোরদের অ্যাপ। এখন এটি ব্যবহার করছে কোটি কোটি আমেরিকান, মধ্যবয়সীরাও পিছিয়ে নেই। কয়েক বছর আগে যেখানে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে জনসমর্থন বেশি ছিল, এখন তা প্রায় সমান হয়ে গেছে। এত বড় ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গিয়ে রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে আগ্রহ কমেছে।

সস্তা চুক্তি ও ক্ষমতার সুবিধা
এই চুক্তিকে অনেকেই দেখছেন অবিশ্বাস্য রকম সস্তা হিসেবে। নিষেধাজ্ঞার চাপের মুখে চীনা মালিকের বিকল্প কম ছিল। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিনিয়োগকারীরা লাভজনক অবস্থান থেকে দর কষাকষি করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে সমালোচকরা বলছেন, নতুন ব্যবস্থায় সরকার–ঘনিষ্ঠ করপোরেট স্বার্থও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাচ্ছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি কি কমল
ছয় বছর পেরিয়েও টিকটকের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমেনি। বরং আরও বেশি মানুষ এই অ্যাপ থেকে খবর নিচ্ছে। কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞা কার্যত উপেক্ষিত হলেও তেমন প্রতিবাদ নেই। চীনবিরোধী কণ্ঠগুলো অন্য ইস্যুতে মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে টিকটক নিয়ে এক সময়ের তীব্র ক্ষোভ আজ যেন অতীতের গল্প। এই নীরবতা ইঙ্গিত দেয়, অ্যাপটি নিরাপদ হয়ে গেছে তা নয়, বরং আমেরিকার ভেতরের ঝুঁকি ও অস্থিরতা আরও গভীর হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















