গত এক বছরে বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দুনিয়ায় চীনের প্রভাব নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ডিপসিক নামের একটি তুলনামূলক অচেনা গবেষণাগার হঠাৎ করেই নতুন মডেল এনে আলোচনার কেন্দ্রে আসে। সেই ধাক্কায় চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত শুধু টিকে থাকেনি, বরং ওপেন মডেলের ক্ষেত্রে বিশ্বে একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তুলেছে। প্রশিক্ষণের সময় শেখা সংখ্যাগত কাঠামো উন্মুক্ত রাখার এই মডেলগুলো এখন বৈশ্বিক গবেষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে জনপ্রিয়। জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে চীনা মডেলের ডাউনলোড সংখ্যা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে।
চীনা মডেলের উত্থান ও বিনিয়োগের জোয়ার
ডিপসিক একা নয়। আলিবাবার কুয়েন মডেল পরিবার গত বছরের সেপ্টেম্বরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে এসে পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীদের টপকে যায়। বড়দিনের পর যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরে স্থানান্তরিত চীনা গবেষণাগার মানুস কিনতে বড় অঙ্কের চুক্তির ঘোষণা দেয়, যদিও চীনা সরকারের বাধার সম্ভাবনা এখনো রয়ে গেছে। নতুন বছরের শুরুতেই মিনিম্যাক্স ও জেড ডট এআই হংকংয়ে তালিকাভুক্ত হয় এবং শেয়ারবাজারে দ্রুত উত্থান ঘটে।
মানের দিক থেকে চীনা মডেলগুলো আর পিছিয়ে নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর মালিকানাধীন মডেল এগিয়ে থাকলেও আলিবাবা ও অন্যান্য চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপেন মডেল খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।

আসল সমস্যা আয়
তবে জনপ্রিয়তা আর মান থাকলেও অর্থ আয়ের জায়গায় বড় সংকট। পরিসংখ্যান বলছে, এক বছরে একটি পশ্চিমা চ্যাটবট অ্যাপ স্টোর থেকেই বিপুল রাজস্ব তুললেও শীর্ষ চীনা চ্যাটবটগুলো মিলেও নগণ্য আয় করেছে। অধিকাংশ সেবা এখনো বিনামূল্যে। ব্যবসায়িক গ্রাহকদের জন্য অবকাঠামো ও প্রয়োগ সহায়তা দিয়েই মূলত আয় করতে হচ্ছে, তাও খুব কঠিন পরিস্থিতিতে। মিনিম্যাক্স কয়েক মাসে সীমিত বিক্রি করলেও বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে। জেড ডট এআইয়ের অবস্থাও একই। ফলে পুরো খাতজুড়েই বড় ধরনের ঝাঁকুনি আসার আশঙ্কা বাড়ছে।
ঘরোয়া বাজারেই ভিড় ও সীমাবদ্ধতা
চীনের ভেতরের বাজার তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ হলেও আয় সীমিত। গত বছর ডিপসিকের সাফল্যের পর দুর্বল অনেক প্রতিষ্ঠান সরে গেলেও বাজার এখনো গিজগিজ করছে। অল্প কয়েক বছরে মডেলের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। ভোক্তারা অসংখ্য বিকল্প পাচ্ছেন, ফলে অর্থ খরচের প্রবণতা কম। করপোরেট খাতও সফটওয়্যারে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয় করে, যা আয় বাড়ানোর পথে বড় বাধা।

বিদেশমুখী হওয়ার চেষ্টা
এই কারণেই চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দৃষ্টি দিচ্ছে বিদেশে। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে ধীরে ধীরে ব্যবসা বাড়ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কম থাকায় তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বাজার হয়ে উঠছে। বড় চীনা ক্লাউড কোম্পানিগুলো এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকায় ডেটা কেন্দ্র গড়তে বড় বিনিয়োগ করছে।
তবে এসব বাজার আকারে ছোট। সবচেয়ে বড় সুযোগ পশ্চিমা বিশ্ব, যেখানে চীনা মডেলের ব্যবহার বাড়লেও তা মূলত ছোট স্টার্টআপের মধ্যে সীমিত। কম খরচ, কম কম্পিউটিং শক্তি ও সহজে পরিবর্তনযোগ্য হওয়ায় এসব মডেল আকর্ষণীয়। কিন্তু বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান এখনো দ্বিধায়। তথ্য নিরাপত্তা, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির ভয় তাদের আটকে রাখছে।

রাজনৈতিক বাধা ও ইউরোপের সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আর সরকারি নেটওয়ার্কে ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। ইউরোপ কিছুটা নমনীয় হতে পারে, বিশেষ করে যদি তারা প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়। তবু সেখানেও বিনা মূল্যের মডেল ব্যবহার আর চীনা মালিকানাধীন অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করার মধ্যে বড় ফারাক রয়ে গেছে।
বড়দের জন্য সুযোগ, ছোটদের জন্য সংকট
আলিবাবা ও টেনসেন্টের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের জন্য এই সংকট অস্তিত্বের হুমকি নয়। তারা অন্যান্য সেবার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে। কিন্তু অসংখ্য ছোট স্টার্টআপের জন্য সামনে সময়টা কঠিন। জনপ্রিয়তা থাকলেও টিকে থাকার জন্য অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলানোই এখন তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















