অফিসের কাজে ডুবে থাকা এক দিনে হঠাৎ ম্যানেজারের বার্তা আসে—সবার অনুরোধ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সহকর্মী সারাহর জন্মদিনের কার্ডে স্বাক্ষর করতে হবে। বুধবার দুপুরের আগেই। বৃহস্পতিবার সকালে ছোট আড্ডা হবে অফিসের ভেতরেই। সঙ্গে একটি লিংক, যেখানে সবাই নিজের বার্তা যোগ করবে। দেখলে মনে হয় খুব সহজ কাজ। কিন্তু বাস্তবে এই ছোট্ট জন্মদিনের কার্ডই হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত মানসিক পরীক্ষার ক্ষেত্র।
জন্মদিন মনে রাখার চাপ
নতুন ম্যানেজারের বিশ্বাস, সহকর্মীর জন্মদিন ভুলে গেলে কাজে মনোযোগ কমে যায়। তাই এখন জন্মদিন আর ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং দলীয় দায়িত্ব। সবাইকে প্রমাণ করতে হয়, তারা কতটা যত্নশীল এবং কতটা দলগত মানুষ। ফলাফল, কয়েক লাইনের শুভেচ্ছা লিখতেই শুরু হয় চাপ, হিসাব আর তুলনা।

প্রথম শুভেচ্ছার সুবিধা
কার্ডে প্রথম স্বাক্ষরকারী সহকর্মী খুব সাধারণভাবে লিখে ফেলেন, জন্মদিনের শুভেচ্ছা। কল্পনার পুরস্কার নেই, কিন্তু প্রথম হওয়ার সুবিধা আছে। পরের জন একই কথা লিখতে পারেন না। শব্দের অদলবদল করে কেউ চেষ্টা করেন, কেউ একটু বেশি উষ্ণতা যোগ করেন। কয়েকটি বাড়তি শব্দই হঠাৎ করে সম্পর্কের গভীরতা বোঝানোর প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়।
শব্দ বাড়ানোর লড়াই
একজন লিখলেন, ভালো দিন কাটুক। আরেকজন লিখলেন, খুব ভালো দিন কাটুক। এরপর কেউ যোগ করলেন, সত্যিই খুব ভালো দিন কাটুক। শব্দ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের লেখা হঠাৎ ঠান্ডা আর দূরত্বপূর্ণ মনে হতে থাকে। কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত জোর দিতে গিয়ে ব্যঙ্গাত্মক শোনান।

দলীয় ভাবনার প্রদর্শনী
কিছু সহকর্মীর লেখা সরাসরি জন্মদিনের জন্য নয়, বরং ম্যানেজারের উদ্দেশে। দলে বিশ্বাস, দলীয় চেতনা, একসঙ্গে কাজ করার গল্প—সবই থাকে। জন্মদিনের কার্ড যেন হয়ে ওঠে অফিস সংস্কৃতির বিজ্ঞাপন। ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে দলীয় মূল্যবোধ বড় হয়ে ওঠে।
রসিকতা আর ভুল বোঝাবুঝি
কেউ মজা করে লেখেন, বেশি মাতাল হয়ো না। এতে ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত থাকলেও অন্যভাবে দেখলে অস্বস্তিও তৈরি হয়। নতুন ইন্টার্ন কেউ কেউ কেক বেশি না খাওয়ার উপদেশ দেন, যা পরিস্থিতি না বোঝার উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। আবার কেউ অতিরিক্ত সংক্ষিপ্ত বা ব্যক্তিগত সংকেত ব্যবহার করে সবাইকে অস্বস্তিতে ফেলেন।
অবসরপ্রাপ্ত মানসিকতা
অফিসে এমন মানুষও থাকেন, যাঁরা শুধু অনুষ্ঠানের জায়গার নাম লিখে দেন। জন্মদিন হোক বা শোকবার্তা, তাঁদের কাছে সবই এক। অবসরের কাছাকাছি এসে আবেগ আর সামাজিক নিয়মের গুরুত্ব কমে যায়।

কৃত্রিম সৃজনশীলতার প্রবেশ
হঠাৎ করে কেউ কবিতা লিখে ফেলেন, দলের প্রশংসা আর ছন্দে মোড়া জন্মদিনের বার্তা। বোঝা যায়, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়েছে। আরেকজন দীর্ঘ, নিখুঁত প্রশংসামূলক বার্তা লেখেন, যেখানে ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ আর দলীয় অবদানের বিবরণ থাকে। এখানেও স্বাভাবিকতার চেয়ে নিখুঁততা বেশি।
বন্ধুত্বের নিরাপদ ব্যঙ্গ
একজন সহকর্মী এমন একটি বার্তা লেখেন, যা বাইরে থেকে পড়লে অপমানজনক মনে হতে পারে। কিন্তু ধারণা করা হয়, গভীর বন্ধুত্বের কারণেই এই সাহস। না হলে এমন লেখা অফিসের পরিবেশে বিপজ্জনক।

শেষ পর্যন্ত লেখকের পালা
সবাই লিখে ফেলেছে। এখন নিজের পালা। সময় যায়, ভাবনা আসে, আবার কাটে। শেষমেশ তাড়াহুড়ো করে একটি অদ্ভুত, অসম্পূর্ণ শুভেচ্ছা লিখে ফেলা হয়। লিখে বুঝতে দেরি হয়, ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু তখন আর সম্পাদনার সুযোগ নেই।
এই জন্মদিনের কার্ড শুধু একটি কার্ড নয়। এটি অফিসের ভেতরের অদৃশ্য চাপ, দলীয় অভিনয়, সম্পর্কের হিসাব আর আধুনিক কর্মসংস্কৃতির এক ছোট কিন্তু স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















