গত শরৎকাল থেকে ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি ঘিরে শুরু হয়েছে টানটান উত্তেজনার এক কর্পোরেট ধাওয়া। একদিকে নেটফ্লিক্স, অন্যদিকে প্যারামাউন্ট—দু’পক্ষই মরিয়া হয়ে হলিউডের এই বড় সম্পদটি নিজেদের দখলে নিতে চাইছে। শুরুতে এগিয়ে ছিল প্যারামাউন্ট। এলিসন পরিবারের অধিগ্রহণের পর ধারণা করা হচ্ছিল, তারাই বাজিমাত করবে। কিন্তু হঠাৎ করেই চিত্র বদলে দেয় নেটফ্লিক্স।
নেটফ্লিক্সের বড় চাল
গত মাসে নেটফ্লিক্স ঘোষণা দেয়, তারা ওয়ার্নার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছে কোম্পানির বড় অংশ অধিগ্রহণের চুক্তি করেছে। এই ঘোষণাই প্রতিযোগিতায় নাটকীয় মোড় আনে। প্যারামাউন্টকে একপ্রকার চমকে দিয়ে নেটফ্লিক্স জানিয়ে দেয়, তারা এই লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই।
শেয়ারহোল্ডারদের মন জয়ের চেষ্টা
![]()
তবে প্রতিযোগিতা এখানেই শেষ নয়। প্যারামাউন্ট এখন জোর গলায় ওয়ার্নার শেয়ারহোল্ডারদের বোঝাতে চাইছে যে তাদের প্রস্তাব নেটফ্লিক্সের চেয়ে সব দিক থেকেই ভালো। এর জবাবে জানুয়ারির বিশ তারিখে নেটফ্লিক্স নিজের প্রস্তাব আরও শক্তিশালী করে। তারা জানায়, এখন পুরো প্রস্তাবই নগদ অর্থে, যার মূল্য প্রায় তিরাশি বিলিয়ন ডলার। এর ফলে অনুমোদনের প্রক্রিয়া দ্রুত হবে বলে আশা করছে তারা। এপ্রিল মাসে শেয়ারহোল্ডারদের ভোট হওয়ার কথা, তবে তার আগেই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
নিয়ন্ত্রকদের দৃষ্টি আকর্ষণের লড়াই
গত সপ্তাহে দুই পক্ষই ইউরোপে গিয়ে নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়েছে। কে হবে উপযুক্ত ক্রেতা, সেটা বোঝানোর চেষ্টা চলছে। তুলনামূলক ছোট প্রতিষ্ঠান হওয়ায় প্রতিযোগিতা আইন নিয়ে প্যারামাউন্ট কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। অন্যদিকে নেটফ্লিক্সের শক্তি চোখে পড়ার মতো। তাদের বিশ্বজুড়ে গ্রাহক সংখ্যা প্রায় বত্রিশ কোটি পঞ্চাশ লাখ। আয় বাড়ছে বছরে প্রায় ষোল শতাংশ হারে, আর পরিচালন মুনাফা প্রায় ত্রিশ শতাংশের কাছাকাছি। ওয়ার্নার যুক্ত হলে নেটফ্লিক্স কার্যত হলিউডে এক বিশাল শক্তিতে পরিণত হবে।

চাকরি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুক্তি
নেটফ্লিক্স তাদের শেয়ারহোল্ডারদের জানিয়েছে, ভিডিও বিনোদনের প্রতিযোগিতা এখন শুধু হলিউডেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউটিউবসহ নানা প্ল্যাটফর্ম ধরলে বড় বাজারগুলোতে টেলিভিশন দেখার মোট সময়ের দশ শতাংশেরও কম নেটফ্লিক্সের দখলে। তারা আরও দাবি করেছে, তাদের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করবে। বিপরীতে প্যারামাউন্ট ওয়ার্নারের সঙ্গে একীভূত হলে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলারের ব্যয় সাশ্রয়ের পরিকল্পনা করছে, যা চাকরি কমার আশঙ্কা তৈরি করছে।
দামের হিসাবেই আসল লড়াই
এই মুহূর্তে প্যারামাউন্ট প্রতিটি শেয়ারের জন্য ত্রিশ ডলার দিচ্ছে, পুরো ওয়ার্নারের জন্য। নেটফ্লিক্স দিচ্ছে প্রতি শেয়ারে সাতাশ ডলার পঁচাত্তর সেন্ট, তবে শুধু স্ট্রিমিং ও স্টুডিও অংশের জন্য। এতে ওয়ার্নারের টেলিভিশন ও কেবল নেটওয়ার্ক শেয়ারহোল্ডারদের হাতেই থাকবে। কোন চুক্তি বেশি লাভজনক, তা নির্ভর করছে এই অবনতিশীল টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর মূল্যায়নের ওপর। ব্যবস্থাপনার পরামর্শ অমান্য করে শেয়ারহোল্ডারদের রাজি করাতে হলে প্যারামাউন্টকে সম্ভবত দাম আরও বাড়াতে হবে।

নেটফ্লিক্সের দোটানা
নেটফ্লিক্স ইতিমধ্যে পুরো নগদ প্রস্তাবে যাওয়ার মাধ্যমে তাদের আগ্রহের গভীরতা দেখিয়েছে। কিন্তু প্যারামাউন্টের মতো তাদের পেছনে কোনো পারিবারিক প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের ভাণ্ডার নেই। নেটফ্লিক্সকে নিজেদের শেয়ারহোল্ডারদের কথাও ভাবতে হচ্ছে। অক্টোবর থেকে ওয়ার্নার অধিগ্রহণের আগ্রহ দেখানোর পর তাদের বাজারমূল্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। আরও বেশি অর্থ খরচ করলে বিনিয়োগকারীদের ধৈর্যচ্যুতি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কী হবে
বিশ্লেষকদের মতে, নেটফ্লিক্স হয়তো শেয়ারপ্রতি আরও এক বা দুই ডলার বাড়াতে পারে। তবে তাদের জন্য এটি মূলত একটি বড় কনটেন্ট চুক্তি, টিকে থাকার প্রশ্ন নয়। অতীতে কনটেন্টের দাম বেশি হলে নেটফ্লিক্স পিছিয়ে আসতে দ্বিধা করেনি। ফলে এপ্রিলের ভোটের আগে আরও নাটকীয় মোড় আসার সম্ভাবনা প্রবল। আপাতত নিশ্চিত শুধু একটাই—এই দৌড়ে উত্তেজনা বাড়বে, আর লাভবান হবে সেই চিরচেনা দৌড়বিদ রোড রানার।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















