বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। তবে ইউরোপের শিল্পখাতে এই প্রযুক্তি ধীরে হলেও গভীরভাবে ঢুকে পড়ছে। ফ্রান্সের শিল্পযন্ত্র নির্মাতা শ্নাইডার ইলেকট্রিকের ডিজিটাল কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা পিটার ভেকেসার বলছেন, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় একশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রয়োগ ইতিমধ্যে চালু রয়েছে। বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরেই এসব প্রয়োগ থেকে বছরে প্রায় চারশ মিলিয়ন ইউরো সাশ্রয় হতে পারে। যদিও এটি প্রতিষ্ঠানের মোট ব্যয়ের খুব সামান্য অংশ, তবু ভেকেসারের লক্ষ্য আরও দূরপ্রসারী। তাঁর ভাষায়, শ্নাইডার ইলেকট্রিকের এমন কোনো পণ্য বা কার্যক্রম থাকবে না, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব পড়বে না।
প্রযুক্তি গ্রহণে ইউরোপের ধীরগতি
ক্লাউড কম্পিউটিং কিংবা পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্কের মতো নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো অতীতে ধীরগতির পরিচয় দিয়েছে। তাই জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। কিন্তু শ্নাইডার ইলেকট্রিকের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে এবং আশার জায়গা তৈরি হয়েছে।

মডেল তৈরিতে পিছিয়ে, প্রয়োগে সুযোগ
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ইউরোপ এখন নতুন পথ খুঁজছে। অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল তৈরির দৌড়ে অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় পিছিয়ে আছে। দুই হাজার চব্বিশ সালে ইউরোপে তৈরি হয়েছে মাত্র তিনটি মডেল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে চল্লিশটি এবং চীনে পনেরটি। বড় আকারের ডেটা সেন্টারে বিপুল বিনিয়োগ করার মতো নিজস্ব প্রযুক্তি জায়ান্টও ইউরোপে নেই। তবু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মডেল বিক্রির চেয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর এখানেই ইউরোপের বড় সুযোগ।
ভোক্তা ও কর্মীদের আগ্রহ
গবেষণা বলছে, ইউরোপীয় নাগরিকরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে বেশ এগিয়ে। মাইক্রোসফটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইউরোপের প্রায় বত্রিশ শতাংশ মানুষ নিয়মিত এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় বেশি। জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, ইউরোপীয়রা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভয় নয়, বরং সম্ভাবনার চোখে দেখছেন।

প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের বৈচিত্র্য
ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় সাঁইত্রিশ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি। তবে দেশভেদে পার্থক্য স্পষ্ট। ফিনল্যান্ডে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠান এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে, ডেনমার্কেও হার বেশ উঁচু। বিপরীতে ইতালি ও গ্রিসে ব্যবহারের হার অনেক কম। আরও একটি বিষয় চোখে পড়ছে, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো সাধারণত সীমিত সংখ্যক কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে, যেখানে আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করছে।
উৎপাদন খাতে ইউরোপের শক্ত অবস্থান
তবে উৎপাদন শিল্পে ইউরোপ এগিয়ে আছে। জরিপ অনুযায়ী, ইউরোপের প্রায় অর্ধেক উৎপাদক প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবহার করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি। জার্মান শিল্পপ্রতিষ্ঠান সিমেন্স বহু বছর ধরে তাদের আধুনিক কারখানায় শতাধিক অ্যালগরিদম দিয়ে উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত করছে। শ্নাইডার ইলেকট্রিকও আগেভাগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রধান নিয়োগ দিয়েছিল। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলিও এখন দ্রুত এগোতে চাইছে।

ব্যবসার নানা কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ডেনমার্কের পানীয় প্রস্তুতকারক কার্লসবার্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিক্রয়কর্মীদের জন্য সহায়ক টুল তৈরি করেছে, যা গ্রাহকের জন্য সঠিক প্রচার নির্ধারণে সহায়তা করে। প্যাকেজিং নকশা ও পরিবহন পরিকল্পনাতেও এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। কর্মীদের নতুন ধারণা নিয়ে পরীক্ষা চালাতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যা থেকে নতুন কার্যকর সমাধান বেরিয়ে আসছে।
নীতিমালা ও অর্থনীতির ঝুঁকি
ইউরোপের অগ্রযাত্রায় দুটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। প্রথমত, কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইন নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও অনেকের মতে এটি অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করছে। ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে কিছু বিধান বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক চাপ। প্রবৃদ্ধি ধীর, চীনা প্রতিযোগিতা তীব্র, যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষাবাদও চাপ বাড়াচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে লাভ ধরে রাখতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ কমায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















